উপন্যাসসাধুশ্মসানের উপকথা

কমরেড বনাম কমাণ্ডার │ সাধুশ্মশানের উপকথা │ স্নেহাশিষ রায়

কমরেড বনাম কমাণ্ডার

-এইবার  মন্ত্রী বাঁচাও! কমরেড।

সোলায়মান চাচা  বাবাকে কমরেড বলে ডাকে। কেন? বাবার নাম  কমরেড হয় কখনো?

দাবা খেলার বোর্ডে সাদা কালো চারকোণা ঘর । রাজা, মন্ত্রী , সৈন্য, হাতি, ঘোড়ার লাফালাফি সর্বক্ষণ।

 প্রায়ই বাবা  সোলায়মান চাচার রাজাকে বন্দী করে ফেলে। বাবার কাঁচা-পাকা দাড়ি। দাড়ির আড়াল থেকে সাদা দাঁত বেরিয়ে আসে। বাবা হাসে।

-চেক এন্ড মেট, কমান্ডার।

বাবা সোলায়মান চাচাকে কমাণ্ডার বলে ডাকে।

টেবিলের এক পাশে বাবা , অন্যপাশে সোলায়মান চাচা। টেবিলের উপর দাবার সাদা-কালো বোর্ড, আর সন্ধ্যা হয়ে এলে, হারিকেন। আর হারিকেনের লালচে আলো। দু’জনের বিরাট ছায়া পড়ে, বিপরীত দুই দেয়ালে।

কেউ ঘরে না থাকলে, টেবিলের কাঠের ভেতর থেকে, কিট-কিট, কিট-কিট শব্দ শুনা যায়। মেঝেতে কাঠের মিহি গুড়াও পড়ে থাকে।  আরতি বলে, ‘ঘুণপুকা’। ঘুণ পোকা দেখতে কেমন , আমি কিংবা আরতি, তা জানি না । আরতি বলে, কাঠ খাওয়া শেষ হইলে ,  ঘুণপুকা  বাইর হইয়া আসবো।

 আমরা ঘুণ পোকা দেখার অপেক্ষায় থাকি।

চৌকাঠের দরজায় মা একটা গণেশ ঠাকুরের ছবি টানিয়ে দিয়েছিল। বাবা তা নামিয়ে, সেখানে  তুলে দিয়েছে অন্য এক  ছবি। ছবির লোকটি ভীষণ আলাদা।  মাথায় টাক, খাড়া নাক আর লম্বা মুখ। কেমন করে যেন  ছাঁটা দাড়ি-মুছ। পরণে কালো কোট আর টাই।  কাঠের বাদামী ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটির ঠিক নীচে লেখা, ভ.ই. লেনিন।  লেনিনের বাঁকানো ভ্রুর তীক্ষ্ণ দৃষ্টির পাহারায়, প্রতিদিন সন্ধ্যায়, দাবা খেলে দুই বন্ধু।

মা বলে, দেবতাদের অপমান কইরা, উকালতিতে উন্নতি কেমনে হইবো?

বাবা বলে, সব ভাওতা। রকেফেলার, ফোর্ডের ব্যবসায় কোন গণেশের ছবিটা টানানো ছিল?

রকেফেলার, ফোর্ড কে আমি জানি না। তবে, বাবার যে, গণেশ ঠাকুরের চেয়ে ছবির ভদ্রলোকে বিশ্বাস বেশী , এটা বুঝি।

বাবার উকালতির চেম্বারটিতে, ধুলো জমতে শুরু করেছে। মিনু মাসি বেঁচে থাকতে, এমনটি হতো না। সবকিছু ঝাঁড়া-মুছা পরিষ্কার হয়ে থাকতো।  চাটাইয়ের সিলিং-এ এখানে সেখান মাকড়ের ঝুল, রান্নাঘরের ধুয়া আর ধুলিতে কালচে আকার ধারণ করেছে। বাবা  হঠাৎ হঠাৎ, ধুলো-বালি ঝাঁড়ে। মা এ ঘরে আসে না। ঠিক যেমন বাবাও মায়ের পূজার ঘরে যায় না।

