গদ্য │রাষ্ট্র ও গণ আন্দোলন সংখ্যারাষ্ট্র ও গণআন্দোলন সংখ্যা

রাজনীতি-গণতন্ত্র-ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের আন্তঃসম্পর্ক │রুদ্র শায়ক

▌ রুদ্র শায়ক

রাজনৈতিক প্রপঞ্চ রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে প্রবাহিত। এমনকি দলও রাষ্ট্রকে নিয়ে গঠিব। দলের মতাদর্শ যতই আন্তর্জাতিক হোক না কেন সেও রাষ্ট্র কাঠামোর উত্তরাধিকার চায়। যে কোন দল জাতীয় রাজনীতি করলেও সে আন্তর্জাতিক লবি মেনে চলে কিংবা চলতে বাধ্য। জিও পলিটিক্স রাষ্ট্রের সাথে বর্হিবিশ্বের আন্তঃসম্পর্কের মেরুকরণ করে একই নিয়মকায়দা দলের ক্ষেত্রেও।আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিদ্যা রাজনৈতিক বিজ্ঞানেরই শাখা। অধ্যাপক Alan R Ball যথার্থই বলেছেন – Politics is a universal activity। তার মতে রাজনীতির মূল কাজ হল বিরোধিতা বা দ্বন্দ্ব এবং সে দ্বন্দ্বের নিষ্পত্তি বা মীমাংসা। মিলার বলেন- মানুষের একাধিক বিষয়ে আগ্রহ থাকতে পারে। এছাড়াও সমাজে বিরোধ অবিশ্যম্ভাবী। “man is a universe of interest . political activity …arises out of disagreement …”

বহুরৈখিক সমাজ ব্যাবস্থায় বহু মানুষের  মত ও চিন্তার নানা রকম। তাই রাজনীতির সর্বজন গ্রহণযোগ্য কোন সংজ্ঞা দাঁড়া করানো বেশ কঠিন তত্ত্ববিদ্যা (ontology) এবং জ্ঞানতত্ত্বিক (epistemological) বিষয়েই রাষ্ট্র চিন্তাবিদের মতের মিল নেই। ল্যাসওয়েল ও কাপলান তাদের power & society গ্রন্থে বলেন রাষ্ট্র বিজ্ঞানের আলোচনায় মূলত প্রভাব ও প্রভাবশালিদের নিয়ে (the study of politics is the study of influence and influential )। সমসাময়িক চিন্তুক ডেভিড ইস্টন বলেন- রাষ্ট্র বিজ্ঞানের মূল আলোচ্য বিষয় হল যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া। (collective decision making process)। এ প্রক্রিয়ায় সমাজের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে রূপ দেয় যার কাজ “মূল্যের কৃতিত্বপূর্ণ বরাদ্দ “সমাজ ব্যাবস্থায় উদ্ভূত দাবিদাওয়া, চাপ ও সমর্থন রাজনৈতিক প্রবাহ বা ব্যাবস্থাকে প্রভাবিত করে। সমাজের মধ্যে উদ্ভূত দাবিদাওয়া, চাপ ও সমর্থন, স্বার্থগোষ্ঠীর জনমত, নির্বাচনী আচরণ, রাজনৈতিক সামাজিকরণ এমনকি রাজনৈতিক অংশগ্রহণ উপকরণ হিসেবে রাজনৈতিক ব্যবস্থার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। রাজনীতি সম্পর্কে এ পরিবর্তীত ধ্যান ধারণার ফলে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ক ধারণার ক্ষেত্রে ও পরিবর্তন ঘটেছে। প্রথম রাজনীতিকে সমাজতত্ত্বের উপগ্রহ (satellite of sociology) হিসেবে দেখা হয়েছে। দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের স্বাতন্ত্র্য (autonomy) বিনষ্ট হয়েছে।

মাকর্সীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে রাজনীতি হল শ্রেনিগত ধারণা যা ক্ষমতাকে কার্যকর করার কার্যকলাপের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে যুক্ত। রাজনীতি গঠণের পিছনে অর্থনৈতিক উপাদানের প্রভাব থাকায় লেনিন রাজনীতিকে অর্থনীতির ঘনীভূত প্রকাশ (concentrated expressicm of economics) বলে বর্ণনা করেছেন। র‍্যালফ মিলিব্যান্ড (Ralph miliband) তার Marxism and politics  বইয়ে বলেছে ‘’মাকর্সীয় রাজনীতির তত্ত্বের মূলে আছে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ধারনা ।‘’(at the core of Marxist theory of politics there is the notion of conflict)। বুর্জোয়া তাত্ত্বিকেরা রাজনীতিকে দেখেছেন মার্কসবাদ নিরসনের প্রক্রিয়া হিসাবে। কিন্তু তারা মূলত ব্যাক্তি ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কথা বলেছেন , মার্কসবাদ শ্রেনিদ্বন্দ্বের কথা বলেছে । মার্কসবাদে দ্বন্দ্ব মানে বিকাশ। তাই অমার্কসীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের বিরোধ সম্পর্কিত ধারণার সঙ্গে মার্কসীয় দর্শনের পার্থক্য রয়েছে ।the term ‘political’ refers both to power and to values sometimes together and at other times separately .-rajeev bhargava।

আমাদের দেশে ক্ষমতায় থাকা এবং ক্ষমতায় যাওয়ার দ্বন্দ্ব রাজনৈতিক আলোচনার প্রধান উপজীব্যে পরিণত হয়েছে। এসব আলোচনায় ক্ষমতার বিষয়টিকে নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা হয়। ‘power is the key concept in the study of politics …’। চিন্তা-ভাবনাটা এরকম যে, ক্ষমতায় থাকার প্রচেষ্টা এবং ক্ষমতায় যাওয়ার প্রয়াস উভয়ই নিন্দনীয় কাজ। কিন্তু ক্ষমতার শবব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যাবে উভয় রকম প্রয়াসই যতটা খারাপ মনে করা হয়, ততটা খারাপ নয়। সমস্যার সৃষ্টি হয় ক্ষমতার ব্যবহার থেকে। মানবকল্যাণের জন্য ক্ষমতা ব্যবহৃত হলে একে খারাপ দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ খুবই কম। আমাদের দেশে এরকম নেতিবাচক মনোভাবের মূলে রয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহার। যদি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষমতার ব্যবহার কল্যাণধর্মী হতো, তাহলে ক্ষমতায় থাকার কিংবা ক্ষমতায় যাওয়ার প্রয়াস কোনোটিকেই নেতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হতো না। ইতিহাস, সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও উপলব্ধি না থাকলে এরকম বিশ্লেষণ হাজির করা সম্ভব নয়। গলব্রেথের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই ক্ষমতা সম্পর্কে আলোচনা যায়। তিনি দার্শনিক বারট্রান্ড রাসেলের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। রাসেল বলেছেন, ক্ষমতা ও গৌরব মানবজাতির সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা এবং সর্বোচ্চ পুরস্কার। কোনো আলোচনাই ক্ষমতার বিষয়টি উল্লেখ না করে হয় না। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীরা এটি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পেতে পারেন অথবা না-ও পেতে পারেন। অন্যান্য রাজনীতিক ক্ষমতার কাছাকাছি যেতে পারেন অথবা তা হারাতে পারেন। কর্পোরেশন ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে ক্ষমতাবান মনে করা হয়। অন্যদিকে বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো বিপজ্জনকভাবে ক্ষমতাবান। সংবাদপত্রের মালিক ও প্রকাশক, ব্রডকাস্টিং নেটওয়ার্কের প্রধান, কলাম লেখক এবং ধারা বর্ণনাকারীরাও ক্ষমতাবান। মার্কিন সমাজে দেখা গেছে, সময়ে সময়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মন্তব্যকারীরা শক্তিশালি কণ্ঠে পরিণত হন। এদের মধ্যে কেউ কেউ নৈতিকতার নেতা হলেও, অনেকের কাছে তারা নৈতিকতাকে বদনামের মধ্যে ফেলেছেন।

জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার ক্ষমতার বিষয়টির জটিলতা উপলব্ধি করে এটির বিশ্লেষণের জন্য আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তার মতে, ক্ষমতা হল অন্য মানুষের আচরণ প্রভাবিত করার জন্য নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়ার সম্ভাবনা। যত বেশি এরকম ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়া সম্ভব হয়, ততই ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু প্রশ্ন হল, কীভাবে এই ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়া হয় এবং কীভাবে অন্যদের এটি মেনে নিতে বাধ্য করা হয়। এটি হতে পারে দৈহিক শাস্তির ভয়, আর্থিক পুরস্কার প্রদানের অঙ্গীকার, বুঝিয়ে-সুজিয়ে রাজি করানো, অথবা অন্য কিছু। যেমন- গভীর শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ ত্যাগ করতে বাধ্য করা। আমাদের জানতে হবে, ক্ষমতার উৎস কী? জানতে হবে কতিপয় ব্যক্তি বিশাল কিংবা অল্প মাত্রায় শাসন করার লাইসেন্স পায়। কীভাবে অন্যরা শাসিত হয়। এসব প্রশ্নের মূলকথা হল ক্ষমতা কীভাবে বলবৎ হয়, কীভাবে বলবৎ করার পদ্ধতি হস্তগত হয়।

কিছু ক্ষমতার ব্যবহার নির্ভর করে এটি লুকিয়ে রাখার মাধ্যমে। যাদের ওপর এভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয় তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাথা নত করে এবং বুঝতে পারে না, কারা এটি করছে। আধুনিক শিল্পায়িত সমাজে অন্যের ইচ্ছার ওপর কিছু মানুষকে অধস্তনে পরিণত করা হচ্ছে এবং এ কাজে সক্ষমতার উৎস দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। পাণ্ডিত্যের একটি ধরণ আছে, যার উদ্দেশ্য জ্ঞানের বিস্তার নয়, বরং অজানাকে আয়ত্তে রাখা। কারোরই উচিত নয়, এর কাছে আত্মসমর্পণ করা। ক্ষমতাকে তিনটি উপায়ে দেখানো যেতে পারে অথবা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। গলব্রেথের মতে, ক্ষমতা তিন ধরনের। এগুলো হল- শাস্তি, প্রতিশোধ ইত্যাদির মাধ্যমে কঠোরভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ, ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ এবং অভ্যস্ত করে ক্ষমতা প্রয়োগ। জোরজবরদস্তি অথবা কঠোর শাস্তি ও প্রতিশোধের মাধ্যমে অন্যদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে পরিবর্তন করা ক্ষমতা প্রয়োগের সবচেয়ে অপ্রীতিকর অথবা কষ্টকর পদ্ধতি। দাস সমাজে এরকম ক্ষমতা প্রয়োগ করেই দাসদের কাজ করতে বাধ্য করা হতো। চাবুকের ভয়ে দাসরা প্রভুর হুকুম মেনে চলত। এভাবে যখন ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়, তখন মানুষ মন খুলে তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা ব্যক্ত করতে পারে না। কারণ তাতে পরিণতি হয় অত্যন্ত ভয়াবহ। ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে এর বিপরীতে যে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয় এবং আনুগত্য আদায় করা হয়, সেটি ঘটে মূলত ইতিবাচকভাবে পুরস্কৃত করার মাধ্যমে। যে ব্যক্তি অনুগত হবে তাকে মূল্যবান কিছু দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রাথমিক স্তরে বিশেষ করে গ্রামভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নানাভাবে ক্ষতিপূরণ করার পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। যেমন- পণ্যে প্রাপ্য শোধ করা এবং এক খণ্ড জমি চাষ করার জন্য ভূমি মালিকের কাছ থেকে ফসলের একটি অংশ পাওয়া। ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে প্রশংসারও ব্যবহার করা হয়। আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগের হাতিয়ার হল আর্থিকভাবে পুরস্কৃত করা। কোনো সেবা প্রদানের বিনিময়ে এ ব্যবস্থায় অর্থ প্রদান করা হয়। এটি আসলে অন্যের অর্থনৈতিক অথবা ব্যক্তিগত স্বার্থে অনুগত হওয়ারই এক ধরনের পুরস্কার।

জবরদস্তি অথবা শাস্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এবং ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার মাধ্যমে যে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়, সে সম্পর্কে আনুগত্য প্রদানকারী ব্যক্তি বুঝতে পারে। একটি ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে এবং অন্য ক্ষেত্রে প্রাপ্তির আশায়। অভ্যস্ত করার মাধ্যমে যে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়, তা করা হয় মূলত মানুষের বিশ্বাসের জগতে পরিবর্তন ঘটানোর মাধ্যমে। প্ররোচনা, শিক্ষা অথবা সামাজিক অঙ্গীকার, যা দৃশ্যত স্বাভাবিক, সঠিক অথবা ন্যায়সঙ্গত মনে হয়, সেগুলো ব্যক্তিকে অন্যের ইচ্ছার কাছে নিজেকে সমর্পিত করে দেয়। বাহ্যিকভাবে মনে হবে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় পছন্দ করে কাজটি করছে; কিন্তু এর ভেতরে আত্মসমর্পণের বা অনুগত হওয়ার যে উপাদান রয়েছে তা অনেক সময় বোঝা যায় না। আধুনিক জমানার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জবরদস্তিমূলক ক্ষমতা প্রয়োগ ও ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতা প্রয়োগের তুলনায় মানুষকে অভ্যস্ত করে ক্ষমতা প্রয়োগের কৌশল প্রাধান্য অর্জন করেছে।

