উপন্যাসসাধুশ্মসানের উপকথা

সাধুশ্মশানের উপকথা │ হারানো বেলুন │ স্নেহাশিস রায়

হারানো বেলুন

একাশি সালের সেই সন্ধ্যাটি ছিল , অগ্রহায়নের। ফসল উঠে গেছে এমন ধানের ক্ষেত । পরিত্যাক্ত ধানের ক্ষেতের নাড়ায় নাড়ায় যে শূণ্যতা, সে শূণ্যতা মিশে আছে ,মিনু মাসির মাথার চুল থেকে শুরু করে, পায়ের নখ পর্যন্ত প্রতিটি অংগে।

‘মা কবে আসবে? মিনু মাসি?’

আমার প্রশ্নের একটা নাতিদীর্ঘ উত্তর উঠে আসে মাসির মুখ থেকে, ‘কালকে’। সেই উত্তর তাঁর পোষাকের মতোই নিরাভরণ। বিশ্বাস বাড়ীর ছাদের উপর আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে মিনু মাসি। তাঁর নিটোল নাক আছে একটি, সে নাকের কোন ফুল নেই। তাঁর রয়েছে সুদৃশ্য কর্ণলতিকা, তাতে কোন দুল নেই। সাদা ব্লাউজের উপরে , গলার নিচে রয়েছে ফর্সা, সজীব ত্বক, যেখানে সূবর্ণ হার শোভা পেত কোন একদিন। আজ সেখানে কোন মালা শোভা পায় না। দীঘল কালো চুল আছে তাঁর। সেখানে সযত্ন চিরুণীর আঁচড় পড়ে না আজ কতদিন। না কোন খোঁপা , অথবা কোন বেণী।

আমার মা অণু বিশ্বাস আজ বাড়িতে নেই। রাজধানীতে গিয়েছে, অফিসের কোন এক প্রশিক্ষণে। তুলসী তলায় প্রদীপ দেবে বলে, মিনু মাসি নেমে এলো সিঁড়ি বেয়ে। আরতি উঠে এলো ছাদে। বিশাল লাল কুসুমের মতো সূর্যটি ডুবে গেল, রেল ষ্টেশানের ওপারে বিশাল রেইনট্রি গাছটির পেছনে। মাঠের পর মাঠ, শূণ্য ধানক্ষেত। তার ঠিক উপরে হালকা নীল কুয়াশার এক আবরণ, সামিয়ানার মতো ঝুলে আছে। একটা উঁচু ডিবি, ধানক্ষেতগুলোর মাঝখানে। বহুবছর আগে ঠিক কেমন করে যে ডিবির উপর একটা তেঁতুল গাছ জন্মেছিল, তা সাধুশ্মশানের উপকথায় নেই। তেঁতুল বৃক্ষের কাণ্ডের ব্যাপ্তি আর এবড়ো থেবড়ো , আকারই বলে দেয়, বৃক্ষটি বৃদ্ধ এখন। আরতি বললে, ‘ এই তেঁতুল গাছটায়, ভুত থাকে, অভি। মা(হ)তাব মাষ্টার এই গাছেই ফাঁস দিছিল।’

আমি গাছের স্তব্ধ ডালপালার মাঝে, মা(হ)তাব মাষ্টারের ভুত দেখতে পেলাম না। কিন্তু শরীরের রোমগুলো দাঁড়িয়ে গেল। নি:শব্দ ভুত যেন সাধুশ্মশানের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে দিয়েছে ভয়। আসলে ঘুমাবার আয়োজন করছিল, প্রতিটি উদ্ভিদ। মাঠ বা ‘আইল’-এর দূর্বাঘাস থেকে শুরু করে, বুড়ো অশত্থের পাতা। ‘সন্ধে হলে, ঘুমিয়ে পড়ে গাছের পাতা, জলের পুকুর’। দূর থেকে দেখলাম, ইউনিয়ন বোর্ডের কাঁচা সড়ক দিয়ে এগিয়ে আসছে, একটি রিক্সা। রিক্সার যাত্রী আমার বাবা, অধীর চন্দ্র সিংহ। বাবা ইতোমধ্যেই আইন পাশ করেছে. বর্তমানে তিনি একজন উকিল। কদাচিত কখনো যদি, মামলা করার মতো মক্কেল জুটে যায়, তাঁকে ছুটে যেতে হয় মহুকুমা শহরের এজলাসে। তাঁর বিশাল কালো গাউনখানি নিতে সে কখনো ভুলে না। চৈত্রের ভীষণ রোদ্রই হোক, আর ভাদ্রের বৃষ্টিই হোক, কালো আলখাল্লাটি আইন ব্যবসার জন্য অপরিহার্য। ( বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থার জন্য হয়তো, এর চেয়ে ভালো মানানসই রঙ বিধাতাও খুঁজে দিতে সক্ষম ছিল না।)

আমি এখনো চোখ বন্ধ করে দেখতে পাই, অধীর সিংহ বাড়ী ফিরছে মহুকুমা থেকে। হাতের কনুইয়ে ভাঁজ করা কালো জাদুকরের আলখাল্লা। চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা, যা বেশ দামী, মদিনা অপটিক্যালস থেকে তাঁর নিজস্ব সামর্থ্যের চেয়ে বেশী দামে কেনা। পান খেয়ে মুখ লাল। পানের লাল রঙ খানিকটা ছড়িয়েছে তাঁর সযত্নে কাটা কাঁচা-পাকা দাঁড়িতে। কালো গাত্রবর্ণে, সোনালী ফ্রেমের চশমাটি যে বেমানান লাগছে, তা বুঝার মতো যথেষ্ট ফ্যাশান-সেন্স তাঁর ছিল না। আমার কাছে বার বার মনে হয়েছে, আমার বাবা , তিনি যা নন, তাই হওয়ার চেষ্টায় পুরোটা জীবন খরচ করেছেন।

……..

