উপন্যাসসাধুশ্মসানের উপকথা

সাধুশ্মশানের উপকথা │স্মৃতির জাদুঘর │ স্নেহাশিস রায়

স্মৃতির জাদুঘর

মিনু মাসির মৃত্যুর পর এক অদ্ভূত নিরবতা নামে বিশ্বাস বাড়ীতে। মিনু মাসির বিষন্নতার মূর্তিটি যেন, আগুনে পুড়ে, ধুমায়িত হয়ে, ঠাঁই নিয়েছে, সারা বাড়ীময়। অদূর ভবিষ্যতেই একটি ঘটনা, বাবাকে তাঁর অসফল আইন পেশাকে চিরতরে বিদায় দিতে সাহায্য করবে।  ঘটনাটি আমি অন্য একটি অংশে লিখবো।

আমার মা, অনু বিশ্বাসের  কঠিন সাংসারিক রূপটি ধীরে ধীরে যেনো মিইয়ে যেতে থাকে।  কঠোর তীক্ষ্ণ স্বরটি তাঁর কণ্ঠ থেকে বিদায় নেয়। করুণার মা কাজ করতে এসে, রান্নাঘর থেকে তেল-লবণ-মরিচ সরিয়ে নিলেও, মা আর কিছু বলে না। সকালে কাজে যায়। কাজ থেকে ফিরে, আরো সময় নিয়ে , ঈশ্বরের উপাসনা করে। ঠাকুর ঘরে, আরো কিছু ধর্মগ্রন্থ যোগ হয়। মা সেগুলো থেকে কিছু কিছু অংশ পাঠ করে, পূণ্যের পরিমান বাড়াতে থাকে। ক্রমবর্ধমান পূণ্যের সমানুপাতিক হারে সংসার থেকে দূরে সরে যেতে থাকে, অন্তত: কিছু সময়ের জন্য। সংসারের সাথে যতটুকু সম্পর্ক , তাও আমার নিমিত্তে। অফিসের কাজ, ও পূজার্চনা করে যতটুকু সময় পায়, তা আমার জন্য বরাদ্দ থাকে। সবকিছু থেকে  নিজেকে সরিয়ে নিলেও, মাতৃত্বের বন্ধন থেকে তিনি নিজেকে কখনোই আলাদা করেন নি। কোথাও গেলে, মাকে কেউ কিছু খেতে দিলে, মা কখনোই খেতেন না। ব্যাগে করে আমার জন্য বয়ে আনতেন। বাবার সাথে মায়ের কথা হতো। কিন্তু প্রয়োজনের বাইরে নয়। বাবা -মা দু’জনই আমাকে ভালোবাসতেন। দু’জনের ভালোবাসা যেন এক বিন্দুতে এসে মিশেছে। তাঁদের দু’জনের সম্পর্ক যেন এটুকুই। আমার অস্তিত্ব যেন একমাত্র সেতুবন্ধন। আগের মতো, রাগ বা উচ্ছ্বাস নেই। মিনু মাসি যেন মরে গিয়েও মা-বাবার মাঝে অদৃশ্য দেয়াল তুলে গিয়েছে।

মিনু মাসির ঘরটি ছিল বাড়ীর পূব দিকে। মারা যাওয়া পর, কেউ আর সে ঘরে ঘুমায় নি। পূব দিকে দিনের আলো ফুটতো ঠিকই, কিন্তু মিনু মাসির চলে যাবার পর, সেই জানালাটি কদাচিত খোলা হতো। সকাল বেলা, বিশেষ করে শীতের সকালে, যখন রোদ উঠতো, পূব দিকের কাঠের জানালার অকিঞ্চিৎ ফাঁক দিয়ে, আশ্চর্য উজ্জ্বল সূর্যরশ্মি প্রবেশ করতো। আবছা অন্ধকার ঘরে, সেই সূর্যরশ্মি, ঘরের অদৃশ্য ধুলো আর ধুয়াকে প্রজ্জ্বলিত করতো। আমি হাত বাড়িয়ে সূর্যরশ্মিকে ধরার চেষ্টা করতাম। অধরা সোনালী সুতা, কখনোই হাতে ধরা দিতো না। বরং হাত সঞ্চালনের ফলে, ঘরের নিস্তরঙ্গ বাতাসে আলোড়ন উঠতেই,  সূর্যরশ্মিটি যেন আরো বর্ণিল হয়ে উঠতো। আলো থিতু হলেই, ফের নাড়িয়ে দিতাম। এভাবেই সূর্যরশ্মির সাথে, আমার খেলাটি জমে উঠতো।