উপর্যুক্ত তিন ধরনের ক্ষমতার উৎসের পেছনে রয়েছে তিন ধরনের প্রতিষ্ঠান বা বৈশিষ্ট্য, যা একটিকে অন্যটি থেকে পৃথক করে। এ তিনটি উৎস হল- ব্যক্তিত্ব, সম্পত্তি এবং সংগঠন। ব্যক্তিত্ব বলতে আমরা সাধারণভাবে নেতৃত্বকেই বুঝে থাকি। ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে দৈহিক সৌন্দর্য, মানসিকতা, বক্তৃতা, নৈতিক নিশ্চয়তা অথবা অন্য কোনো ব্যক্তিগত গুণাবলির মাধ্যমে একজন অন্যজনের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষমতাশালি হওয়ার মধ্য দিয়ে। আদিম সমাজে দৈহিক বলের মাধ্যমে এর প্রকাশ ঘটত। আদিম সমাজে দৈহিক বলই ছিল জবরদস্তিমূলক ক্ষমতার উৎস। আজকের দিনে পুরুষরা নারীর ওপর পেশী শক্তির কারণেই প্রাধান্য বিস্তার করতে সক্ষম। তবে আধুনিক সমাজে ব্যক্তিত্ব বলতে বোঝায় অন্যদের সম্মত হতে রাজি করানো। অর্থাৎ আধুনিক সমাজে ব্যক্তিত্বের ব্যবহার করে অন্যদের মেনে নিতে অভ্যস্ত করানো হয়। আধুনিক সমাজে ব্যক্তিত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে এক ধরনের অভ্যস্ত করার ক্ষমতা।

সম্পত্তি অথবা সম্পদ কর্তৃত্ব অর্জনের সুযোগ করে দেয় এবং উদ্দেশ্য অর্জনকেও সম্ভব করে তোলে। এর ফলেও অভ্যস্ত করার মাধ্যমে মানুষের আনুগত্য অর্জন করা হয়। তবে সম্পত্তি বা সম্পদের মাধ্যমে স্পষ্টত ক্ষতিপূরণকারী ক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব হয়। টাকা-পয়সার বদৌলতে আধুনিক সমাজে আনুগত্য ক্রয় করা হয়।

আধুনিক সমাজে সংগঠন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার উৎস। অভ্যস্ত করার ক্ষমতার সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ক্ষমতা চাইলে অথবা ক্ষমতার প্রয়োজন হলে সংগঠন প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। সংগঠন ব্যবহার করে নির্ধারিত মাত্রায় মানুষের সম্পত্তি আদায় করা সম্ভব হয়। সম্মতির মাধ্যমে আনুগত্য অর্জন সংগঠনের মূল লক্ষ্য। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সংগঠনের রয়েছে জবরদস্তি অথবা শাস্তি প্রয়োগের ক্ষমতা। একটি সংগঠিত দল বেশি অথবা কম মাত্রায় ক্ষতিপূরণ করার ক্ষমতা অর্জন করে তার সদস্যদের মালিকানায় থাকা অর্থ ও সম্পদের মাধ্যমে। ক্ষমতা প্রয়োগের হাতিয়ারগুলোর বিভিন্ন মাত্রায় মিশ্রণ করেই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়। ব্যক্তিত্ব, সম্পত্তি এবং সংগঠন- আধুনিক সমাজে বিভিন্ন মাত্রার মিশ্রণ ঘটিয়ে ক্ষমতার প্রয়োগ করা হয়।