অ্যাডভোকেট অধীর সিংহ, বিএ, এল, এল, বি, একটা সাইনবোর্ড লাগানো ছিল, আমাদের বৈঠক ঘরের বারান্দায়। বৈঠক ঘরটিই অধীর সিংহের আইন পেশার চেম্বার। কাঁচের আলমারীতে, আইনের কয়েকটি বই, লাল রেক্সিনে বাঁধাই করা। উকিলের চেম্বারের ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে মানানসই আর পরিচিত দৃশ্য। আলমারীর সামনে ফোমের গদীওয়ালা চেয়ারে, সোনালী চশমা বুকের উপর ঝুলিয়ে বসে থাকা উকিল বাবুটির , মক্কেলের জন্য অপেক্ষার পালা ছিল সুদীর্ঘ। সে সময়, তাঁর অবসর কাটতো, বিকেলের ট্রেনে আসা সংবাদপত্র পড়ে, আর নাড়া-চাড়া করে। মাঝে মাঝে হঠাৎ মক্কেল যদি এসে যেতো, বাবার চেম্বারে, তবে মা ঘর থেকে বলতো, ‘নিশ্চয়ই কোন হা-ভাতে’। যাঁদের ফিস দেবার যথেষ্ট পয়সা থাকতো না, তাঁরাই কেবল বিবর্ণ সাইনবোর্ড-ওয়ালা অধীর সিংহের দরজার চৌকাঠ মাড়াত। অধীর সিংহ ধৈর্য ধরে মক্কেলের কথা শুনতো, অধীর আগ্রহ নিয়ে। তারপর যখন কথা বলতো, তখন আর চাপা দিতে পারতো না তাঁর মাধুর্য-কোমলতা-হীন বাজখাই কণ্ঠস্বরটি।

বাবার এই কণ্ঠস্বরটি যে তাঁর সত্যিকার অন্তরের ভাব প্রকাশ করে, তেমন নয়। বরং তাঁর উল্টো। তাঁর মনের ভাবটিকে কঠিন আবরণে ঢেকে রাখে। বাবা যদি কাউকে বলে, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ তবে মনে হবে যেন, বাবা তাঁর ভালোবাসাটুকু চাপিয়ে দিচ্ছে। আমি জানি না, বাবার এই কণ্ঠস্বরটি তাঁর অসফল দাম্পত্যের পেছনে কতটা দায়ী। তবে, তাঁর পেশাগত জীবনে অসফলতার অন্যতম প্রধান কারণ সম্ভবত: এটিই। যদি কখনো বাবার এই বাজখাই গলা বিশ্বাস বাড়ীকে প্রকম্পিত করতো, তাকে থামিয়ে দিতো, আরেকটি তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর । এই কণ্ঠস্বরটি আমার মায়ের। সেই স্বর আমার দাদু রাইচরণের রেখে যাওয়া পাকা বাড়ীর, ধানী জমির, আর সর্বোপরি আমার মায়ের সরকারী চাকুরীটির , যা থেকে ভালো একটা আয় করতো আমার মা।

আমি ছাদে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, অ্যাডভোকেট অধীর সিংহের কোর্ট থেকে বাড়ী ফিরে আসা। হাতে সেদিনকার খবরের কাগজ। এক টুকরো মেঘ যখন সূর্যের শেষ রশ্মিটিকে ঢেকে দিল, তখন বাবা বাড়ীতে ঢুকলেন। তাঁর মুখে চির পরিচিত এক বিষন্ন মুখোশ, তাতে আঁকা জোড়া ভ্রু, ভ্রুর নিচেই উজ্জ্বল চোখের ভেতর লাল শিরাগুলো জেগে উঠেছে। পেছনে ঢেউটিন দিয়ে তৈরী গেট সশব্দে বন্ধ হলো। ঘটাং সেই শব্দে বাবার চোখের পাতা একটুও কেঁপে উঠল না। কিন্তু কেঁপে উঠলো মিনুমাসি। তুলসী তলায়, প্রদীপের সলতায় আগুন দিচ্ছিল, হরিণ মার্কা দেয়াশলাইয়ের কাঠিতে। মিনু মাসি চমকে উঠে হরিণের মতই।

হঠাৎ কেঁপে উঠা হাতের অনৈচ্ছিক কম্পনে মাটির প্রদীপটি উল্টে যায়। তেল ছড়িয়ে যেতে থাকে, তুলসী তলার বেদীতে। মিনু মাসি যখন পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে শব্দের উৎস, ঠিক তখনও তাঁর চোখ দু’টো ভয়ে কাঁপছিল।