শিশুরা মৃত স্বজনের জন্য শূণ্যতা অনুভব করে, কিন্তু বড়দের মতো করে নয়। ছেলেবেলায় হারিয়ে ফেলা প্রিয় মানুষের জন্য, শিশুরা দিনের পর দিন অশ্রু ফেলে না। বরং তাঁদের মাঝে গভীর এক শূণ্যতা তৈরী হয়, যা তাঁর কাছে অবোধগম্য। আজ যেমন করে, মিনুমাসির অভাব অনুভব করি, মিনু মাসির স্নেহ-পূর্ণ মুখটি যেমন করে চোখে ভাসে, যেমন করে মিনু মাসির অভাবটি ভাষায় প্রকাশ করতে পারি, ছেলেবেলায় ঠিক তেমন করে, মিনু মাসির অভাবটি অনুভব করেছি বলে আমার মনে পড়ে না। অন্তত: সচেতনভাবে অনুভব করি নি। কিন্তু কখনো কখনো  আমি অকারণেই এসে মিনু মাসির ঘরে গিয়ে, দরজা বন্ধ করে বসে থাকতাম। কখনো কখনো , মা-বাবা কোন কিছু নিয়ে শাসন করলে, এই ঘরটিই ছিল আমার পৃথিবীর সকল রূঢ়তা থেকে, পালিয়ে আসার স্থান। শীতল এই পৃথিবীর মাঝে, মিনু মাসির ফেলে যাওয়া, বাসী বাতাসে পূর্ণ ঘরটিই ছিল, ছিল একমাত্র উষ্ণতার পরশ।

আমি ঘরটিতে ঢুকে, আপন মনে কথা বলতাম। ঘোড়া চালাতাম, দূর কোন দেশে রাক্ষষপুরীর দরজা উন্মোচন করতাম, সোনার কাঠির স্পর্শে কোন রাজকন্যাকে ঘুম পাড়াতাম, পুকুরে ডুব দিয়ে কৃষ্ণভ্রমর তুলে আনতাম। আবার কখনো, মিনু মাসির আলমারীর ডালা খুলে, তাঁর ফেলে যাওয়া জিনিস-পত্র, কাপড়-চোপড় স্পর্শ করে দেখতাম। মিনু মাসির আলমারীর নিচ তাকে ছিল, একটা মাঝারী আকারের তালাবদ্ধ ট্রাংক। ট্রাংকের রঙ কি ছিল, তা বোঝার উপায় ছিল না। সময়ের সাথে সাথে, রঙ উঠে গেছে।

তালা ও তালার আংটায়, যদিও জং ধরেছে, তারপরও যথেষ্ট শক্ত। মিনু মাসি যখন জীবিত ছিলেন, তখন দেখতাম, মিনু মাসি ট্রাংক খুলে কি যেন দেখতো, কিন্তু কেউ এলেই, ট্রাংকের ডালা বন্ধ করে, তালা লাগিয়ে দিত। একবার মিনু মাসিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ট্রাংকের ভেতর কি?

মিনু মাসি গম্ভীর ভাবে বলেছিল, খুব ভারী পাথরের চাঁই।

আমি মিনু মাসির সে কথা বিশ্বাস করেছিলাম। আমি মিনু মাসির ট্রাংকের ভেতর জমিয়ে রাখা পাথরের চাঁইগুলো দেখতে চাইতাম। কিন্তু ট্রাংকের তালার চাবি কারো কাছে নেই। তাই ট্রাংকে লুকিয়ে রাখা পাথরের চাঁই আমার দেখা হয়ে উঠতো না।

