উপন্যাসসাধুশ্মসানের উপকথা

সাধুশ্মশানের উপকথা │ সম্পর্কের চতুর্ভূজ │ স্নেহাশিস রায়

সম্পর্কের চতুর্ভূজ

দিন তারিখের হিসেব আমার ভালো মনে থাকে না । অনেকটা কাকতালীয়ভাবে মনে পড়লো, আজ আমার জন্ম দিন। হিসেব করে দেখি , পঁয়তাল্লিশ বছর। স্নানঘরের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখলাম। মুখের ত্বক, এখনো সজীব। তবে ইদানিং চোখের নিচে কালি জমেছে। চুলে পাক ধরেছে। বেশ ক’দিন ধরে শেভ করা হয় না। খোঁচা খোঁচা দাড়ির অনেকগুলোই পাকা। আগে জন্মদিন এলেই , লোকজন শুভেচ্ছা জানাতো। বছর খানেক আগেও আমার কর্মস্থলে, ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে , কেউ জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে এলে, আমাকে বলতে হতো ‘ধন্যবাদ’। সাথে দু’চার কথা। আমি ইংরেজীতে বলতাম, ‘আই অ্যাম ট্রুলি অনার্ড’। ইংরেজীতে বললে পুরো ব্যাপারটিই সহজ হয়ে যায়। নিজস্ব আবেগকে স্পর্শ না করলেও চলে। আবেগবিহীন মিথ্যাচারটি সহজ হয়ে উঠে। আজ কিছুটা হলেও, স্বস্তি বোধ করছি, কারণ আজ আর আমাকে মিথ্যে আবেগ জাগাতে হবে না। মিথ্যে করে বলতে হবে না, আমি জন্মদিনে বিশেষভাবে আহ্লাদিত।

আমার ব্যক্তিগত জীবনের কোন কোন বন্ধু, হয়তো জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে পারতো । কিন্তু তাঁদের কারো কাছেই আমার বর্তমান ঠিকানাটি নেই। এমনকি ডিজিটাল ঠিকানাটিও নয়। আমি যে খুব স্বেচ্ছায় , এই নির্বাসনটি বেছে নিয়েছি তা নয়। অনেকটা বাধ্য হয়েই, আমাকে কর্মস্থলটি ছাড়তে হয়েছে। এবং কারণটি এতোটাই গুরুতর যে , আমার পক্ষে আর পেশাদার জীবনে প্রবেশ করা সম্ভব নয়।

আমার এক কন্যা আছে, আমি ঠিক জানি না, বাবার ব্যাপারে সে ঠিক কতটা আগ্রহী। আমাদের কথা হয় না। সে তাঁর মায়ের সাথে, আমেরিকায় থাকে। আমার স্ত্রীর সাথেও আমার কোন যোগাযোগ নেই। স্ত্রী বলছি, কারণ কথার সাথে আমার কাগজে কলমে ছাড়াছাড়ি হয় নি। আমি তাকে ঘৃণা করি না। সম্ভবত: সেও আর আমাকে ঘৃণা করে না। ঘৃণা নয়, ভালোবাসা নয়, একধরণের বিচ্ছিন্নতা। আমরা আর পরষ্পরকে অনুভব করি না। এমন এক বিচ্ছিন্নতা যেখানে বিবাহ অথবা বিবাহ-বিচ্ছেদ দু’টিই সমানভাবে অর্থহীন।

কথার সাথে প্রণয়, এবং বিবাহের উষ্ণ দিনগুলোতে, সে আমার জন্মদিন পালন করতো ঘরোয়া ভাবে। ঠিক তাকে উদযাপন বলা যায় না, নিছক আনুষ্ঠানিকতা বলা যেতে পারে। জন্মদিনের উদযাপন বলতে যা বোঝায় সেটি বিবেচনা করলে, আমার জন্মদিন শেষবার পালিত হয়েছিল গত শতাব্দীর বিরাশি সালে। তবে এখনকার মতো, শত শত ফেসবুক শুভেচ্ছা, ফুলের তোড়া, আর কেক কাটা জন্মদিন নয়।