মিনু মাসির চোখদু’টো কি সত্যিই হরিণের মতো দেখতে? আমার ঠিক জানা নেই। প্রথমত: আমি কখনো জীবিত হরিণের চোখ দেখি নি। চিড়িয়াখানায় জ্যান্ত হরিণ আমি দেখেছি, কিন্তু ওদের চোখের দিকে তাকানো হয় নি কখনোই। বন্দী হরিণের চোখের চেয়ে, ওদের বিষন্নতাই আমার বেশী নজর কেড়েছে। অথবা , টেলিভিশানে অনেকবার হরিণ দেখেছি, কিন্তু তাদের চোখ দেখা হয় নি, কারণ মুক্ত হরিণের চোখ ছাপিয়ে দৃশ্যমান হয়, তাদের দূরন্ত গতি, তাদের উচ্ছ্বলতা।আজ হঠাৎ, মিনু মাসির চোখ দু’টি সত্যি হরিণের মতো কিনা , সে প্রশ্ন কেন আসছে? সে প্রশ্ন আসতেই পারে। আমি ছেলেবেলায় প্রায়ই শুনেছি, আমার দাদু রাইচরণ বিশ্বাস নাকি বলতেন, ‘মিনুর চোখ দু’টি হরিণের মতো!’

রাইচরণ নিজেও কখনো জীবিত হরিণ দেখে নি। তবু কেন, তাঁর কাছে মনে হয়েছিল, তাঁর বড় কন্যার চোখ দু’টি হরিণের মতো? তার কারণ এক ধরণের মোহ। মিনু মাসি নিটোল সুন্দরী ছিলেন। তাঁর চুল নেমে আসতো , কোমড়ের নীচ পর্যন্ত। গাত্রবর্ণ যেন কাঁচাসোনা। নাক ছিল বাঁশির মতো। তবে তাঁর চোখ দু’টিও হয়ে উঠতে হবে, হরিণের মতো। মানুষের মনে প্রোথিত সৌন্দর্যের সংগায় তো ঠিক তাই বলে। তাই, মেয়ের চোখ দু’টিতে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন, প্রচলিত বিশ্বাসের সর্বোচ্চ সৌন্দর্যটিকে। শুধু রাইচরণ নয়, মিনু মাসির চোখ দু’টি এমন মোহময় যে, সত্যি হয়তো, মোহিত না হয়ে থাকা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।

আগেই উল্লেখ করেছি, রাইচরণ বিশ্বাস কখনো হরিণ দেখে নি। হরিণ না দেখার অপ্রাপ্তি তিনি ঘুচিয়েছিলেন, ১৯৬৪ সালে, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের বছর খানিক আগে। একটা মৃত হরিণের মাথা কিনে এনে টানিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর শোবার ঘরের দেয়ালে, একেবারে লোহার পাতে দেয়াল ঠুঁকে। ঠিক এর পাশেই, তাঁর বিশ বোরের বন্দুকটি ঝুলানো থাকতো। রাইচরণ কোন দিন শিকার করেন নি, কারণ তিনি বিবেকানন্দের মানসিক শিষ্য ছিলেন। কিন্তু ঠিক কেন, শিকার করা হরিণের মাথাটি এনে ঘরে ঝুলিয়ে ছিলেন, তা আমার কাছে বিস্ময়কর। মানুষ সত্যি এক দ্বন্দ্বমুখর প্রাণী!

রাইচরণ বিশ্বাসের মৃত্যুর পর, মিনু মাসি তাঁর বাবার শোবার ঘরটিতে থাকতে শুরু করে। আমি আমার জন্মের পর থেকেই, সেই ধূসর সবুজ হরিণের মাথাটি দেখেছি। মৃত হরিণের মস্তকে ডালপালার মতো ছড়িয়ে থাকা তীক্ষ্ণ শিং সহজেই দৃশ্যমান। কিন্তু যদিও প্রচ্ছন্ন, তবুও সেই হরিণমস্তকের খালি দু’টি অক্ষি-কোটরে যে নি:শব্দ নিসঙ্গতা, তাই যেন ছড়িয়ে পড়েছে সারা বাড়ী জুড়ে, মিনুমাসির পরণের সাদা থানে, আমার বাবার জোড়া ভ্রুর নিচে শিরা জেগে উঠা রক্তিম রাগত চোখে। আর আমার মায়ের তীক্ষ্ণ কন্ঠস্বরের মাঝে যে এক নি:সঙ্গতা আছে, তা আমি বুঝেছি আরো অনেক দিন পর।

অগ্রাহয়নের সন্ধ্যাটি ক্রমেই ঘন হয়ে আসছে। যেন এক রহস্য পুঞ্জীভূত হচ্ছে ক্রমে ক্রমে। সন্ধ্যায় ঝিঁমিয়ে পরা গ্রামটি যেন অপেক্ষা করছে , কোন এক নির্দেশের। সেই নির্দেশ অবশ্যই পার্থিব। সাধুশ্মশানের গাঁয়ের রীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। ছাদ থেকে দেখলাম, বাবা ঘরে ঢুকলো। মিনু মাসি তাঁর উল্টানো প্রদীপের বিহ্বলতা কাটিয়ে তাকিয়ে দেখলেন, আমি তখনো ছাদে। ‘ছাদ থেকে নেমে আয় অভি। ঠান্ডা লাগবে।’