ধীরে ধীরে, আমি শিশু থেকে কিশোর হয়ে উঠি। আমার শৈশবের দু:খবিলাসের স্থানটি, ক্রমে ক্রমেই বাড়ীর ভদ্রস্থ এক ভাঁড়ারে পরিণত হতে থাকে। শৈশবের কল্পনাবিলাসের স্থলে, বিভিন্ন অর্থপূর্ণ খেলাধূলা এসে জায়গা নিতে শুরু করে। সমবয়সীদের সাথে ক্রিকেট-ফুটবল খেলি।  ক্রিকেট  নিয়ে একটু বেশীই মত্ত হয়ে যাই। মা আমার ক্রিকেট বলটিকে লুকিয়ে রাখে। ক্রিকেট বলটিকে খুঁজতে খুঁজতেই, আমি একদিন মিনুমাসির  ঘরে প্রবেশ করি। বাসী বাতাসে পূর্ণ বদ্ধ ঘর। এখানে সেখানে ছড়িয়ে থাকা, সংসারের হরেক জিনিসের বিশৃঙ্খলতা পাশ কাটিয়ে, মিনু মাসির আলমারীটি খুলি। আলমারীর নিচ তাকে, মিনু মাসির ট্রাংকটি ঠিক তেমনি আছে। ট্রাংকে যদিও  তালাটি লাগানো, কিন্তু ট্রাংকে তালা লাগানোর আংটাটি, মরিচা ধরে ধরে খুলে গেছে। আমি ততদিনে বুঝে গেছি, মিনু মাসির ট্রাংকে আক্ষরিক অর্থে পাথরের চাঁই থাকা সম্ভব নয়। ট্রাংকের ডালাটি খুলি। ন্যাপথালিনের গন্ধ মেশানো পুরোনো বাক্সের গন্ধ আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।

বহুবছর পর, আমার কাছে মনে হয়েছে, মিনু মাসির ট্রাংকটি যেন এক স্মৃতির জাদুঘর। শৈশব থেকে তাঁর বত্রিশ বছরের জীবনের , বিভিন্ন স্মৃতি থরে থরে সাজানো। সব-হারানো অকাল প্রয়াত: মিনু মাসির ট্রাংক যেন সত্যিই ভরা আছে ভারী পাথরের চাঁই-এ।

মিনু মাসি সবকিছুই, একটি নির্দিষ্ট ক্রমে গুছিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন। ট্রাংকের ভেতর, স্মৃতির জাদুঘরটিও এর ব্যতিক্রম কিছু ছিল না। কার্ডবোর্ড কেটে, মিনুমাসি ট্রাংকটিকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছিলেন। একটু খেয়াল করলেই বুঝা যায়, একেবারে বামপাশে, ছিল তাঁর শৈশব,কৈশোর। মাঝখানে যৌবন। আর ডান পাশে তাঁর বিবাহ আর বৈধব্য।

যদিও, মিনু মাসির বৈধব্যের জন্য আলাদা কুঠুরী হতে পারতো। কিন্তু বৈধব্যের কোন কুঠুরী ছিল না। বৈধব্যের রঙ সাদা। কিন্তু মিনু মাসির স্মৃতির প্রতিটি কুঠুরী ছিল উজ্জ্বল রঙের সামাহার। সাদা রঙের এক টুকরো সুতোর চিহ্নও ছিল না, কোথাও। যদিও ব্যাপারটি কাকতালীয়ও হতে পারে, কিন্তু জাদুঘরটি যখন মিনু মাসির, তখন, আমার বদ্ধমূল ধারণা, তিনি এটি সচেতন ভাবেই করেছেনে। বাড়ীর কেউ সাদা পোষাক পরলেই, মিনু মাসি পোষাকটি লুকিয়ে ধ্বংস করে ফেলতেন। আমার দাদু রাইচরণের সাদা পাঞ্জাবীগুলো, আর সাদা শাল, একটি একটি করে হারিয়ে যায়। ঠিক এমনি ভাবে আমার বাবা অধীর সিংহের, সদ্য বানানো সাদা শার্ট, একদিন পরার পর উধাও। মা বিষয়টি জানতো, তাই আমার জন্য যে পোষাক কেনা হতো, তা ভুলক্রমেও সাদা নয়। সাদা কাপড় শুধুই মিনু মাসির, যা নিতান্ত বাধ্য হয়ে পরতে হতো তাঁকে। তাই বৈধব্যের সাদার প্রতি ছিল, তাঁর অবিচল ঘৃণা।

তারপরও মিনু মাসির বিবাহ কুঠুরী থেকে, তাঁর বিবাহ পরবর্তী জীবনের কুঠুরী আলাদা হতে পারতো। খুব সম্ভবত: চতুর্থ কুঠুরী তৈরী করার যথেষ্ট স্থান ছিল না, ট্রাংকের ভেতর। অথবা , ইচ্ছে করেই তৈরী করে নি মিনু মাসি।