খুব আশ্চর্যজনক ভাবে, সেই বিখ্যাত জন্মদিনটির একটি ছবি রয়ে গেছে, কথার পেছনে ফেলে যাওয়া অ্যালবামে। এবং এটিই একমাত্র ছবি, যেখানে আমি , মা-বাবা , আর মিনু মাসি একই ফ্রেমে বন্দী। আমার বাবার কলেজ জীবনের এক প্রবাসী বন্ধু , বন্ধুর খোঁজে আমাদের বাড়ীতে এসেছিলেন। তাঁর হাতের সৌখিন ক্যামেরায় তোলা হয় ছবিটি। পরে তিনি বিলাত থেকে ছবিটি ডাকযোগে পাঠিয়েছিলেন বাবার ঠিকানায়। ছবিটি বাড়ীর সবাইকে আনন্দে উদ্বেলিত করলেও, মাস না ঘুরতেই প্রায় সবাই ছবিটির কথা বিস্মৃত হয়। কিন্তু মিনু মাসি, যিনি আনন্দ-দু:খের উপকরণগুলো নির্বিকার ভাবে জমিয়ে রাখতেন, তিনি ছবিটিকে ঠাঁই দিয়েছিলেন তাঁর স্মৃতির জাদুঘরে। মিনু মাসির মৃত্যুর পর , এই ছবিটি, তাঁর ন্যাপথালিনের গন্ধে ভরা ট্রাংকের ভেতর, তাঁর অসংখ্য প্রিয় আর কিছু গোপন জিনিসের ভেতর খুঁজে পেয়েছিলাম। ছবিটি আমি সযত্নে রেখে দিয়েছিলাম।

মিনুমাসির ট্রাংকের ভেতরে থাকা গোপন জিনিসগুলোর মাঝে, একটি জিনিস আমি, খুব গোপনে, রাতের অন্ধকারে নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলাম, অনেকটা পথের পাঁচালীর অপু যেমন করে দূর্গার চুরি করা গহনা জলে বিসর্জন দিয়েছিল, তেমনি করে।

আমি আমার বিগত জীবনের স্মৃতি নিয়ে তেমন রোমাঞ্চিত নই। ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি আমি পেছনে ফেলতেই চাই, কিন্তু কিছু জিনিস যেমন, কথার চোখের জলে ভেজা রুমাল, কথার ফেলে যাওয়া অ্যালবাম, মিনু মাসির ট্রাংকে সযত্নে রাখা ছবিটি , নি:শব্দে রয়ে গেছে আমার বাসস্থানে।

কলেজ জীবনে, জন্মদিনের সেই বিখ্যাত ছবিটি আমি ল্যামিনেট করিয়ে নিয়েছিলাম। তাই, দীর্ঘ তিনযুগে, সময়ের ছাপ যতটা পড়ার কথা, ঠিক ততটা পড়েনি ছবিটিতে। ছবির প্রতিটি চিত্র-ছায়াচিত্র, এখনো অবিকৃত। যদিও আমরা রঙীন ছবির জগতে প্রবেশ করেছি, কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, সাদা-কালো ছবি যেন কথা বলে। সাদা-কালো ছবির সেই শৈল্পিক বিষয়টি, রঙীন ছবিতে হারিয়ে গেছে। হয়তো বা প্রাচুর্যের জন্য। হয়তো, সাদা-কালো ছবি মানুষকে অধিকতর স্মৃতিকাতর করে তুলে বলে।

ছবিতে আমার পরণে ধুতি , হালাকা রঙের পাঞ্জাবী, সম্ভবত: ক্রীম কালারের। কপালে , গালে চন্দনের ফোঁটা। বিবাহযাত্রী বরের মতো সাজানো হয়েছিল আমাকে, জন্মদিন উপলক্ষ্যে। এবং সাজিয়েছিল মিনু মাসি। চন্দনের ফোঁটা দিয়ে সাজানো নিষ্পাপ কচি মুখটি যে আমার , ভাবতেই অবাক লাগে। সময় মানুষের সারল্যটুকু শোষে নেয়! তবে মাথায় কোন মুকুট ছিল না, যেমনটা অন্নপ্রাশনে অথবা বিবাহ অনুষ্ঠানে থাকে। টেবিলে সাতটি ছোট মোমবাতি, একই উচ্চতার, প্রজ্জ্বলনের অপেক্ষায়, দণ্ডায়মান। এক পাশে কাঁসার থালায় ধান আর দূর্বা। অন্যপাশে, কাঁসার বাটিতে মিষ্টান্ন। সম্ভবত: মিনু মাসি নিজ হাতে রেঁধেছিল। বাটির মিষ্টান্নে মুখ-নিমজ্জিত একটা চামচ। চামচটি ঠিক, কাঁসার না অন্য কিছুর, তা সাদা কালো ছবিতে বোঝার কোন উপায় নেই।