ঠিক তখনই মাইক্রোফোনে মোয়াজ্জিন মোসাদ্দেক, ঘোষণা করলো, ‘ আল্লাহু মহান।’ এবং অবশ্যই আরবীতে, বাংলায় নয়। তাঁর চিরকালের অভ্যাসমত, প্রথমে দু’বার মাইক্রোফোনে টোকা দিল। সামান্য ‘ঘড়-ঘড়’ শব্দ। তারপর মাইক্রোফোনে শতগুণ বিবর্ধিত হয়ে, মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে শোনা গেল, ‘আল্লাহু আকবর।..’। মুয়াজ্জিন মোসাদ্দেক এখন জুম্মাঘরের ভেতর, তাকে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু মাইকে তাঁর আজান শুনা যাচ্ছে। আজও আমি চোখ বন্ধ করলে , মুয়াজ্জিন মোসাদ্দেকের ছবি দেখতে পাই। শীর্ণ কৃশকায়, যেন শুকিয়ে শুকিয়ে অন্তরীক্ষে মিশে যাওয়ার তালিম নিচ্ছে। তাঁর পাতলা ক’গাছা দাঁড়ি, দীর্ঘ হতে হতে কুঁকড়ে গেছে, তাঁর বসে যাওয়া চিবুকে। কখনো কখনো, মসজিদের বারো ভোল্টের ব্যাটারীটির শক্তি যখন নি:শেষিত হয়ে যেতো, তখন বেরিয়ে আসতো, জুম্মা ঘর থেকে। মসজিদের দক্ষিণ দিকের উঁচু ডিবির উপর দাঁড়িয়ে, দুই তর্জনীতে কানের ছিদ্র চেপে ধরে, প্রাণপণে ঘোষণা করতো আল্লাহু আকবর। গলার উপর , শিরাগুলো ফুলে উঠেছে, মুখের ফর্সা চামড়া রক্তিম হয়ে উঠেছে।

মাইক্রোফোন থাকুক বা না থাকুক, দৈনিক পাঁচবার এই নিয়মের কোন ব্যতীক্রম হয় নি। মুয়াজ্জিন মুসাদ্দেক, খাবারের অভাবে পানি ঢক্ ঢক্ করে গিলে ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু কোন কারণে, তাঁর আযান থেমে থাকে নি। অন্তত: সে যতদিন বেঁচে ছিল।

আশির দশকের মাঝামাঝিতে, পৌষের এক শেষ রাতে, ট্রেনের দানবীয় চাকার নীচে কাটা পড়ে, মুয়াজ্জিন মোসাদ্দেক, ঠিক সেই স্থানে যেখানে কৃষ্ণমাষ্টারের ভুত প্রতিবছর অন্তত: একজনকে মৃত্যুর ওপারে টেনে নেয়। এই মৃত্যু নিয়ে অনেক গল্পই প্রোথিত আছে, সাধুশ্মশানের উপকথায়। কেউ বলে, অভাবের যন্ত্রণা সইতে না পেরেই, আত্মহত্যা করেছে মোসাদ্দেক। কেউ বলে, কুয়াশার অন্ধকারে সত্যিই কিছু দেখতে পায় নি মোসাদ্দেক। অন্য যে গল্পটি বাতাসে ভাসে, তাতেই গল্পের মসলার জোগান বেশী।

মুয়াজ্জিন মোসাদ্দেক আযান দেবার জন্য বাড়ী থেকে বেরিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু হঠাৎ অনির্ধারিত প্রাকৃতিক ডাকে সারা দিতে ছুটে এসেছিল, তার বাড়ীতে। সেখানে সে আবিষ্কার করেছিল, তাঁর স্ত্রী বিছানায় শায়িত এক অন্য পুরুষের কন্ঠস্বর, জীর্ণ চৌকির ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ, আর সম্ভবত: তাঁর স্ত্রীর শীৎকার। সত্যি কেউ জানে না, কেন মুয়াজ্জিন মুসাদ্দেক ট্রেনের চাকায় কাটা পড়েছিল, কিন্তু গল্পের ফুলঝুড়ি ছুটেছিল , সাধুশ্মশানে, আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র।

অবশেষে মুয়াজ্জিন মোসাদ্দেক যখন আরবীতে ঘোষণা করে , “নামাজের জন্য এসো।” সে ডাকে সাড়া দিয়ে, কুল্লে পাঁচ জন মুসুল্লী এগিয়ে আসে মসজিদের দিকে। রজব আলী মাষ্টারকে দেখা যায়, বড়ই গাছটির ঠিক নীচে, ঠিক পেছনে দুই ছেলে জুবায়ের আর আনোয়ার, নীরিহ শান্ত স্বভাবের এই দুই যমজ, খানিক আগেও টেবিলে বসে পাটিগণিত কষছিল। তাঁদের মাঝে কোন বালক সুলভ চপলতা নেই। বরং শান্ত সৌম্য দু’টি প্রতিকৃতি যেন অনুসরণ করে চলছে, কোন এক ছায়াকে। তাঁরা যেন সন্ধ্যার বাতাসের মতোই স্তব্ধ।