ফুকোর মতে, আধুনিক এ ক্ষমতাতন্ত্র আদৌ সার্বভৌমত্বের ছক অবলম্বন করে চলে না। তা চলে ডিসিপ্লিনের ছকে। ব্যক্তি আইন ভঙ্গ করছে কি-না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য ব্যক্তির ওপর কড়া নজরদারির ব্যবস্থাও গৃহিত হয়। ফুকো মনে করেন, আধুনিক মানুষ আইনের নিশ্ছিদ্র বেড়ার ভেতরে জন্মগ্রহণ করে। বিচিত্র বিধি-উপবিধি, সন্দেহপ্রবণ পরিদর্শনের আওতায়, স্কুল, ব্যারাক, হাসপাতাল, ওয়ার্কশপের অবয়বে নজরদারির মধ্যে চলে আসে ব্যক্তির জীবন। মানুষের দেহ ও মন দুটোই সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে, আইনি নিয়ন্ত্রণে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। সাবেকি রীতির অন্ধকার কুঠুরি ও মাটির নিচের সুড়ঙ্গে অপরাধীদের বন্দি রাখার প্রথা বাতিল করা হয়। কারাগার বানানো হলো আধুনিক স্থাপত্যরীতি মেনে। গোল করে নির্মিত জেলখানার বাড়িটি, মাঝখানে একটি আলোকস্তম্ভ। সেখান থেকে ক্রমান্বয়ে সার্চলাইট ঘুরিয়ে সারা জেলখানার ওপর নজর রাখা হতো। এই আলোকস্তম্ভের নাম ‘প্যান-অপটিকন’। আলোকপ্রাপ্তির যুগে কয়েদিরা বন্দি হলো শিকলে নয়, প্যান-অপটিকন-এর আলোর ফোকাসে। ফুকো দেখালেন পুঁজিবাদী রাষ্ট্র প্রতিটি মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতি মুহূর্তের ওপর নজর রাখার জন্য, নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য অসংখ্য প্রতিষ্ঠান বানিয়ে তোলে। এসব প্রতিষ্ঠান মানুষের ব্যক্তিক ও সমাজ-রাজনৈতিক সমস্ত আচরণের কিছু মাপকাঠি নির্ধারণ করে দেয়। সেই মাপকাঠি লঙ্ঘন করলে শাস্তি পেতে হয়। বিধিগুলি মেনে চলার শিক্ষা শুরু হয় শিশু বয়স থেকেই। শিক্ষাদানে অংশগ্রহণ করে বিদ্যালয়, ধর্মালয়, সামরিক বাহিনী, হাসপাতাল প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান। ফুকোর দৃষ্টিতে ক্ষমতার তৃতীয় একটা মাত্রা আছে। ফুকো তার নাম দিয়েছেন গভর্নমেন্টালিটি বা প্রশাসনিকতা। এর মূল কথা হচ্ছে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে জনগণের কল্যাণের জন্য। এখানে ক্ষমতা প্রয়োগ মানে সার্বভৌম শক্তি প্রয়োগ নয়, বরং জনগোষ্ঠীর এক-এক অংশের ব্যবহার, প্রবণতা, চাহিদা, স্বার্থ ইত্যাদি যাচাই করে তার মাধ্যমে জনকল্যাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা। বল প্রয়োগ নয়, কৌশলেই উদ্দেশ্য হাসিল করা এবং তা কার্যকর করছে শুধু রাষ্ট্র যন্ত্র নয়, রাষ্ট্রের বাইরেরও বহু প্রতিষ্ঠান, যারা এই ব্যাপক প্রশাসনিকতার অংশ। ১৯৭৭ সালে ‘মাইক্রোফিজিক্স অব পাওয়ার’ শিরোনামে ফুকোর একটা বক্তব্য সংকলন বের হয়। এখানে ক্ষমতা ব্যাখ্যায় দুটি ধারণা ফুকো বিবেচনায় আনলেন। প্রথমটিকে তিনি বললেন, দমনমূলক তত্ত্ব। এ তত্ত্ব অনুযায়ী ক্ষমতার প্রধান কাজ দমন করা। ফুকোর দৃষ্টিতে উদার সংস্কারবাদ এবং মার্কসবাদে এই তত্ত্বের প্রয়োগ দেখা যায়। ক্ষমতার অন্য ধারণাটি হচ্ছে নিটশীয়। এখানে ক্ষমতা হলো কোনো বিশেষ সমাজের অভ্যন্তরে অঘোষিত যুদ্ধ, এক নীরব অনুচ্চারিত গণযুদ্ধ। বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে, অর্থনৈতিক বৈষম্যে, ভাষায়, এমনকি প্রতি মানুষের মধ্যে এই যুদ্ধ অব্যাহতভাবে ক্রিয়াশীল। ক্ষমতা ব্যাখ্যায় ফুকোর এই নিটশীয় ধারণাকে গ্রহণ করেন। ফুকো ক্ষমতার সাথে জ্ঞান ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেছেন। ফুকোর মতে জ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়া ক্ষমতার প্রকাশ হয় না। ক্ষমতা প্রয়োগের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে শৃঙ্খলিত চৈতন্য। ফুকোর মতে ক্ষমতা জ্ঞানকে বৈধতা দেয়, আর জ্ঞান এই ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখে। ক্ষমতা ও জ্ঞান একটি আরেকটির সাথে মিশে আছে। কোনো বিশেষ সময় বা সমাজে কতকগুলি ধারণা বা বাচনকে আমরা ‘সত্য’ বলে মেনে চলি। যদিও সেই ‘সত্যগুলি’ ইতিহাসগত পরস্পরা অনুযায়ীই নির্মিত, তবু সেই ‘সত্যে’র ছদ্মবেশে প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন ধারণা ও বাচনই ‘ক্ষমতা’য় পরিণত হয়। ফুকোর মতে–পুঁজিবাদী সমাজ যা কিছু তার ক্ষমতা বা জ্ঞানের বাইরে, তাকেই অসুস্থতা বা বিকৃতি বলে আখ্যায়িত করে লোকচক্ষুর অন্তরালে নির্বাসিত করে। পুঁজিবাদী সমাজ শুধু সেটুকুই জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে আনে বা সুস্থ বলে স্বীকার করে, যার থেকে মুনাফা লাভ সম্ভব। এখন প্রশ্ন এই যে, ক্ষমতার এই অনুশীলনে লাভবান হচ্ছেন কে? কার এই ক্ষমতা? বলা হয়ে থাকে এ-প্রশ্নের জবাবে ফুকো যা বলেছেন সেটাই তাঁর শেষ জীবনের মূল ও প্রধান বক্তব্য। ফুকোর মতে আধুনিক জগতে ক্ষমতা এমনভাবে কেন্দ্রচ্যূত হয়েছে যে, তার আর কোনো বিশেষ মালিক নেই; সমাজের সকলেই এই যন্ত্রের মধ্যে এক একটি অংশ। যদিও ফুকো শ্রেণিগত ক্ষমতার কথা বলেছেন, কিন্তু ফুকোর দৃষ্টিতে ক্ষমতা কোনোভাবেই কেন্দ্রীভূত নয়। ফুকোর মতে ক্ষমতার যন্ত্রের বিশেষ কোনো মালিক নেই, ক্ষমতা কোনো বিশেষ শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত নয়। মার্কসের শ্রেণিতত্ত্বকে ফুকো নাকচ করে দিলেন। ‘যৌনতার ইতিহাস’-এ ফুকো বলেছেন কোনো বিশেষ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা বা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণিকে সরিয়ে দিয়ে এই ক্ষমতা যন্ত্রের বিলুপ্তিসাধন সম্ভব নয়। ফুকোর মতে, ক্ষমতা বিরাজ করছে সর্বত্র। এটি অজেয়, এর কর্তৃত্ব অনতিক্রম্য। ‘পাওয়ার-নলেজ’ এ ফুকো লিখেছেন ‘বাম অথবা ডান, কোথায় যে ক্ষমতার প্রশ্নটি ঠিকভাবে তোলা যেতো তা দৃষ্টিগোচর হওয়া কঠিন। কিন্তু ক্ষমতা প্রয়োগের নিজস্ব ‘মেকানিক্সটি’ কখনোই এদের দ্বারা বিশেষিত হয় নি।’ মার্কসবাদীদের সম্বন্ধে ফুকোর এ অভিযোগ একেবারেই সত্য নয়। Eighteenth Brumaire সহ আরো কিছু রচনায় মার্কস ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। এঙ্গেলস স্থূল অর্থনীতিবাদী ব্যাখ্যার বিপরীতে মার্কসের দ্বান্দ্বিক চিন্তাকে অগ্রসর করে নিয়ে গিয়েছেন। মার্কসের তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতা বিশ্লেষণের একটা চমৎকার ধারা গড়ে উঠেছে। লেনিন মনে করতেন–মেহনতিদের ক্ষমতার মূল লক্ষ্য শ্রেণিশত্রুদের দমন নয়, বরং এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে–নির্মাণ, মানুষ কর্তৃক মানুষের ওপর শোষণ, আধিপত্য ও সব ধরনের খবরদারির অবসান। আর গ্রামসি মার্কসীয় ধারায় উল্লেখযোগ্য অনেক কিছু সংযোজন করেছেন। ক্ষমতা বিশ্লেষণে গ্রামসির এই অবদানকে ফুকো এড়িয়ে গেছেন। ফুকোর মতো গ্রামসি ক্ষমতাকে অজেয়, অভেদ্য ও অচূর্ণ হিসেবে দেখেননি। গ্রামসির ক্ষমতা বিষয়ক ধারণা ফুকোর ধারণা থেকে আরো বেশি স্পষ্ট, আরও বেশি রাজনৈতিক এবং তা বিকল্প সমাজ প্রতিষ্ঠার এক দিক নির্দেশনাও বটে। মার্কসবাদ অনুযায়ী রাষ্ট্র, অর্থনীতি এবং ওই দু’য়ের অন্তর্গত সামাজিক ব্যবস্থাটাই হচ্ছে ক্ষমতার প্রধান আশ্রয়স্থল। সেই ব্যবস্থার কেন্দ্রে আঘাত না করে উত্তর-আধুনিক ফুকো ক্ষমতাকে সমাজের ভেতরে ছড়ানো ছিটানো নানা জায়গায় খুঁজতে গিয়ে মূল ব্যবস্থাটাকে অক্ষত রাখতে চান। কেন্দ্রীয় বিপ্লবকে প্রতিহত করতে চান। ফুকো চান মানুষ পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অসংখ্য স্থানীয় ও খণ্ডখণ্ড লড়াই করবে। কিন্তু ফুকোর ধারণা একধরনের শোষণ ক্ষমতার বদলে আসবে আরেক ধরনের শোষণ ক্ষমতা। মূল দুর্গ, মূল ব্যবস্থা হিসেবে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র থাকবে অক্ষত। এভাবে সমাজে ছড়িয়ে থাকা উপেক্ষিত ক্ষমতার জালকে বিবেচনায় আনতে গিয়ে ফুকো প্রত্যক্ষ ক্ষমতাতন্ত্রকে অস্পষ্ট করে দিয়েছেন। মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ অনুযায়ী সব ধরনের ক্ষমতাতন্ত্র থেকে ‘শ্রমের মুক্তিই’ মানুষের স্বাধীনতার পূর্বশর্ত সৃষ্টি করে। মানুষের স্বাধীনতার প্রকৃত বাস্তবায়ন হয় তখনই যখন তার সামাজিক মুক্তি অর্জিত হয়, অবসান হয় সব ধরনের শোষণের এবং যখন মানুষের সৃষ্টিশীল শ্রম অপরের স্বার্থে নিয়োজিত হয় না। প্রাকৃতিক নিয়মের অমোঘতা থেকে মুক্তি ও সব ধরনের শোষণ থেকে মুক্তি–এই দুই প্রকারের মুক্তি একত্রে মানুষকে দিতে পারে প্রকৃত মুক্তি, প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ। আর এই প্রক্রিয়ার বিকাশের মধ্যেই সব ধরনের ক্ষমতাতন্ত্রের শুকিয়ে মরার ভিত্তি তৈরি হয়। পুঁজিবাদে এটা সম্ভব নয়। সমাজতন্ত্রের প্রাথমিক পর্যায়ে এর শুরু, আর মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ সাম্যবাদে অবসান হবে সব ধরনের ক্ষমতাতন্ত্রের, মানুষের স্বাধীনতা পাবে পরিপূর্ণতা। ফুকো মানব সমাজে ক্ষমতার বৈচিত্র্যময় দিক ও প্রয়োগ নিয়ে গবেষণা করেছেন, একথা ঠিক। কিন্তু মানুষ কোন পথে এধরনের ক্ষমতার অধিকারী হয়, কীভাবে এই ক্ষমতা খাটায়, কীভাবে এই ক্ষমতা ধরে রাখে, এ থেকে বের হয়ে আসার কার্যকর পথ কী, তার সন্ধান ফুকো করেননি ।এজন্য এডওয়ার্ড সাইদ বলেছেন–‘ফুকোর চরম হতাশাবাদী দৃষ্টি তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিরোধের ক্ষমতা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায় নি।’ মিশেল ফুকোর এই ঘাটতির অন্তত দুটি কারণ এডওয়ার্ড সাইদ নির্দেশ করেছেন। প্রথম কারণ–মার্কসের চিন্তাধারার সাথে ফুকোর মতের মিল না হওয়া। ফুকোর চিন্তার হতাশাবাদী বিপজ্জনক সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে মার্কসের সাথে তার এই বিচ্ছিন্নতার জন্যই। দ্বিতীয় কারণ–ইতিহাসের গুণগত পরিবর্তন নিয়ে ফুকোর আগ্রহের অভাব। মিশেল ফুকোর ক্ষমতাতত্ত্বে সমাজে গুণগত পরিবর্তনের কোনো নির্দেশনা নেই। আবার ফুকো কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমালোচনা করা সত্ত্বেও মার্কসের অনেক কিছুই গ্রহণ করেছিলেন। মার্কসের অনেক গবেষণা, অনেক কথা ফুকো তাঁর লেখায় সরাসরি কাজে লাগিয়েছেন। মাঝে মাঝে অস্থির চিত্তের মতো যাই-ই বলেন না কেন ফুকো কখনই তার চিন্তার ওপর মার্কসের প্রশ্নাতীত প্রভাবকে অস্বীকার করেননি। আসলে মার্কসের পরবর্তী সময়ে মার্কসকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে নতুন কিছুই সৃষ্টি করা সম্ভব নয়, ফুকো এটা ভালভাবেই জানতেন। ফুকোর মৃত্যুর কিছুকাল আগে জেরাল্ড রুলেট (Gerald Raulet) ফুকোকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- মার্কসবাদ কি শেষ হয়ে গিয়েছে? উত্তরে ফুকো বলেন, । ফুকোর বেশ কিছু ধারণা মাকর্সবাদের সাথে সাংঘর্ষিক। ফুকোর ক্ষমতাতত্ত্বের সাথে মার্কসীয় ক্ষমতাতত্ত্বের দ্বান্দ্বিকতার মৌলিক পার্থক্য আছে। কিন্তু এটাও সত্য ফুকোর ‘ক্ষমতাতত্ত্ব’ প্রথাগত ধারণার বাইরে আমাদের প্রয়োজনীয় আরো কিছু ভাবতে শেখায়। মার্কসবাদের সৃষ্টিশীলতা সত্যানুসন্ধানের সম্ভাব্য সব সুযোগকেই কাজে লাগায়। একটা সৃষ্টিশীল দর্শন হিসেবে তা মানবজাতির বিকাশমান জ্ঞানের জগৎ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের জ্ঞান অর্জনের প্রচেষ্টা চালায়। মার্কস নিজেও এরিস্টটল থেকে শুরু করে মার্কসের পূর্ববর্তী সময়ে সমাজ গবেষণায় যত জ্ঞান সঞ্চিত হয়েছিলো সমালোচনার দৃষ্টিতে সৃষ্টিশীলভাবে তা সংশ্লেষণ করেছিলেন। মার্কসবাদের অন্তর্নিহিত দ্বান্দ্বিকতা ও বিপ্লবী অন্তর্বস্তুর আলোকে ফুকোর ক্ষমতাতত্ত্ব থেকে প্রয়োজনীয় কিছু বিষয় শিক্ষা নেওয়ার সাহসও দেখাতে হবে বর্তমান সমাজবাদী বা বামপন্থি চিন্তুকদের ।