ছবিটি যে খুব ঘটা করে তোলা হয়েছে তেমন নয়। কারণ ঘটা করে তোলা ছবিতে, সবাই ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু ছবিতে কেউ আমরা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ছিলাম না। বরং স্বতস্ফূর্তভাবে , যে যাঁর মতো তাকিয়েছিলাম, কোন রূপ পরিকল্পনা না করে।

টেবিলের ঠিক পেছনে আমাদের পরিবার। আরতি যদিও আমাদের বাড়ীতেই থাকতো, কিন্তু তাঁর সাথে আমাদের কোন রক্তের সম্পর্ক ছিল না। তাছাড়া কার্যত: সে এক যুদ্ধ শিশু, তাই ঠিক পরিবারের অংশ হয়ে উঠে নি কখনো। আমার ডান পাশে মা। পরণে ফুল-লতা-পাতা আঁকা প্রিন্টের শাড়ী। যদিও সাদা কালো ছবিতে ঠিক বোঝার উপায় নেই শাড়ীটি কি রঙের, তবে সবুজ অথবা নীল অথবা এধরণের গাঢ় কোন রঙের হবে বলেই মনে হয়। আমার মায়ের ছিপছিপে গড়ণ তখন আর নেই। বরং, খানিকটা মেদের ছায়া পড়েছে, শরীরে, চিবুকে। মাথার চুল, খোঁপায় বাঁধা। সাদা কালো ছবিতেও , মায়ের কপালে সিঁদুর, কানের দুল, হাতে সোনার চুড়ি, সব কিছুই বোধগম্য।

আমার বাম পাশে মিনু মাসি। বৈধব্যের সাদা শাড়ী , আলু-থালু চুল, নিরাভরণ সাজসজ্জা, তাঁর বিষন্ন মুখের সৌন্দর্যকে দমিয়ে রাখতে সক্ষম হয় নি। একত্রিশ বছরের, যৌবনবতী মিনুমাসি যেন, পত্রিকার সিনেমার পাতা হতে উঠে এসেছে। সবার পেছনে, আমার বাবা অধীর সিংহ, মুখভর্তি দাড়ি, চোখে তাঁর বিখ্যাত চশমা। ছবিতে না বুঝা গেলেও , আমি জানি, সেটা সোনালী রঙের। শরীরের নিচের অংশ দেখা যাচ্ছে না । উর্ধ্বাঙ্গে একটা পাঞ্জাবী, গাঢ় কোন রঙের।

এই সব পারবারিক ছবিগুলো, অধিকাংশ সময়েই ভ্রান্তির সৃষ্টি করে। মানুষের সত্যিকারের জীবন সম্পর্কে ভুল ধারণা দেয়। এই ছবিটিও তাই। এই ছবিটিতে চোখ রাখলে, মনে হবে, সুখী এক পরিবারের আনন্দঘন কোন মুহুর্তের দৃশ্য। ছবিটির প্রতিটি পিক্সেল থেকে ছড়িয়ে পড়ছে আনন্দ। যদিও, তখন ফেসবুক ছিল না, তবুও আমি নিশ্চিত, ছবিটি আর তিন যুগ পরে, স্মার্ট ফোনে তোলা হলে, মা অথবা বাবা এই ছবিটি ফেসবুকে দিয়ে, সবাইকে জানিয়ে দিতো, তারা আসলেই ক্লেদহীন সুখী পরিবার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আনন্দ, আমাদের বাড়ীর সহজাত সুর নয়।

কিন্তু ছবি তোলার এই মুহুর্তটিতে , ছবির সবাই যেন এক ভিন্ন মানুষ। রূঢ় কঠিন জীবনের, কুঁচকানো কপালের বিরক্তি ছাপিয়ে এক ধরণের প্রসন্নতা ফুঠে উঠেছে আমার মায়ের মুখে। চির বিষন্ন মিনু মাসির মুখেও ঠিক প্রসন্নতার হাসি বা উচ্ছ্বাস নয়, তবু এক ধরণের স্মিত হাসি ফুটে উঠেছে। আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা অধীর সিংহ, যেন আর খাঁচায় বন্দী সিংহ নয়। তাঁর অসফল পেশাগত জীবনের সকল গ্লানি মুছে ফেলে উচ্ছ্বসিত, তাঁর বন্ধুর ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে, এতোটাই যে, সে তাঁর ডানহাত বাড়িয়ে মায়ের বাম স্কন্ধ স্পর্শ করেছে। মনে হবে যেন, সে স্পর্শে সাড়া দিয়েই মা ফিরে বাবার মুখের দিকে তাকিয়েছে। সেই দৃষ্টি ঠিক পুলকের না বিস্ময়ের , তা ছবি দেখে ঠিক বোঝা কঠিন।