দিন-মজুরের ছেলে,রজব আলী মাষ্টারের সৃষ্টিকর্তার প্রতি শুকরিয়া আদায়ের যথেষ্ট কারণ ছিল। তাঁর জ্ঞাতিরা এখনো , ক্ষেতে কামলা খাটে। অর্থনৈতিক সফলতা, মানুষকে ধর্মের দিকে ঠেলে দেয়। ঠিক একই সময়ে , গাঁয়ের অন্য প্রান্তে, পাল পাড়ায় নবীন পালকে দেখা যাবে, তাঁর দাদন ব্যবসার উত্তরোত্তর সফলতা কামনায়, সিদ্ধিদাতার গণেশের ছবিতে ধূপের ধুঁয়া ছড়াচ্ছে। তাঁর ডান হাতের তর্জনীতে একটি গোমেদ, মধ্যমায় একটি নীলা, আর অনামিকায় একটি প্রবালের রত্নশোভা। আমি খেয়াল করে দেখেছি, অর্থের সাথে ঈশ্বরের দারুণ এক সখ্য। ঈশ্বরের বন্দনা আর নামাজের বিলাসিতা কেবল মানায়, সাধুশ্মশানের সম্পন্ন কয়েক ঘর গৃহস্থের ঘরে।

চতুর্থ যে ব্যক্তিটি, মুয়াজ্জিনের ডাকে সাড়া দিয়ে, মসজিদের দিকে যাচ্ছে, তাঁর নাম আকবর। গাল ভরা সাদা কালো দাড়ি, দিনের অধিকাংশ সময় ঈষৎ ভেজা থাকে পানের রসে রঞ্জিত লালায়। নামাজের আগে পুকুরে অজু সেরেছে। তারপর কটকটে ফিরোজা রঙের তাঁর একমাত্র জোব্বাটি পরে , অন্য পাশ থেকে এগিয়ে আসছে নামাজ ঘরের দিকে। নামাজের সময়টিতেই সে কেবল শান্ত থাকে। বাকী সময়, ব্যস্ত থাকে নিরীহ পাগলামীতে। ছেলেবুড়ো, সকলেই তাকে, ক্ষেপিয়ে দিয়ে বিমল আনন্দ উপভোগ করে। ক্ষেপে গিয়ে নিজেকে পরিচয় দেয় , তার নাম আকবর পাগলা, উজাইন্যা গুণ্ডা। রেললাইন থেকে ,পাথর তুলে ভয় দেখায়, কিন্ত কখনো ছুঁড়ে মারে না।

পঞ্চম যে ব্যক্তিটি নামাজের জন্য এগিয়ে আসছে, তিনি সালেক মৌলানা। শান্তি কমিটির স্বীকৃত চেয়ারম্যান। পঁচাত্তরের জাতীয় রাজনীতির পট পরিবর্তনের পর, সে আবার গ্রামে ফিরে এসেছে। বিশাল শান বাঁধানো , পুকুর ঘাটের যে বাড়িটি দেখা যায় , আমাদের ছাদ থেকে, সেই বাড়ীটি এই লোকের। যে মসজিদ ঘরটিতে মুয়াজ্জিন মোসাদ্দেক আজান দেয়, সেটিও এর দেয়া জমিতে। যে মাইকটি দিয়ে মুয়াজ্জিন মোসাদ্দেক প্রতিদিন পাঁচবার কাঁপিয়ে তুলে , সাধুশ্মশানের বাতাস, সেই মাইকটিও দান করেছে এক কালের বিতর্কিত লোকটি।

সর্বশেষ যে লোকটি মুয়াজ্জিন মোসাদ্দেকের আযানে সাড়া দিয়ে , বাড়ির পুকুরে অজু করতে যায়, কিন্তু কখনো মসজিদে আসে না। সেই ব্যক্তিটি হলো, কমাণ্ডার সোলায়মান। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর, সে আবার গাঁয়ে ফিরে এসেছে। যেহেতু থানায় কোন সুর্নিদিষ্ট অভিযোগ কখনোই দাঁড় করা হয় নি, তাই নতুন সরকার বা প্রশাসন কমাণ্ডার সোলায়মানের গ্রামে ফিরে আসা নিয়ে তেমন মাথা ঘামায় না। যদিও মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী সৈনিক, কিন্তু পরাজিত এক মানুষের মতো, প্রায় নির্বাক – নিভৃত জীবন বেছে নেয়। অন্তত: কিছু সময়ের জন্য। শুধু তাঁর প্রতিজ্ঞা অনুসারে পায়ে জুতো পরে না আর । অজু করে, খালি পায় ঘরে ফিরে নামাজ পড়ে। পৃথিবীর কোন কিছুতেই তাঁর কোন মাথাব্যথা নেই। সালেক মৌলানার গ্রামে ফিরে আসাও তাঁকে আর বিচলিত করে না। কেবল যত্ন করে এড়িয়ে চলে। তাই মসজিদে নামাজ পড়তে যায় না।