ইদানিং বাবার  মক্কেলের সংখ্যা আরো কমে গেছে। এনিয়ে বাবার আফসোস নেই। কখনো যদি  কোন মক্কেল আসে, তবে বাবা তাঁর  আনাড়ী হাতে, চেম্বারটি পরিষ্কার করার চেষ্টা করে। টেবিলের উপর ছড়িয়ে থাকা ‘সংবাদ’ পত্রিকার সাম্প্রতিক সংখ্যাগুলো চালান করে দৈনিক সংবাদপত্রের স্তুপে। ‘বিচিত্রা’ , ‘ভারত বিচিত্রা’ ইত্যাদি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনগুলোর ঠাঁই হয়, ম্যাগাজিনের স্তুপে।

মাঝেই মাঝেই, পুরাতন কাগজ কেনার ফেরিওয়ালা এসে জিজ্ঞেস করে, বিক্রির মতো কাগজ আছে কিনা। সের দরে কিনে নিয়ে যায় পুরোনো খবরের কাগজ। তবে বাবা কখনো ‘উদয়ন’ পত্রিকাগুলো বিক্রি করে না। বাবার চেম্বারের কাঠের আলমারীর নিচের তাকে, সযত্নে জমা হতে থাকে পত্রিকাগুলো।

বাবার চেম্বারে পাতা ছোট বিছানায়, ঝকঝকে মসৃণ শুভ্র কাগজে ছাপানো ‘উদয়ন’ পত্রিকার সংখ্যাগুলো ছড়িয়ে রেখে মাঝখানে আমি বসে থাকি।  উদয়নে ছাপানো রাশিয়ার ছবিগুলো যেন অন্য গ্রহের। সাজানো গোছানো শহর, গ্রাম, শিশুপার্ক, খামার, জমি চাষের ট্রাক্টর, ফসল কাঁটার যন্ত্র,  সরু দীঘল জিমন্যাষ্ট, ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান, যুদ্ধজাহাজ, বরফের ভেতর ছুটে চলা রেলগাড়ী, শান্ত ঋজু পাইন বন, বিশ্বসুন্দরী । ছবির মানুষগুলো যেন অন্য কোন পৃথিবীর । প্রত্যেকের নাক উঁচু, প্রত্যেকের গায়ের রঙ ফর্সা। যেন তুলিতে আঁকা সুশ্রী মুখচ্ছবি। আমাদের সাধুশ্মশানের মানুষগুলোর মতো রোদে পুড়া চোয়াল ভাঙ্গা, কালো মানুষ নয়।

কমাণ্ডার বনাম কমরেড দাবার নিরন্তর লড়াই চলে।  দাবা খেলার ফাঁকে ফাঁকে তাঁরা গল্প করেন। ভারী বিষয় নিয়ে। বঙ্গবন্ধু, আলেন্দে, লুমুম্বা, গান্ধী, নেহেরু, কামাল আতাতূর্ক, সোভিয়েত ইউনিয়ন, আমেরিকা, প্রলেতারিয়েত, বলশেভিক, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র , শব্দগুলো নিয়ে বাবা ও সোলায়মান চাচার মাঝে তর্কাতর্কি হয়।  বড়রা এমন কিম্ভূত বিষয় নিয়ে ঝগড়াও করতে পারে! এগুলো তো কাঁচা আম, ঘুড়ি কিংবা লাটাই নয়। বড়রা কি বোকা!