ডিসকার্সিভ মেথড / তর্কলব্ধ রীতির মাধ‍্যমে টেক্সট এর যে Sub- text , pretext ও counter / anti text আসে, সে সব ব‍্যঞ্জনার সাংস্কৃতিক  প্রত‍্যয়গুলো ডিসকোর্সের ব‍্যাখ‍্যায় আন্তঃকৃৎ কুশলতার এলাকাভূক্ত। ঢোঁড়া-ফোঁড়া হায়ারারকির ব‍্যাপার-স‍্যাপার নয়।ডিসকোর্সের আলগা সম্পর্ক গুলোকে ফুকো বিশ্বাস করেন না। তেমনি মার্কসের ধ‍্যান-জ্ঞান ধ্বজাধারী অর্থনীতিকদের ধারণা লব্ধ কত্তাভজা নীতি নির্দিষ্ট সময়ের বেড়ায় পোস্টমর্টেম ছাড়া এখন আর আস্থাশীল হয় না বলেই উদ্ধত মূল‍্য তত্ত্ব জনগণের কাছে আলগা লাগে।ক্ষমতার ল‍্যাজ-মুড়ো অন্বেষণে জনমানসের মিথষ্ক্রিয়া লব্ধ মধ‍্যস্থতায় রাষ্ট্রিয় প্রতিষ্ঠানাদির নেটওয়ার্কিং গড়ে নেন। এ হল ক্ষমতাকেন্দ্রের চেয়ারসর্বস্ব ডিসকোর্স । এ ডিসকোর্সের ভেতর টেক্সট তার দৈরাত‍্যের ত্রাহি ত্রাস চালায়। এ টেক্সট এর প্রতাপে কাউন্টার টেক্সট নিমার্ণ হবে আধিপত্যের বিরুদ্ধে ব্রাত‍্য / প্রান্তিক ন‍্যায‍্যতার অবভাসকে দ‍্যোতনা দিয়ে।টেক্সট লিখিত প্রত‍্যয় আর ডিসকোর্স মূলতই বক্তব্যময়। টেক্সট পরস্পর হতে ক্রিয়াবিমুক্ত কিন্তু ডিসকোর্স পারস্পরিক ক্রিয়াবিমুক্ত।যার সম্পর্কে কিছু বলা যায় না, সে সম্পর্কে চুপ থাকাই ভালো ।( Where of one can’t speak,there at one be silent)_ভিটগেনস্টাইন।যুক্তিযুক্ত ভুলের উপর দাঁড়িয়ে বাস্তবিকতার পরিপ্রেক্ষিতে কতটুকু প্রাসঙ্গিক নিমার্ণ সম্ভব?