বহুদিন আগে একসন্ধ্যায়, ‘বিবাহ ও বৈধব্য’ কুঠুরীর একটি স্মৃতিচিহ্ন, খুব সঙ্গোপনে, আঁধারে ঢাকা খালের জলে ফেলে দিয়ে এসেছিলাম। পথের পাঁচালীর অপু যেমন করে দূর্গার চুরি করা গয়না, পুকুরে ফেলে দিয়ে এসেছিল, অনেকটা সে রকম। এই স্মৃতি চিহ্নটি মিনু মাসির জীবনের কোন নির্দিষ্ট সময়ের, তা নিয়ে, আমার মনের মাঝে বিশাল প্রশ্নবোধক তৈরী হয়েছিল। সেই সংশয়  এখনো আছে। আমার কাছে মনে হয়েছিল, মিনু মাসির স্মৃতির জাদুঘরের এই স্মৃতিচিহ্নটি,  হয়তো জাদুঘরেরই অংশ, তারপরও বেশ বেমানান। এমনকি, তা মিনু মাসির পুরো জীবনের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ।

বহুদিন আগে দেখা, সেই স্মৃতির জাদুঘরের, অসংখ্য স্মৃতি চিহ্নের সবগুলো আমার মনে নেই, কিন্তু কিছু কিছু দিব্যি আমার চোখে ভাসে। আজ স্মৃতির জাদুঘরের কথা লিখতে গিয়ে, মনে হচ্ছে, গ্রীষ্মের সেই দুপুরে, আমি প্রথম বারের মতো ট্রাংকের ঢাকনাটি খুলছি।

সর্ববামে শৈশবের কুঠুরীতে, একটা টিনের বিবর্ণ কৌটা। ঢাকনা খুলতেই দেখি, পুতুলের বিছানায়, দু’টি মাটির পুতুল। পুতুলের পরণে, বর বঁধুর সাজ। বাংলাদেশের পাড়া গাঁয়ের মাটির পুতুল নয়। পীতবর্ণ পুতুলের, নাক-মুখ নি:খুতভাবে ফুটিয়ে তোলা। খুব সম্ভবত: খুব ছোটবেলায়, যে সময়টিতে মিনু মাসি ভারতের চন্দননগরে ছিল, তখন থেকেই পুতুল দু’টি তাঁর সঙ্গী।

একটা চুলের ফিতা। লাল। সময়ের সাথে, লাল রঙটি ফিকে হয়েছে। আমি হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখি-এই ফিতা একদিন কিশোরী মিনুর চুলে শোভা পেত। সবুজ একটা পুঁতির মালা। এক জোড়া ছোট আকারের কানের দুল। কিশোরীর হাতের মাপের, লাল-সবুজ-বেগুনী রঙবেরঙের চুড়ি। একটা গোলাপী রঙের ফ্রক। হাতা দু’টি ফাঁপানো। ফ্রকের প্রান্তভাগে লেসের ঝালর।

বাঁশ কাগজের বাদামী মলাট লাগানো একটি খাতা। খাতার উপর মিনু মাসির নাম ।’মিনতি বিশ্বাস, পঞ্চম শ্রেণী, গ্রাম: সাধুশ্মশান।’ খাতার কাভার উল্টাই। একটা ময়ুর-পালকের অগ্রভাগ ,শ্রীকৃষ্ণের মাথার মুকুটে যেমনটা থাকে। পালকের সবুজ, বেগুনী আভা একটুও কমে নি।  লাইন টানা খাতার, প্রথম পাতায়, শিশুতোষ হাতে লেখা, একটি কবিতার প্রথম দশ লাইন।

“নির্মল তরুণ উষা, শান্ত নদীর,

শিহরি, শিহরি উঠে, শান্ত নদীর নীড়।…”