……

সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম ছাদ থেকে।
বিজলী বাতির আতংক , তখনও ঝলসে দেয় নি সাধুশ্মশানের অন্ধকার। তিনটি হারিকেন জ্বলে উঠেছে আমাদের বাড়ীতে। বড়, মাঝারী ও ছোট , এই তিন উচ্চতার তিনটি হারিকেন, ফিরোজা রঙে কালাই করা। মিনু মাসি প্রথমে পুরনো ন্যাকড়ায়, চিমনী মুছেছে, প্রথমে বড়টির, তারপর মেজোটির, সবশেষে ছোটটির। তারপর হারিকেনে কেরোসিন ঢেলেছে, একই ক্রমানুসারে। প্রথমে বড়টিতে, তারপর মেজোটিতে, তারপর ছোটটিতে। দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে অগ্নি সংযোগ করেছে, তাও একই ক্রমানুসারে। তারপর তিনটি হারিকেন পৌঁছে দিয়েছে তিনটি ঘরে। প্রথমে বড়টি অ্যাডভোকেট অধীর সিংহের ঘরে। তারপর মেজোটি রান্নাঘরে, যেখানে আরতি চুলায় তুষ ছিটিয়ে দিচ্ছে। তারপর ছোটটি , আমার ঘরের পড়ার টেবিলে।
মিনু মাসি, সব কাজেই, যখন উচ্চতার ক্রমের প্রশ্ন উঠতো, তখন সবসময়ই বড় হতে ছোট, এই ক্রমে সাজিয়ে নিতো সবকিছু। ৭১ সালের পর কখনোই এর ব্যতীক্রম হয় নি। কখনোই এমন ঘটে নি যে, মিনু মাসি ছোট হারিকেনটি আগে জ্বালাত। অথবা, বাবার আলমারীর সবচেয়ে ছোট বইটি আগে মুছে, আলমারীতে তুলে রাখতো। কখনো আমার মা যদি বলতো, ‘ ছোট হারিকেনটা আগে জ্বালিয়ে, অভির ঘরে দিয়ে আয় তো, দিদি। ও পড়তে বসুক।’ তবু মিনু মাসি অবিচল দৃঢ়তায়, আরো উদাসীন ভাবে , মায়ের কথায় একদম পাত্তা না দিয়ে, বড় থেকে ছোট ক্রমটি বজায় রাখতো। সে যে নিছক খেয়ালের বসে এমন করতো, তা নয়। বরং তাঁর ভেতর এক ধরণের তাড়ণা কাজ করতো।
কিন্তু কেন মিনু মাসিকে, বড় থেকে ছোট এই ক্রমানুসারে তাঁর জীবনযাত্রার প্রতিটি ঘটনাকে সাজাতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে, আমাকে ফিরে যেতে হবে, একাত্তর সালের এপ্রিলের এক দিনে। পাকিস্তানের মিলিটারী তখন বিদ্রোহ দমনের নেশায়, সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছিল।
…..দিনটি খুব সম্ভব বৈশাখের মাঝামাঝিতে। মিনু মাসি মনে করতে পারে না, অথবা মনে করতে চায় না। ঈশাণ কোনে কালো রঙের মেঘ উঠলো, দুপুর বেলায়, আর তুমুল শিলাবৃষ্টি। গ্রামের সবচেয়ে উঁচু কড়ই গাছটা, ভেঙে পড়লো কাঁচা সড়কের উপর। সে বার গাছে আমের বোলও ধরেছিল বিস্তর। আমের গুটিও ছিল অসংখ্য। বাড়ীর পেছনে বুড়ো কাঁচা মিঠা গাছটা. যাতে আম ধরে হাতে গুণা, সেটিও ভরে উঠেছিল কাঁচা আমের গুটিতে। বুরো ধানের গোছাগুলোও, অন্যবারের তুলনায় পুষ্ট। মিনু মাসির শ্বশুর ধানের জন্য শংকিত ছিল, কখন শিলাবৃষ্টি এসে পেঁকে যাওয়া ধান মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে। ঢাকায় নাকি বিশাল গণ্ডগোল। ধান কাটার কামলা পাওয়া যাচ্ছিল না। খুঁজে পেতে কয়েকজনকে জোগাড় করা হয়েছিল। পরদিনই ধান কাটার কথা।
দুপুরের দিকে উত্তর-পশ্চিম কোণ অন্ধকার করে দিয়ে ঝরটি ছুটে আসে। সাথে প্রচণ্ড শিলাবৃষ্টি। সব থামলে মিনু মাসি দেখেছিল, বাড়ীর উঠানে শিলার স্তুপ, আমের গুঁটি, গাছের পাতা, শুকনো ডাল, আর ক্ষণে ক্ষণে চমকে উঠা বিদ্যুতের ঝিলিক, মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। মিনু মাসির শ্বশুর ক্ষেতে গিয়ে দেখে, পাঁকা বুরো ধানের ক্ষেতগুলো মাটির সাথে মিশে গেছে। সে দৃশ্য দেখে তিনি , মাথায় হাত দিয়ে আইলের উপর বসে পড়েন।
বাড়ীর উত্তর দিকের পাটকাঠির বেড়া হেলে পড়েছিল উঠানে। শ্বাশুড়ীর প্রিয় চাম্পা কলার গাছটিও , অপরিণত ছড়ি নিয়ে, শায়িত ভূতলে। শ্বাশুড়ী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের অক্ষমতায়, সব দোষ চাপায়, সদ্য বিয়ে হয়ে আসা, নতুন বউয়ের উপর। ‘ অলক্ষী মেয়ে, ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই এমন সব্বোনাশ!’ তিনি জানতেন না এর চেয়ে এক প্রলয়ংকরী সর্বনাশ এগিয়ে আসছে কাঁচা সড়ক ধরে।
ভারী বুট আর এলোপাথারী গুলির শব্দের মাঝে কেমন করে যে, মিনু মাসি প্রবেশ করেছিল মুরগীর খোঁয়াড়ে, তা মনে করতে পারে না মিনু মাসি। খোঁয়াড়ের ভেতর থেকে মিনু মাসি তাঁর নির্বাক দৃষ্টিতে দেখেছিল, মাথায় লোহার টুপি আর ভয়াল দর্শন পোষাকে বিচিত্র প্রাণীগুলোকে। পরবর্তীতে এদের চেহারার সাথে তুলনা করার মতো একটা প্রাণীকেই সে বেছে নিয়েছিল , বিশাল প্রাণী জগত থেকে , সেটি হলো হায়না। মিলিটারীরা রাইফেলের বাট দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে বাড়ী সবাইকে জড়ো করেছিল ঠিক সিঁদুরে আম গাছটির নিচে। প্রথমে বিস্ময়ে বিহ্বল মানুষগুলোকে পাশাপাশি সারি করে দাঁড় করায়। তারপর চারজন সৈনিক বন্দুক তুলে গুলি করতে প্রস্তত হয়। তখনই উঠানের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা দলনেতা তাদের থামায়। তারপর উর্দুতে কি যেন নির্দেশ দেয়, আর স্মিত হাসে।
সৈন্যরা বন্দুক নামিয়ে আবার নতুন করে মানুষগুলোকে সাজাতে শুরু করে। উচ্চতা অনুসারে, ছোট থেকে বড়, এই ক্রমানুসারে এক লাইনে দাঁড় করায় সবাইকে। লাইনের প্রথমে মিনু মাসির ভাসুরের ছোট ছেলেটা চিৎকার করে কাঁদছিল। তার ঠিক পেছনে, ভাসুরের পনের বছরের ছেলেটি ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। তারপর মিনু মাসির শ্বাশুড়ী, বয়সের ভাড়ে একটু সামনে ঝোঁকা।
এর ঠিক পেছনে , মিনু মাসির জা, লাইনের সামনে থাকা ছেলে দু’টির মা। তারপর মিনুমাসির শ্বশুর, বয়সে সবচেয়ে বড় হলেও, উচ্চতার দিক দিয়ে নয়, পরণে হলুদ জামা, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। এর পর মিনুমাসির কলেজে পড়া দেবর, কপাল কেটে রক্ত ঝরছে তাঁর। তারপর বাড়ীর বড় ছেলে। সবশেষে, মিনু মাসির স্বামী, মাস তিনেক আগেই কেবল বিয়ে হয়েছে তাঁর।
মানব সজ্জাটি সম্পূর্ণ হলে, মিলিটারীদের নেতা, কি মনে করে, ক্রন্দনরত শিশুটিকে সরিয়ে দেয়, তারপর উর্দুতে আবার কি যেন নির্দেশ দেয়। সৈন্যরা যখন রাইফেল তুলে, গুলি করতে উদ্যত হয়, তখন মিনুমাসির মনে হয়েছিল, সে চিৎকার করে উঠবে, কিন্তু তার আগেই জ্ঞান হারায় সে। কিন্তু জ্ঞান হারানোর আগে, ছোট থেকে বড় করে সাজানো মানুষগুলো তাঁর মনে একেবারে গেঁথে যায়।
আর বাকী জীবন ভর, সব কিছুই এর ঠিক বিপরীত ক্রমে সাজাতে থাকে।….