“যদিও পথ আছে, তবু কোলাহলে শূন্য আলিঙ্গনে
নায়ক,সাধক,রাষ্ট্র,সমাজ,ক্লান্ত হয়ে পড়ে,
প্রতিটি প্রাণ,অন্ধকারে নিজের আত্মবোধের দ্বীপের মত
কি এক বিরাট অবক্ষয়ের মানব সাগরে।“ _ জীবনানন্দ

প্রচার ও পুঁজিবাদী অবক্ষয়ের মধ‍্যে আমাদের সর্বক্ষণিক যাপিত জীবন তা থেকে মুক্তির আকাঙ্খা শুভ্র নৈতিকতার স্বপ্ন।হন্তারক সময়ে মানুষ নিজেকে নিজেই হরণ করে ,অনেক পলিটিক্সের জালে শিকার হয়ে মানুষ নিজের মননের কাজে ফিরে যায়। লুই আলথুসের মতে শুধুমাত্র বলপ্রয়োগমূলক যন্ত্র দ্ধারা পুঁজিবাদ ক্ষমতা কায়েম করে না। সমান গুরুত্বপূর্ণ হল মতাদর্শগত যন্ত্র। ফুঁকো মতে সার্বভৌম ক্ষমতা হল দখলে অধিকার। বস্তু-সময়-শরীর ও শেষ অবধি স্বয়ং জীবন কে দখলের অধিকার। ক্ষমতা এখন আর রাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষমতা সমস্ত স্তরে ও আকারে ব‍্যাপ্ত। অনুশাসন মন তথা মননকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রক্রিয়া। গ্রামচি ক্ষমতার আলোচনা কে সমৃদ্ধ করেছেন আধিপত্যবাদ Hegemony ধারণার দ্বারা। তার মতে হেজেমনি হল নৈতিক ও বৌদ্ধিক নেতৃত্ব।একটি সংহত পুঁজিবাদী ব‍্যবস্থায় ক্ষমতার উৎস পৌরসমাজ।তার সাংস্কৃতিক মতাদর্শগত পরিমণ্ডল ও তার প্রতিনিধিত্ব কারি প্রতিষ্ঠা সমূহ। এই আধিপত্যের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেনিকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে হলে বিকল্প আধিপত্য স্থাপন করতে হবে।

এ বোধ চেতনা ছোট কাগজের কর্মী ও প্রতিষ্ঠাবিরোধীদের বুঝা ও অনুধাবন দরকার 

Bottom of Form

হাবরমাসের মতে _ গণতান্ত্রিক শাসনের বৈধতা শুধুই সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে আইন সৃষ্টি হচ্ছে কি না তার উপরেই নির্ভর করে না। তিনি মনে করেন আইনের বৈধতার সত‍্যিকারের পরিমাপ হওয়া উচিত ।

কর্তৃত্ববাদ বলতে সেই মতবাদকে বোঝানো হয় যেখানে জনগণের সম্মতি অপেক্ষা কোনও ব্যক্তি অথবা গোষ্ঠীর কর্তৃত্বে সরকার পরিচালিত হয়। কর্তৃত্ববাদীরা মনে করেন যে তাঁদের মনের সুশৃঙ্খল পথে সরকার পরিচালিত হওয়া মঙ্গলজনক অথবা নিদেনপক্ষে প্রয়োজনীয়। দুটি বিশ্বাস থেকে ধারণাটি গড়ে ওঠে:

১. রাষ্ট্রে কর্তৃত্বাধীন থাকাই কল্যাণকর, এবং

২. কর্তৃত্ব জনগণের সম্মতিসাপেক্ষ নয়, বরং বলা ভালো যে কর্তৃত্ব সম্মতির পূর্বশর্ত।

উগ্র কর্তৃত্ববাদীদের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রিক বাধ্যতার যুক্তিসিদ্ধ কোনও উৎস নেই। সেজন্য অসন্তোষের প্রতিকার তথা রাষ্ট্রের সুস্থিতির জন্য কর্তৃত্ববাদের প্রযোজন থাকে; প্রচলিত অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যের তাগিদেও কর্তৃত্ববাদ অপরিহার্য বলে তাঁদের অভিমত। উল্লিখিত তাত্ত্বিক প্রত্যয় ছাড়াও অনেক সময়ে ক্ষমতাসীন কায়েমি শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি অথবা গোষ্ঠীর আচরণেও কর্তৃত্ববাদ ফুটে ওঠে।

ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের একটি প্রবন্ধের নাম ‘কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে’। সেই প্রবন্ধে এঙ্গেলস দেখাচ্ছেন আধুনিক কালের বা শিল্পবিপ্লব পরবর্তীকালের বড় কারখানায় কীভাবে কর্তৃত্বের প্রয়োজন পড়ে। তিনি উদাহরণ হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই রেলের জটিল কর্মপ্রক্রিয়াকে উল্লেখ করেছেন। একজন ট্রেন ড্রাইভার স্বাধীনভাবে দশ মিনিটও কি একটি ট্রেন চালাতে পারবেন?