 আবার কখনো মনে হয়, তর্কটি আসলে সোলায়মান চাচা কিংবা বাবার মাঝে নয়। ঝগড়াটি আসলে, কমরেড ও কমাণ্ডারের মাঝে।

সাদা, কালো

মঞ্জু আমার চেয়ে বছর দুই তিন বড়। তাঁর বড় হওয়ার ভীষণ তাড়া।

বড়রা স্কুলের মাঠে তাস পেটায়। সে নি:শব্দে ঢুকে যায় তাসের আড্ডায়। পান-চুরুট লাগলে, দৌড়ে গিয়ে এনে দেয় , মুদি দোকান থেকে। লাল সেট , কালো সেট, ট্রাম, ওভার ট্রাম, টুয়েন্টি নাইন খেলার কিছুই বুঝে না সে। তবু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে , তাড়িয়ে তাড়িয়ে গল্প শুনে। বড়দের গল্প, বড়দের রাজনীতির গল্প।

কখনো কখনো আচমকা উল্লসিত হয়ে, স্লোগান দিয়ে উঠে। ‘সামরিক আইন তুলে নাও, গণতন্ত্র ফিরিয়ে দাও’।

-সামরিক আইন তুলে নিলে কি লাভ হয়রে মঞ্জু ?

মঞ্জু হাসে। ‘আহা! অভি। বেক্কলের বেক্কল, কিছুই জানে না।’

পাটখড়ির একটা বেড়া দেখিয়ে বলে, অই বেড়াডা দেখতাছস? সামরিক আইন তুলে নিলে, আমি যদি বেড়াডা ভাইঙ্গাও ফেলি, তাইলেও কেউ কিছু বলতে পারবে না।

আমি মন দিয়ে শুনি।

মঞ্জুর কেন জানি, জমি-জমা আছে, এমন গৃহস্থ-বাড়ীর বেড়া ভাঙ্গার খুব ইচ্ছে । সামরিক আইন উঠে গেলেও, মঞ্জুর একটা বেড়াও ভাঙ্গা হয় নি।

মঞ্জুর মা মারা গেলে, মঞ্জুর বাবা আবার বিয়ে করে। করুণার মা বলে, ‘ব্যাডা মানুষ, বউ ছাড়া চলব কেমন কইরা!’

 নতুন আম্মার গায়ের রঙ কালো। মঞ্জু বলে, ‘ আব্বার দুই নম্বর বিয়া তো, ধলা বউ খুঁইজা পায় নাই।’ মঞ্জু আরো বলে, ‘বেডীর মুখে হাসি, আসলে একটা শয়তান। আব্বারে খেপাইয়া তুইলা, আমারে মাইর খাওয়ায়। আর মাইর খাওয়ার পর, বাপেরে দেখাইয়া দেখাইয়া সোহাগ করে।’

মঞ্জু বড়দের মতো করে কথা বলে। আমার বাবা মঞ্জুর কথা শুনে, আর বলে, মা মারা গেলে , শিশুরা তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায়!

মঞ্জুর আব্বার বাজারে দোকান আছে একটা। ‘বিয়ানে যায়, দুপুরবেলা ভাত খাইতে আয়ে, রাতেও আয়ে ভাত খাইতে। খাওয়ার পর নতুন আম্মার ঘরে, দরজা লাগাইয়া, কি জানি করে। তারপর, দোকানে ফিইরা যায়। চাইর দিকে চুরের উৎপাত।’

মঞ্জুর মাঝে মাঝে ‘পালাইতে’ ইচ্ছে করে। ইস্কুলে রওনা দিয়ে, বইগুলো একটা টং দোকানে রাখে। তারপর , টো টো করে ঘুরে বেড়ায়। কোন কোন চায়ের ষ্টলে, জল টেনে দিলে, এক দুইটা টোষ্ট বিস্কুট দেয়। সে সেই বিস্কুট খায় আর পেট ভরে পানি খায়।

গাছ বাইতেও উস্তাদ মঞ্জু। সুপারী গাছে কি সুন্দর তড় তড় করে উঠে যায়। গৃহস্থ বাড়ীর সুপারী পেরে দেয়।  তারপর নিজের ভাগের সুপারী বিক্রি করে, বাজার থেকে বন রুটি কিনে খায়। গরমের কালে, ষ্টেশানের বিশাল জাম গাছের ডালে চরে, ভরপেট জাম খেয়ে, জিহ্বা নীল করে ফেলে। সন্ধ্যায় ক্ষুধা যখন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে, বাজারের ঘরগুলো বন্ধ হতে থাকে, তখন তার পালানোর ইচ্ছাটি পালিয়ে যায়। মুদি দোকান থেকে বইগুলো তুলে নিয়ে, বাড়ী ফিরে। রাতের বেলা আব্বার ডোরা কাটা জালি বেত দিয়ে মার খায়। চিৎকার করে কাঁদে। পালানোর ভূত কিছু দিনের জন্য তাঁকে ধরে না।।