মেঘলা আকাশের রাতে, সাধুশ্মশানের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীর মৃদু স্রোতে যেমন কচুরীপানা দুলতে দুলতে ভেসে যায় ভাটির দিকে, তেমনি আমাদের আধোভৌতিক বাড়ীটিতে সন্ধ্যা এগিয়ে চলছে চুপচাপ। নিরবে, তবে নি:শব্দে নয়। সন্ধ্যার নিজস্ব কিছু শব্দ আছে আমাদের বাড়ীতে। আজ যেহেতু মা বাড়ীতে নেই, তাই নিজস্ব শব্দ থেকে বাদ যাবে ক্ষুদ্র তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের এক তীক্ষ্ণ কন্ঠস্বর। যেহেতু মায়ের তীক্ষ্ণ স্বরটি নেই, তাই বাবার বাজখাই কণ্ঠও সুপ্ত হয়ে আছে, তাঁর কণ্ঠনালীর গভীরে। বাড়ীর ভেতর যে শব্দটি অবিরত ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে , সে শব্দটি আমার কণ্ঠ থেকে নি:সৃত। আজকের মতো ভারী আর গম্ভীর নয়। বরং তীক্ষ্ণ , আমি অক্লান্তভাবে আউড়ে চলছি, আমার বই, প্রথম ভাগের প্রতিটি ছড়া।

‘খোকন খোকন ডাক পাড়ি,
খোকন মোদের কার বাড়ী।’

ছোট এক টেবিলের উপর, সবশেষে প্রজ্জ্বলিত, সবচেয়ে ছোট বায়েজীদ হারিকেনটি আলো ছড়াচ্ছে। হলুদ আলো, ক্লান্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে আমার বইয়ের উপর। দেয়ালে স্থাপিত হরিণের শিং-এর ছায়া পড়েছে, পাশের দেয়ালে টানানো বিবেকানন্দের লাইভ সাইজ পোষ্টারে, তাঁর জ্বলতে থাকা বাঁ চোখের উপর। বিবেকানন্দের পেছনে কন্যা কুমারীর সমুদ্র, আবছা আলোয় কালচে আকার ধরেছে। হরিণের শিং-এর কালো ছায়া, বিবেকানন্দের চোখকে যেন অন্ধ করে দিতে চায়। তাঁর আত্মপ্রত্যয়ী দৃষ্টির মাঝে , হরিণের মৃত মস্তক যেন এক মৃত্যুর বীজ বুনে দিচ্ছে।