একজন সাধারণ জ্ঞান ধারণ করেন এরকম শ্রমিক খুব সহজেই কর্তৃত্বের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবেন। পুঁজিবাদী জটিল সমাজব্যবস্থায় পুঁজিপতি এবং সাম্রাজ্যবাদী নরপিশাচেরা নিপীড়নমূলক কর্তৃত্ব করেন গোটা দুনিয়ার শ্রমিক ও কৃষকের উপর। সেই কর্তৃত্বকে ধ্বংস করার মহান লড়াইয়ে নেমে এঙ্গেলসের ধারণাকে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার ধারণায় বিকশিত করেন লেনিন। এই গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদ মতবাদটি গোটা দুনিয়ার কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর গৃহীত একটি সাধারণ নীতি।

আর অন্যদিকে গোটা দুনিয়ায় শোষণ লুট চালিয়ে বিলাসি ইউরোপীয় নির্বোধ এবং পাকা বদমাশ লেখকেরা কর্তৃত্ব এবং কর্তৃত্ববাদী শাসন সম্পর্কে নঞর্থক বুলি ঝেড়েছে বিভিন্ন লেখা ও আবর্জনায়। সেরকম একটি লেখার নাম হচ্ছে ‘এনিমেল ফার্ম’। সেই লেখা লিখে  ইউরো-মার্কিনদের বাহবা পেয়েছে সেই পুঁজিবাদী ফার্মের সৃষ্ট বদমাশ জর্জ অরওয়েল (১৯০৩-১৯৪৯)।

ইউরোপীয় বদমায়েশ পুঁজিপতি ও তাদের দালাল দাসেরা মার্কসবাদের বিরোধিতা করেছে একচোখা দৈত্যের মতো। ইউরোপীয় এই বদমাশি দৃষ্টিভঙ্গিটি ইউরোপেই যাত্রা থামায়নি। সেটি বাংলাদেশের ঢাকাতেও পাকাপোক্ত আসন গেড়েছে। কেননা পরজীবী নির্বোধ লেখকের অভাব ঢাকার মতো এখন গোটা দুনিয়াতেই নেই। ফলে এখানকার উদারনীতিক ভাঁড়েরা মতপ্রকাশের উইট ও মজা নিতে গিয়ে সবাইকে তাদের মতোই নির্বোধ ঠাউরান।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিলো মানবেতিহাসের সবচেয়ে অগ্রগামি সমাজতন্ত্র অভিমুখি রাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথমবার ভ্রমণ করার পর মার্কিন সংগীতজ্ঞ পল রোবসনের (১৮৯৮ – ১৯৭৬) মনে হয়েছিল সেটি তাঁর নিজের ঘর, যেখানে সব মানুষ গোটা দুনিয়ার চেয়ে অগ্রগামী। তিনি লিখেছিলেন,

“মস্কোয় যা দেখেছি তা দেখার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। প্রতিটি মুখেই যেন তৃপ্তি আর আনন্দ। জানতাম এখানে অনাহার নেই। জীবন এখানে মুক্ত, নিরাপত্তায় পূর্ণ, প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরপুর, আর সর্বত্র দেখছি স্বাধীনতার অবাধ প্রকাশ। এ দেখার জন্য আমি তৈরি ছিলাম না। … আনন্দ, সুখ আর বন্ধুত্ব আমি অনুভব করেছি, ‘জাতি’ প্রশ্নে কোনো অসুবিধার মুখোমুখি আমাকে হতে হয়নি।

এরকম মুক্তসমাজের যারা বিরোধিতা করে তাদের কঠোর হাতে দমন করা দরকার। আমার আশা সোভিয়েত সরকার সেই কাজই করবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন আমার নিজের ঘর। নতুন সমাজ ব্যবস্থায় যে সোভিয়েত জনগণ বাস করছেন তাদের প্রতি আমি আত্মীয়তা অনুভব করছি। এই ধরনের অনুভূতি আমার কোথাও হয়নি। এখানে কোনো আতংক নেই। সমস্ত জাতির জনগণই এখানে সুখী। তারা তাদের সরকারকে সমর্থন করবে।”

এরকম মহান একটি দেশ সম্বন্ধে সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদীরা মিথ্যাচার ছাড়া কোনো কথাই বলতে পারেনি। যেমন পেঙ্গুইন সংস্করণের ভূমিকায় অরওয়েল নিজেই স্বীকার করেছেন, “অ্যানিমেল ফার্ম … প্রথমত রুশ বিপ্লবের ওপর একটি ব্যঙ্গাত্মক রচনা”। এইভাবেই অরওয়েল, পাস্তারনাক কিংবা সোল‌ঝি‌নেৎ‌সিনরা হয়ে যায় পুঁজিবাদী ফার্মের সেইসব শয়তান পশু যারা ব্যক্তিগত মালিকানার কাছে মগজটিকে বন্ধক দিয়ে একচোখা দৈত্যের মতো ঘোঁত ঘোঁত করে চাটতে থাকে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদীদের নোংরা পশ্চাৎদেশ।

রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান,প্রক্রিয়া ও ক্ষমতা ব্যাবহারের বিভিন্ন বিন্যাসই হচ্ছে রাজনৈতিক ব্যাবস্থা। রাজনৈতিক ব্যাবস্থা তুলনামূলক ইতিহাস প্রাচীন এবং এর শ্রেণীকরণের নানা রকম চেষ্টা লক্ষণীয় হলেও এক্ষেত্রে কোন মতৈক্য নেই। তবে সাধারণভাবে গণতন্ত্র,