খাতাটির পাশেই, রানী ভিক্টোরিয়ার ছবি আঁকা এক বাল্যশিক্ষার বই।

একটা বেগুনী ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো। কাঁচের টুকরোর উৎস কি , আন্দাজ করা কঠিন। হয়তো, টুকরোটির সাথে, তাঁর শৈশবের কোন স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বিবর্ণ হলুদ রঙের একটা পেন্সিল, এক মাথায় গোলাপী রাবার। রাবারের কিছু অংশ ক্ষয়িত। রাবারকে আটকে রাখা টিনের গোলাকার পাতে দাঁতে- কামড়ানোর দাগ। একটা পেন্সিল কাটার।একটি কালির দোয়াত। ভেতরের কালি শুকিয়ে কাঠ। দোয়াতের পাশে, সুঁচালো নিবের একটি কাঠের কলম। মাঝ বরাবর ছিদ্র করা একটা আম-ছুলানোর ঝিঁনুকের খোল। ( কাঁচা আম খুব প্রিয় ছিল মিনুমাসির। ছেলেবেলায় দেখেছি, কাঁচা আম কেটে, শুকিয়ে ফলসি বানাতো মিনু মাসি। কাঁচা আম ভীষণ সরু করে পলে, কাঁচা মরিচ, ধনে পাতা, লবন মিশিয়ে, আম-ভর্তা করতো মিনু মাসি। সেই আম-ভর্তার কথা মনে হলে, আমার আজও জিভে জল এসে যায়।)

ট্রাংকের দেয়াল ঘেঁষে, দাঁড়িয়ে আছে, পাতলা টিনের তৈরী পাউডারের কৌটা, যার উপরের দিকে একটা অংশ কাটা। হাতে নিয়ে ঝাঁকি দিতেই , ঝন ঝন করে উঠলো, মিনু মাসির শিশু কালের জমানো পয়সাগুলো। তিন যুগ আগে জমানো, পয়সার ঝনঝনানির শব্দ, যেন আমার সামনে কালের দরজা খুলে দিলো। মনে হলো, মিনু মাসি, গোলাপী ফ্রকে, কখনো আমাদের বাড়ীর উঠানে দৌড়ে বেড়াচ্ছে, কখনো পাটি বিছিয়ে, স্কুলের খাতায় কবিতা লিখছে , মাঝে মাঝেই, দোয়াতে চুবিয়ে নিচ্ছে তার হাতের কলম, কখনো কাঁচ-মিঠা আম গাছটির নিচে যেখানে , মিনু মাসিকে শেষবারের মতো শুইয়ে দেয়া হয়েছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে, হাতের ঝিনুক দিয়ে কাঁচা আমের ছাল ছাড়াচ্ছে। আহা! সময়, সময়, আর সময়। ধাবমান সময়, শুধু স্মৃতিগুলো পড়ে থাকে। মানুষ কি সত্যিই একদিন কালের গর্ভ থেকে স্মৃতিগুলো নির্ভূলভাবে উদ্ধার করার যন্ত্রটি আবিষ্কার করবে?

মাঝের কুঠুরীর, শাড়ী-ব্লাউজ দেখেই বুঝা যায়, এই কুঠুরীর স্মৃতিগুলো তাঁর যৌবনের। শৈশবের স্মৃতিগুলো, কেন ‘স্মৃতির জাদুঘরে’র অংশ হয়ে উঠেছে, তা বোধগম্য। কিন্তু যৌবনের কিছু স্মৃতিচিহ্ন, কেন তাঁর স্মৃতির জাদুঘরে স্থান করে নিয়েছিল,তা নিয়ে কৌতুহল জাগে। যেমন যৌবন কুঠুরীর একটা বড় জায়গা দখল করেছিল, দু’টি শাড়ী । একটি তাঁতের , সবুজ সুতায় বুনা। অন্যটি , চওড়া লাল রঙের পার, ঘিয়া রঙের জমিন। লম্বা হাতার ব্লাউজ একটা। হাতায়, গলায়, সেলাই করা কাপড়ের ঝাঁলর। মিনু মাসির অনেক শাড়ীই আলমারীতে আছে, কিন্তু এই দু’টি শাড়ী আলাদা করে কেন স্মৃতির জাদুঘরে ঠাঁই দিয়েছিলেন? এগুলো কি তাঁর জীবনের প্রথম শাড়ী, নাকি, জীবনের অন্য কোন স্মৃতি জড়িয়ে আছে, শাড়ী দু’টোর সাথে, আমার জানতে ইচ্ছে করে।

 আমি কোন দিন মিনু মাসিকে খোঁপা বাঁধতে দেখি নি। ট্রাংকের ভেতর যৌবন কুঠুরীতে পরে থাকা, কালো রঙের সাপের মতো লম্বা টারসেল , আর ঝুঁমকা-ওয়ালা রূপোর চুলের কাঁটা, আর পাশে পড়ে থাকা পিতলের কাজলদানী, পাওডার কেস দেখে, আমার মনে হলো, মিনু মাসি চিরকাল বিধবা ছিলেন না। আমি ভাবতে লাগলাম, শাড়ীতে , চুলের খোঁপায়, চোখের কাজলে, যুবতী মিনু মাসিকে ঠিক কেমন লাগতো? গ্রামে গঞ্জে, তখন ক্যামেরা ছিল না। থাকলে, হয়তো সাদা কালো যুগের নায়িকার সাজ-সজ্জায় তোলা দু’একটা ছবি নিশ্চিত থাকতো। আমি ভাবার চেষ্টা করি, মিনু মাসিকে সাদা কালো যুগের কোন নায়িকার মতো লাগতো?