বড়দের আড্ডায় নি:শব্দে ঢুকে যেতে ভালোবাসে, মঞ্জু। বড়দের গালি, বড়দের রাজনীতির গল্প, সব তাঁর ঠোঁটের আগায় ।  বড় হয়ে সে দারোগা হতে চায়। ‘দারোগা কেন?’ জিজ্ঞেস করলে, দাঁত কটমট করে বলে, ‘পিটাইয়া হাড়গোড়, ভাইঙ্গা দিয়াম।’ কার হাড়গোড় ভাঙ্গবে, তা নিয়ে কিছুই বলে না।

আমরা যখন মিছা-মিছি চোর-পুলিশ খেলি, তখন, সব সময়ই দারোগা হতে চায় সে। একটা কালো পিস্তল, আর একটা মোটা লাঠি তাঁর জোগাড় করাই আছে ।

একদিন প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যাকাণ্ডের গল্প নিয়ে আসে, কোন এক বড়দের আড্ডা থেকে। গুপ্ত হত্যার বিবরণ। জেনারেল মঞ্জুর জিয়াকে  হত্যা করে পালিয়ে যায়, পাহাড়ে। সঙ্গে তাঁর বৌ বাচ্চা। জেনারেল মঞ্জুরকে বন্দী করে থানার দারোগা। জেনারেল মঞ্জুরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সবই আমাদের মঞ্জু-র নখদর্পনে।

প্রেসিডেন্ট হত্যাকাণ্ড নিয়ে আমাদের খেলাটি জমে উঠে।

মাসুদের চাচা , মাসুদকে একটা চশমা কিনে দিয়েছে। একেবারে জিয়াউর রহমানের চশমার মতো। চশমাটি সে কাউকে ছুঁতে দেয় না। মঞ্জু ঠিক করে, মাসুদই জিয়া সাজবে। আমার হাতের বন্দুকটাও বেশ দারুণ, মা কিনে এনেছে ঢাকা থেকে। তাই আমিই হন্তারক, জেনারেল মঞ্জুর। ঘরে ঢুকি, নিদ্রিত জিয়াকে লক্ষ্য করে গুলি চালাই। তারপর, দৌড়ে পালাই, কুমীর টিলার দিকে।

নিপা জেনারেল মঞ্জুরের স্ত্রী। হাতে একটা পুতুল। তাকেও পালাতে হয়, আমার সাথে।

মঞ্জু দারোগা হতে ভালোবাসে। হাতে পিস্তল উচিয়ে আমাকে তাড়া করে। পরিকল্পনা মতো আমাকে গতিয়ে থামিয়ে দারোগার কাছে ধরা দিতে হবে। কুমীর টিলায় আমাকে বন্দী করা হয়। মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে হত্যা করে দারোগা। এখানে, একটি দৃশ্য মঞ্জু যোগ করে দেয়। দারোগা জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যার পর, ক্লান্ত হয়ে বাড়ী ফিরলে, দারোগার স্ত্রী তাঁকে পাখা দিয়ে বাতাস করে। দারোগার স্ত্রী আর কেউ নয়। বিশ্বাস বাড়ীর আরতি।

 মঞ্জু একদিন ফিসফিস করে বলে, আরতিরে তাঁর খুব পছন্দ । কিন্তু আরতিরে সে বিয়ে করতে পারবে না। কারণ তারা মুসলমান।