ফ্যাসীবাদ, সমাজতন্ত্র ও আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদ– এ চারটি রূপের উপর ̧গুরুত্ব আরোপ করা হয়। গণতন্ত্রের অর্থ জনগণের সরকার। এটি এমন একটি শাসন ব্যাবস্থা “যেখানে সরকারের অবস্থানের জন্য ব্যাক্তি এবং গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা থাকে। এতে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে নেতা ও নীতি বাছাই করার ব্যাবস্থা থাকে। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট উন্নত গণতন্ত্র বলতে বোঝাতে চেয়েছেন এমন একটি রাজনৈতিক ব্যাবস্থা যেখানে সবাই রাজনৈতিকভাবে সমান, যৌথভাবে সার্বভৌম এবং নিজেদের শাসন করার জন্য  যে দক্ষতা, সম্পদ এবং প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন তার অধিকারী। অনেকে মনে করেন গণতন্ত্রের সাথে অনিবার্যভাবে যুক্ত গণতান্ত্রিক সংহতি যা কোন সমাজে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি এবং ব্যাবস্থা তৈরি হতে সাহায্য করে। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হচ্ছে পৌর সংস্কৃতি বা ‘সিভিক’ কালচার। জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস এবং রাজনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয় পৌর সংস্কৃতি । কেন গণতন্ত্র তৈরি হয় এ নিয়ে গবেষণা হয়েছে প্রচুর। সাইমুর এম. লিপসেটের মতে গণতন্ত্র বিকাশের জন্য ̧রুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী কয়েকটি উপাদান হল অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন, নগরায়ন ও শিক্ষা। তবে স্যামুয়েল হান্টিংটন এ ক্ষেত্রে মধ্যশ্রেণীর বিকাশকে সবচেয়ে ̧রুত্বপূর্ণ উপাদান বলে মনে করেন। ফ্যাসীবাদে রাষ্ট্রের সর্বাত্মক ক্ষমতা কুক্ষিগত করে একটি শাসক গোষ্ঠী যারা সমাজ জীবনকেও করে নিয়ন্ত্রণ। এতে নেতার অনুসারীদের উপর থাকে সীমাহীন কর্তৃত্ব। তাছাড়া কোন বিরোধিতা ফ্যাসীবাদে সহ্য করা হয় না। একটি নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা সৃষ্টির দাবী তুলে ধরা হয় যেখানে কোন শ্রেণীসংগ্রাম বা ধনী-দরিদ্রের মধ্যে সংঘাত থাকবে না। ফ্যাসীবাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল এটি কর্তৃত্ববাদ ও অসমতার উপর প্রতিষ্ঠিত। মার্কস্ -এর মতে সমাজতন্ত্র হবে এমন একটি ব্যাবস্থা যেখানে সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করবে সর্বহারা শ্রেণী। সম্পত্তি বা উৎপাদন উপায়ের উপর ব্যাক্তিমালিকানার ঘটবে অবসান এবং মুজুরী প্রদান করা হবে সাধারণ নীতিমালার উপর ভিত্তি করে। বুর্জোয়া শ্রেণীর উৎখাতের পর শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কতন্ত্র সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্রের কোন প্রয়োজন থাকবে না। সাম ̈বাদী সমাজে রাষ্ট্র পড়বে ঝরে। এ সমাজে থাকবে না শ্রমবিভাজন। শ্রম হবে মানুষের সৃষ্টিশীল সত্ত্বায় পরিপূর্ণতার প্রতীক। মার্কস্ -এর এ চিন্তার আলোকে বিভিন্ন দেশে সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়বার উদ্যাগ নেওয়া হলেও তাঁর ̄ স্পপ্ন বাস্থবায়িত হয়নি। বরঞ্চ বিরাজমান সমাজতন্ত্রের পতন ঘটেছে অনেক দেশে। উন্নয়শীল বিশ্বে বিরাজমান বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাবস্থার মধ্যে  সবচেয়ে ̧গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক বাদ। এ ব্যাবস্থা রাষ্ট্র এবং সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের ক্ষমতা থাকে ব্যাপক। সামরিক শাসন হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদের সবচেয়ে চরম রূপ।

দার্শনিক রাজা শাসিত সমাজ ব্যাবস্থায় আস্থাশীল প্লেটো গণতন্ত্রকে ভালো চোখে দেখেননি। তিনি দেখেছেন দার্শনিক রাজা পরিচালিত ন্যায় নির্ভর সমাজ (aristocracy of intellect ) আর তার শিষ্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক অ্যারিস্টটলের চোখে গণতন্ত্র ছিল ‘mob rule‘ বা জনতার শাসন প্রাচীন গ্রীক দার্শনিকরা বিশ্বাস করতেন সবাই শাসক হবার যোগ্য নন। অ্যারিস্টটল তার পলিটিক্স বইয়ে বলেছেন- ‘some are born to rule , some are born to be ruled ‘ ।বর্তমান সময় গণতন্ত্রের সময়। এমনকি একনায়কতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসকেরাও ও নিজেদের শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক নির্বাচন করেন ও নিজেদের গণতান্ত্রিক বলে দাবি করেন। সবাই যে নিজেকে গণতান্ত্রিক বলতে চান সে কথা লক্ষ্য করে Bernard crick তার in defense of politics বইতে লিখেছেন “democracy is perhaps the most promiscuous word in the world of public affairs . she is everybody’s mistress and yet somehow retains her magic even when her lover sees that her favors are being , in his light , illicitly shared by many another . indeed, even amid our pain at being denied her exclusive fidelity , we are proud of her adaptability to all sorts of circumstances, to all sorts of company .

পরস্পর বিরোধী প্রক্রিয়া বিশ্বায়নের প্রেক্ষিতে সমান্তরাল ভাবে চলছে – একদিকে জাতীয় রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার প্রয়াস অন্যদিকে অতিজাতীয় নাগরিকত্ব ধারণার প্রসার।

ভৌগোলিক সীমানার রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব অপ্রতিহত থাকলেও, (সাইবারস্পেস) মানুষের মন জগত এখন আর রাষ্ট্রে নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। এই দুই যুগ্ন বিপরীত প্রবাহের সাবেকি নাগরিকত্বের ধারণা চ্যালেঞ্জের মুখে। নাগরিক কে আজ সংকীর্ণ রাষ্ট্রীয় গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ রাখার দৃষ্টি ভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। সীমাহীন বিশ্ব বা border less world এ cosmopolitan citizenship ধারণা এখন প্রাসঙ্গিক । সাইবার দুনিয়ায় মানুষের মন-মনন-চিত্ত কে সীমানায় আঁটকে রাখা সম্ভব না ।

তথ্যসূত্র:

।সেন.অরুনকুমার,সেন.সুশিলকুমার,মুখোপাধ্যায়.শান্তিলালরাষ্ট্রবিজ্ঞান-১৯৯৫

সেন্ট্রাল এডুকেশন্যাল এন্টারপ্রাইস । কলকাতা ।

২।কবির.মোঃশাজাহান ।নূর. ফাতেমা গ্রিক রাষ্ট্রদর্শন বুক সোসাইটি ১৯৭৪ ঢাকা ।

৩।মহাপাত্র . আনাদিকুমার ।রাষ্ট্রবিজ্ঞান । সুহৃদ পাবলিকেশন ১৯৯৩ কলকাতা

৪।মুখোপাধ্যায়.গৌতম। রাজনৈকতার তত্ত্ব পরিচয়ঃ মৌলিক ধারণা .সেতু প্রকাশনী ২০১৮। কলকাতা

৫। এঙ্গেলস. ফ্রিডরিখ, “কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে”, মার্কস-এঙ্গেলস রচনা সংকলন, প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় অংশ, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৭১

৬। রোবসন. পল, “সোভিয়েত ইউনিয়ন আমার নিজের ঘরজানুয়ারি ১৯৩৫, তারেক হাসান সম্পাদিত শতবর্ষে রুশ বিপ্লব, দ্যু প্রকাশন, ঢাকা, অক্টোবর ২০১৭,

৭।ডেভিসন. পিটার, পেঙ্গুইন সংস্করণের ভূমিকা, এনিমেল ফার্ম,

Comments (2)

  1. Avatar

    মন্তব্য এবং কোটেশন এর সাবলীল বিশ্লেষণ লেখক এর বিষয়ভিত্তিক গভীরতা সুস্পষ্ট। সামগ্রিক লেখাটি থেকে আধুনিক উত্তর সময়ের চিন্তাবিদদের চিন্তাধারার একটি সাবলীল ধারণা পাওয়া যায়।
    কিন্তু সেই প্যান অপটিমাইজেশন থেকে মুক্তির উপায় কি ?
    লেখক এর চিন্তা গতি নিজস্বতায় ভর করে সে মুখী হয়ে ওঠার অপেক্ষায় থাকলাম।
    অভিনন্দন।

মন্তব্য করুন