একটা  পার্স, লাল উলে বোনা। ভেতরে শুধু এক জোড়া কানের দুল। আর একটি হাতের বালা। বেশ পুরাতন ডিজাইনের । এধরণের দুল এখন আর দেখা যায় না। গয়নাগুলো স্বর্ণের, কিন্তু সময়ের সাথে দ্যুতি হারিয়েছে। পাক-ভারতের যুদ্ধের ডামাডোলের মাঝে, আমার দিদিমা একদিন হঠাৎ করেই ঘুম থেকে আর জেগে উঠে নি। ঘুমের মাঝেই আমার দিদিমার সালংকরা মৃত্যু হয়। আন্দাজ করা যায়, গয়নাগুলো আমার দিদিমার। মিনু মাসি যুদ্ধের , যুদ্ধের পরবর্তী অনটনের দিনগুলোতে, অর্থকষ্টের মাঝেও, গয়নাগুলো প্রাণপণে আগলে রেখেছিল।

ট্রাংকের তলায় ভাঁজ করা তাঁতের শাড়ীটির উপর, একটি বই। মুদ্রণ যন্ত্রে ছাপা, শরৎ চন্দ্রের দত্তা। শরৎ চন্দ্রের প্রায় সব বই, আমাদের বাড়ীর বইয়ের আলমারীতে ছিল। আমি তখন সবেমাত্র শরৎচন্দ্র পড়তে শুরু করেছি। আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে, শরৎচন্দ্রের অজস্র উপন্যাসের মাঝ থেকে কেনো দত্তাকে আলাদা করে নিয়েছিলেন মিনু মাসি? উপন্যাসটির সাথে মিনু মাসির আত্মিক সম্পর্কটি কি?

দত্তার পাশেই, মলিন হলদেটে কাগজের লম্বাটে একটা পুঁথি। পদ্মপূরাণ। ছাপার অক্ষর নয়, বইটিই পুরোটাই হাতে লিখা। মিনু মাসি, আমাকে পদ্মপুরাণের গল্প শুনাতেন। মাঝে মাঝেই পদ্মপূরাণ থেকে, ছন্দবদ্ধ পদ্য বলে উঠতেন। চাঁদ সওদাগর যখন, দেবী মনসাকে ‘কানি’ বলে সম্বোধন করতো, আমার হাসি পেতো। ভেলায় ভাসানো লক্ষীন্দরের উজানে যাত্রার গল্প আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। মাসির প্রিয় ছিল, পদ্মপূরাণের শেষ অংশটি। বেহুলা লক্ষীন্দরকে জীবিত করে তুলেছে। তারপর স্বর্গে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ‘শোন শোন লক্ষীন্দর,পূর্বজন্মের কথা স্মরণ কর, আমরা ছিলাম স্বর্গের বিদ্যাধর।’ মিনুমাসির চোখ ছলছল করে উঠতো। আমার মনে হতো, বিধবার সাদা শাড়ীতে মিনু মাসি যেন এক বেহুলা। শুধু পার্থক্য এটুকুই যে, মিনু মাসি, পাকিস্তানী মিলিটারীর গুলিতে নিহত স্বামীকে আর জীবিত করে তুলতে সক্ষম হয় নি। আমার ছেলেবেলার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো, মিনু মাসির মুখে শুনা এই পদ্মপূরাণ। পদ্মপুরাণের গল্প ছাড়া, আমার শৈশব অপূর্ণ রয়ে যেতো।

যৌবন কুঠুরীর অন্যপ্রান্তে একটা বাদামি খাম। খামের ভেতরে,  মিনু মাসির মেট্রিক্যুলেশানের সার্টিফিকেট , একটা রশিদ- ক্যালকাটা মুসলিম জুয়েলার্স থেকে কেনা, এক জোড়া কানের দুলের ওজন , দাম ইত্যাদির হিসেব নিকেশ। খামের উপর, বীজগণিতের নোট বই, আর একটা কালো রঙের ঝরণার কলাম, শেফার্স ব্রান্ডের। পাশেই একটা স্বচ্ছ বোতল। বোতলের ভেতর পেঁচিয়ে রাখা, নোটগুলোতে, উর্দু হরফ আর জিন্নাহর ছবি দেখে স্পষ্টতই, সংগ্রহকালের সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