অন্য দিকে, আমি – জেনারেল মঞ্জুর- গুলিতে নিহত হয়ে শুয়ে পড়ি, টিলার উপর। নিপা দাঁড়িয়ে থাকে। মঞ্জু নিপাকে বলে, স্বামী মরলে কানতে হয় , নিপা।

নিপা নকল করে কাঁদতে জানে না। নিপা পুতুল হাতে নিয়ে জেনারেল মঞ্জুরের গুলিবিদ্ধ লাশের পাশে বসেই থাকে।

আমার লাশের পাশে বসে নিপা কাঁদে। আমার ভাবতেই ভালো লাগে। ফুটফুটে ফর্সা নিপা। এক দম তাঁর মা, রহিমা খালার মতো। বাবা শহীদ কাকার মতো নয়।

মাঝে মাঝে নিপা না থাকলে, অ্যামি জেনারেল মঞ্জুরের স্ত্রী সাজে। অ্যামি যখন পুতুল হাতে, আমার লাশের পাশে বসে থাকে তখন আমার এতোটা ভালো লাগে না। কারণ অ্যামীর গায়ের রঙ কালো।

মঞ্জু বলে , কালা মাইয়া বিয়া করলেই সব্বনাশ।

-কেন?

– কালা বউয়ের ঘরে কালা মাইয়া হয়। কালা মাইয়া বিয়ে দিতে , ম্যালা খরচ।

মঞ্জু সব জানে। ‘তুই জানস কেমনে?’ জিজ্ঞেস করলে, সে হাসে। গর্বের হাসি। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা জানান দিতে চায়। ‘ বলতো, বাচ্চা সব বিয়ের পর হয় কেমনে?’

তাইতো, সব বাচ্চা তো বিয়ের পরই হয়! আগে তো খেয়াল করি নি।

-কেমনে?

-তুই দেহি কিছুই জানস না , অভি। বিয়ের পর, জামাই-বউ এক ঘরে ঘুমায়, এইজন্য

আরে! তাইতো!

মঞ্জু করুণার মায়ের দুই চক্ষের বিষ। বলে, ‘মঞ্জুটা এক্কেবারে পাইক্কা গেছে। এর সাথে অভিরে মিশতে দিও না, অনুদি।’ মঞ্জুরে দেখলে তাড়া দেয়। করুণার মায়ের কথায় কষ্ট পায় মঞ্জু। ‘ কালা মাইনষের কালা মন। একেবারে নতুন আম্মার মত।’

আমার মা, করুণার মায়ের উপদেশ শুনে না। মঞ্জু আমাকে খুব ভালোবাসে। ডিমাইন্যা আমাকে  মারতে আসলে, মঞ্জু বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়। মঞ্জু আমার মাকে খুব পছন্দ করে। মাও তাই। মাঝে মাঝে মঞ্জুকে লুকিয়ে লুকিয়ে , আমার সাথে খেতে দেয়। মঞ্জুর চোখ ছল ছল করে। মঞ্জু কোন দিকে না তাকিয়ে খায়। যাওয়ার সময় বলে, ‘ অনু মাসি , আব্বায় যেন না জানে!’

কালো মহিলার ঘরে যে কালো মেয়েই জন্মায়, এটা সব সময় ঠিক না। করুণার মায়ের গায়ের রঙ কালো। কিন্তু তার মেয়ে করুণা তো ফর্সা।

মঞ্জু বলে, করুণার বাপ মনে হয় ধলা আছিন। ভাটির ব্যাডাইনে, ধান তুলনের সময় হইলে, বিয়া কইরা কামের বেডী আনে। করুণার মারে এমন কইরাই বিয়া করছিল, এক ভাটির ব্যাডা। ধান তুলা হইলেই তাড়াইয়া দিছে।