ছবিটিতে ঠিক যে মুহুর্তে, মা বাবার দিকে ফিরে তাকিয়েছে, ঠিক একই মুহুর্তে, বাবা তাকিয়ে আছে, মিনু মাসির দিকে। ঠিক কেন তাকিয়েছিলেন, কি দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন, তা ছবি দেখে বোঝা যায় না। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক সেই ক্যামেরায় বাবার মুখে এক ধরণের মুগ্ধতা ফুটে উঠেছে, যদিও দৃষ্টিকটু ভাবে নয়। যেন খুব স্বাভাবিক ভাবেই স্ত্রীর বোনের দিকে কোন উপলক্ষ্যে তাকানো। বহুদিন পর, যখন আমি ছবিটি, মিনু মাসির ফেলে যাওয়া স্মৃতির জাদুঘরে খুঁজে পাই, তখন আমার কাছে মনে হয়েছিল, এটি আসলে, আমার মা-বাবা-মাসির জটিল সম্পর্কের এক প্রতিকী প্রদর্শন।

ছবিটি খুব সহজেই ত্রিকোণ প্রণয়ের চিত্র হতে পারতো । কিন্তু সেটি ঘটে নি, তার কারণ হলো আমি। ছবিতে, বাবা যে মুহর্তে মিনুমাসির দিকে তাকিয়েছে , ঠিক সেই মুহুর্তে, গভীর এক মমতায় আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল মিনু মাসি। মিনু মাসির দৃষ্টিতে কোন শূণ্যতা নেই, বরং গভীর এক স্নেহের লাবণ্যে পরিপূর্ণ। মিনু মাসি যেন বাবার দৃষ্টি সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে উদাসীন। একই মূহুর্তে আমি যদি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকতাম, তবে ছবিটি কখনোই সম্পূর্ণ হতো না। ক্যামেরায় ক্লিক করার সেই মূহুর্তটিতে, আমি ডান দিকে ঘুরে তাকিয়ে ছিলাম, মায়ের দিকে। আমার মুখের মাঝে ফুটে উঠেছে এক ধরণের আকুতি। আমি প্রানপণে কি যেন চাইছি।

মা বাবার দিকে তাকিয়ে আছে বিস্ময়ে। বাবা মিনু মাসির দিকে তাকিয়ে, তাঁর দৃষ্টিতে মুগ্ধতা । মিনুমাসির গভীর স্নেহের দৃষ্টি আমার দিকে। আর আমি তাকিয়ে আছি, মায়ের দিকে তীব্র আকুতি নিয়ে। যেন এক রেখাবিহীন পরিপূর্ণ চতুর্ভূজ।

ত্রিকোণ সম্পর্ক প্রায়শ:ই, খুব বেশী স্থায়ীত্বহীন ভঙ্গুর হয়ে উঠে । আমার কাছে মনে হয়, বিশ্বাস বাড়ীতে আমার মা-বাবা-মিনু মাসির সম্পর্কটি ক্ল্যাসিক্যাল ত্রিকোণ সম্পর্কে পরিণত হয় নি, শুধুমাত্র আমার জন্য। তিন জন পূর্ণ বয়ষ্ক মানুষ, যাঁরা নিজস্ব অপূর্ণতায় কাতর, তাঁদের একত্রে আবদ্ধ করে রেখেছিল শিশু অভিনন্দন। তাঁরা তিনজনই, এক নবীন শিশুর মায়ায় আবেশিত হয়ে, এক ধরণের অলিখিত শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল। মিনু মাসির জীবদ্দশায়, মা-বাবা-মিনুমাসির মধ্যকার সম্পর্কের কোন বড় অভিঘাত আমি দেখি নি। যদিও মিনু মাসি আর বাবার মাঝে অনুমিত সম্পর্ক এবং সে বিষয়ক ছড়ানো কু্ৎসা, আমার মায়ের মাঝে যৌনতা সঞ্জাত এক ঈর্ষা জাগিয়ে তুলেছিল, এবং সেটি আমার মা-বাবার দাম্পত্যে এক ধরণের আঘাত, তবুও আমার মাকে মিনু মাসির প্রতি কখনোই বিরূপ হতে দেখি নি। দু’বোনের মাঝে , হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল, মিনু মাসির মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত।

মন্তব্য করুন