একেবারের ডান পাশের কুঠুরীর স্মৃতিচিহ্নগুলো, খানিকটা এলোমেলো। ঠিক কালক্রমের হিসেব করে সাজানো নয়। সম্ভবত: সত্তর সাল থেকে, তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সময়ের স্মৃতিচিহ্ন এগুলো। মিনু মাসির বিবাহ আর নাতীদীর্ঘ বিবাহিত জীবনের কিছু স্মৃতিচিহ্নের সাথে, যুদ্ধের পর তাঁর বৈধ্যব্য জীবনের কিছু  জিনিসের ঠাঁই হয়েছিল এই কুঠুরীতে।

এই কুঠুরীর সবচেয়ে, দৃষ্টি-কারা বস্তু ছিল,  লাল রঙের একটি বেনারসী শাড়ী, পারে সোনালী সুতার কাজ। মুহুর্তের জন্য মনে হলো, মিনু মাসি যেন, আমার ঠিক পেছনে তাঁর সেগুন কাঠের পালংকে , লাল শাড়ী পরে বসে আছে। পেছনে ফিরে দেখলাম। মিনু মাসির পালংকে এখন কেবলই শূণ্যতা।  বিবাহের নিমন্ত্রণপত্রটি ছিল, ঠিক লাল-বেনারসীর উপরেই । বড় এক শঙ্খের ছাপ দেওয়া, পত্রটির উপরে, লেখা ছিল ‘প্রজাপতৈ: নম:’। মাঝা-মাঝি, উল্লম্ব রেখায় বিভক্ত, বর ও কনের আলাদা আলাদা পরিচিতি। নিচে, আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দের প্রতি সনির্বন্ধ অনুরোধ, আমার দাদু রাইচরণের।

ঠিক পাশেই, বেগুনী ভেলভেট কাপড়ে আচ্ছাদিত বাক্সের ভেতর একটা রূপার সিঁদুরের কৌটো, এক জোড়া শাখা, ছোট আকারের একটা শঙ্খ। একটা কসকো সাবান, মোড়কে আঁকা অপার্থিব এক নারী, যার কপালে বক্রায়িত চুলের ফ্যাশান, অবোধগম্য দৃষ্টিতে  যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে।  একটা কাগজের হলুদ খাম। খামের ভেতর ,  পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ের দু’টি টিকেট আর জয়া-দূর্গা হোটেলের রশিদ। রশিদে গ্রাহকের নাম উল্লেখ করা আছে, ডা: অখিলেশ রায়,  মিনু মাসির প্রয়াত: স্বামী। খুব সম্ভবত: বিয়ের পর, মিনু মাসির প্রথম  শহরভ্রমণের স্মৃতি চিহ্ন এগুলো।

বাক্সের অন্যপ্রান্তে, সবুজ উলে বুনা, একটা অসম্পূর্ণ জাম্পার। জাম্পারের গলার দিকের কাজ শেষ হয়নি কখনোই।  পাশেই পড়ে আছে, সবুজ আর হলুদ দুটি উল সুতার বল। অসম্পূর্ণ সবুজ জাম্পারের বুকে, হলুদ সুতায় আঁকা হরিণটি সম্পূর্ণ। হরিণের শিংও অপূর্ণ নয়। শুধু যাঁর জন্য বোনা হচ্ছিল এই জাম্পার , সে নিহত হয়েছে, পাক-সেনাদের বুলেটে। আর, যুগ না ঘুরতেই, যে একদিন বুনছিল, সবুজ আর হলুদের মিহি ভালোবাসা, সেও আর পৃথিবীতে নেই।