মঞ্জু সব গল্প জানে।

তবে ফর্সা মেয়ের বিয়ে দিতে ঝামেলা কম। এটা ঠিক। করুণার বিয়ে হয়েছে গৃহস্থ ঘরে। মেয়েকে নিয়ে করুণার মায়ের দেমাগের শেষ নাই।  গায়ের ফর্সা রঙের জন্য, তার জামাই নাকি মেয়েরে ভীষণ আদর-সোহাগ করে। গ্রামে কোন কালো মেয়ে বিয়ে হয়ে এলে, সে হাসাহাসি করে। মুখে হাত দিয়ে ফিসফিস করে। ‘ বউ একদম সুন্দর না। এমন একটা সুনার টুকরা পুলা । কি বিয়া দিল? মনে হয়, ট্যাকা-পয়সা দেখছে।’

করুণার মা মাঝে মাঝে, আমার মাকে না বলে, মায়ের গায়ে মাখার  সাবান নিয়ে ঘাটে যায়। খুব করে সাবান ঘষে। আর বাহুর দিকে তাকায়।  খেয়াল করে দেখে,  কালো রঙ একটুও ফিকে হলো কিনা। করুণার মা যেন, তার গায়ের কালো রঙটিকে খুব ঘেন্না করে।

আমার বাবার গায়ের রঙ কালো। মা উজ্জ্বল শ্যামলা। আমি তাঁদের রঙ পেয়েছি। বাবাকে জিজ্ঞেস করি, আমার গায়ের রঙ কালো। কালো কি খারাপ?

– সাদা আর্যরা  কালোদের যুদ্ধে হারিয়ে, ওদের  মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে, কালো মানে খারাপ। আসলে তা নয়।

বাবার এই এক সমস্যা। সুযোগ পেলেই, বইয়ের মতো করে কথা বলে। আমি যে এখনো ভীষণ ছোট, আমি যে তা বুঝি না, বাবা সে খেয়াল করে না।

করুণা তাঁর মায়ের বাড়ী বেড়াতে এলে, আমাদের বাড়ীতেও আসে। মায়ের কাজে কর্মে সাহায্য করে। একদিন দুপুরবেলা, কালো মা ও ফর্সা মেয়ে আমাদের রান্নাঘরের জানালার সামনে দাঁড়ায়।  বাইরে কি যেন দেখে। ফিস ফিস করে কথা বলে। কি দেখে , আমি জানি না। আমি পেছনে এসে দাঁড়াই। কেন দাঁড়াই, আমি জানি না। মা-মেয়ে আমার দিকে পেছন ফিরে আছে। ওরা আমাকে দেখেনা। হঠাৎ আমার মনে হয়, আচ্ছা! কালো কিংবা ফর্সা মানুষের  কাপড় দিয়ে ঢাকা অংশও কি কালো কিংবা ফর্সা?

 আমি নি:শব্দে ফর্সা করুণার শাড়ীর প্রান্তভাগ তুলি। ওরা তখনো জানালার বাইরে, কি যেন দেখছে। আমি শাড়ী কাপড় ও সায়ার প্রান্তভাগ  অনেকটাই তুলে ধরি। করুণার পেছনের রঙ, তার মুখের মতোই ফর্সা। এবার করুণার মায়ের ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াই নি:শব্দে। কাপড়ের প্রান্তভাগ ধরে ধীরে ধীরে কাপড় উপরে তুলি। শাড়ীর নিচেও করুণার মায়ের রঙ ঠিক একই রকম কালো। আমি শাড়ীর প্রান্ত নামিয়ে রাখি।

কেন জানি, করুণার ফর্সা পেছনভাগই আমাকে বেশী টানে। করুণার ফর্সা গোল পেছনটি  আরেকবার দেখতে ইচ্ছে করে।

দ্বিতীয়বার করুণার কাপড় তুলতে গিয়ে আমি ধরা পড়ে যাই। করুণা হাসে। করুণার মা রাগ হয়। ‘ পাজি মঞ্জুডার সাথে থাইক্কাই, অভি এমন বদ হইছে। অনুদির কাছে কইতে হইবো।’

আমার সারাদিন ভয় ভয় লাগে। মাঝে মাঝেই  করুণার ধলা পেছনটির ছবি মনে ভেসে উঠে।

মন্তব্য করুন