মুক্তিযুদ্ধের পর তাঁর বৈধব্য জীবনে, মিনু মাসির প্রিয় বলতে যা কিছু ছিল, তা হলো তাঁর প্রিয় ভগ্নীপুত্র অভিনন্দনের শিশুকালের স্মৃতি। শিশু অভিনন্দনের প্রথম জামা। বুকের উপর সুতোয় কাজ করা, বেগুনী রঙের জামা। একটা পীত রঙের নেংটি। আগুনের শিখা থেকে কাজল তোলার, একটি পিতলের কাজল দানী। আমার অন্নপ্রাশনের শোলার মুকুট। ছোট একটা পাঞ্জাবী, সম্ভবত: এটিও আমার অন্নপ্রাশনের। আমার ছোট হয়ে যাওয়া, ইংলিশ প্যান্ট , আর ইংলিশ হাফশার্ট। কাঠের শ্লেট, আর চক খড়ি। সম্ভবত: স্বরস্বতী পুজোয়, আমার হাত-খড়ি অনুষ্ঠানের নিদর্শন। আর সেই বিখ্যাত জন্মদিনের ছবিটি।

আমি অনেকক্ষণ  মা, মিনুমাসি, বাবা, আর আমার সেই বিখ্যাত ছবিটির দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমার আবেগ তখন, খানিকটা পরিণত। আমার মনে আছে, ছবিটির দিকে তাকিয়ে, আমি হাপুস নয়নে কেঁদেছিলাম। মানুষ আসলেই তাঁর স্মৃতির কারাগারের এক বন্দী।

ট্রাংকের ডালাটি বন্ধ করতে গিয়ে, আমার নজরে পড়ে, বিবাহ কুঠুরী তলায় বিছিয়ে রাখা খবরের কাগজের নিচ থেকে কিছু একটা উঁকি দিচ্ছে। বের করে আনলাম। প্লাস্টিকের খাঁপে প্যাঁচানো, বড়দের বেলুন। আমি আর আরতি ছেলেবেলায়, দোকান থেকে রাজা বেলুন কিনে, মুখ দিয়ে ফুলিয়েছি। মুখে লুব্রিকেন্ট লেগেছে, পরোয়া করি নি।  ছেলে বেলায়, সে বেলুনের কোন পূর্ণবয়ষ্ক ব্যবহার থাকতে পারে, তা ছিল আমাদের ভাবনার অতীত। দশম শ্রেণীতে ছাত্র হিসেবে , আমি অনেক কিছুই জানি তখন। আমার প্রথমেই, মনে হলো, এটি কি আমার মায়ের আলমারী থেকে  হারিয়ে যাওয়া সেই বেলুন গুলোর একটি?

যেহেতু, সর্বডানের কুঠুরীর নিদর্শনগুলো দীর্ঘ দশ বছরের। মিনু মাসির স্বামী ডাক্তার ছিলেন। মিনু মাসির বিবাহের দশ মাসেও , সন্তান ধারণ করে নি। এটি খুবই সম্ভব যে, পূর্ণবয়ষ্ক বেলুনটি মিনু মাসির বিবাহিত জীবনের। হয়তো, মিনু মাসি এখানে এটি ইচ্ছে করেও রাখে নি।  এই ট্রাংক স্মৃতির জাদুঘর হয়ে উঠার আগেই, কোন ভাবে বেলুনটি কাগজের ভাঁজে ঢুকে যায়। মিনু মাসির হয়তো জানাও ছিল না।

কিন্তু যেহেতু মিনু মাসি তাঁর বৈধব্যের কুঠুরী থেকে, বিবাহ আলাদা করেন নি। তাই নিশ্চিত হয়ে বলা কি যায়? বিশেষত: যখন হারানো বেলুন নিয়ে, পূর্ণবয়ষ্করা অশ্রুপাত করে।

পূর্ণবয়ষ্কদের বেলুনটি ঠিক কোন সময়ের সেটির মীমাংসা না হলেও, বেলুনটি যে স্মৃতির জাদুঘরের সাথে বেমানান সে সিদ্ধান্তটুকু নিতে , আমার একটুও দেরী হয় নি। আমি বেলুনটিকে, প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে নিই। সেদিন বিকেলে, আমি আর ক্রিকেট খেলতে যাই না। সন্ধ্যায়, যখন স্তব্ধ হয়ে যায় গাঁয়ের বাতাস, তখন চুপি চুপি খালের পারে যাই, সকলের অলক্ষ্যে বেলুনটি ছুঁড়ে দিই খালের অগভীর জলে।

তারপর ঘরে ফিরি। পড়ার টেবিলে, বিজলী বাতির আলোয়, অংক কষি, বিজ্ঞান পড়ি। আর একটা অমীমাংসিত প্রশ্নের খঁচ-খঁচানি নিয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকি।

মন্তব্য করুন