দেয়ালে পাশাপাশি টানানো মৃত হরিণের মাথা আর আত্মপ্রত্যয়ী গেরুয়া বসনের ‘কন্যাকুমারীতে বিবেকানন্দ’-এর ছবিটি লাগিয়েছিলেন আমার দাদু রাইচরণ বিশ্বাস। মৃত হরিণের মস্তক আর বিবেকানন্দের ছবিতে এক পরষ্পর বিরোধী সুর আছে, তা আমি বুঝতে পেরেছি আরো অনেকদিন পর। একটু ভাবুন , দেয়ালে পাশাপশি দু’টি শিল্প। একটি দ্বিমাত্রিক, অন্যটি ত্রিমাত্রিক। দৃশ্যত: দু’টি বিপরীত ধর্মী চরিত্রের যুগলবন্দী। আমার দাদু রাইচরণের চরিত্রও এর চেয়ে ব্যতীক্রম কিছু ছিল না। সহজাত প্রাণীজ প্রবৃত্তির সাথে, পরিশীলিত সভ‌্য মানবিক আচরণের এক সংকর। হরিণ শিকারের হিংস্রতা যদি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হয়, তবে বিবেকানন্দের ছবিটি আর তাঁর ‘জীব প্রেম’ হবে পরিশীলিত মানবতার এক জ্বলজ্বলে দৃষ্টান্ত। রাইচরণ বিশ্বাস নিজের অজ্ঞাতসারেই, মানবচরিত্র আর সভ্যতার এক সম্পূর্ণ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছিলেনে তাঁর ঘরের দেয়ালে।

বহু বছর পর, বিবেকানন্দের ছবিটা যখন জীর্ণ হয়ে খসে পড়ে, সেখানে এক জীবনানন্দের ছবি টানিয়ে দিই। এতে করে, আমি যখন শুতে যেতাম, তখন মনে হতো, পাশাপশি দু’টি হরিণের মস্তক বা পাশাপাশি দু’টি জীবনানন্দের ছবি টানানো আছে দেয়ালে। কেননা, জীবনানন্দের মুখের মাঝে যে বিষন্নতা, সেই একই বিষন্নতা যেন মৃত হরিণের মস্তকে।
আর হরিণের মস্তকের ভেতর যে শূণ্যতা, সেই একই শূণ্যতা, জীবনানন্দের সাদাকালো ছবির পরাবাস্তব চোখ দু’টিতে। হরিণের মস্তকে যেমন কোন চোখ নেই। জীবনানন্দের চোখের ভেতর তেমন কোন দৃষ্টি নেই। সেই দৃষ্টি অন্যত্র, অন্য কোথাও।

পাশের ঘর থেকে নিচু ভল্যুমে রেডিও বাজছে। রেডিওর শব্দ, আর সংবাদপত্রের পাতা উল্টানোর খসখস শব্দ ছাড়া আমার বাবার ঘরটি নিরব। বাবার ঘরের প্রতিটি ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেয়ার জন্য, আমার কেবল মৃদু দু’টি শব্দের ইশারাই যথেষ্ট। বাবা তাঁর সোনালী ফ্রেমের চশমাটি লাগিয়ে নিয়েছে চোখে। বায়েজীদের বড় হারিকেনটি, বিছানার উপর এক পুরাতন পত্রিকা পেতে, তার উপর রাখা। রেডিওটা নিরবে বাজছে, পাশাপাশি দু’টি বালিশের মাঝখানে।

দেয়াল ঘড়িতে পিতলের পেন্ডুলাম স্থির হয়ে আছে, চিরদিনের মতো। বাবা বালিশে হেলান দিয়ে অথবা বাঁহাতের কনুইয়ে ভর দিয়ে নিবিষ্টমনে পত্রিকা পড়ছে। মাঝে মাঝে উল্টাচ্ছে খবরের কাগজের পাতা।

আমার বাঁদিকের খোলা দরজা দিয়ে রান্না ঘরটি দেখা যায়। রান্না ঘরের আলো এসে পড়েছে বারান্দার শেষ মাথায়, যেখানে কুণ্ডুলী পাকিয়ে বাবার পোষা কুকুরটি শুয়ে আছে, ঝিঁমিয়ে ঝিঁমিয়ে অপেক্ষা করছে রাতের খাবারের ঠিক পরের মুহুর্তটির জন্য। রাতের খাবার শেষে একটা মাছ-তরকারীর দলা, উঠানের একপাশে রাখার টিনের থালায় ফেলে দিয়ে, বাবা হাত ধুতে যাবে কলতলায়। চুলায় আগুনের টকটকে লাল শিখা দেখা যায়। ঠাহর করা যায়, আরতি বটিতে কি জানি কুটছে। মিনু মাসি এদিকে পেছন ফিরে, ডালের সম্ভার দিতেই ছ্যাঁত করে এক শব্দ হলো, আর পাঁচ পোড়ন আর মরিচের একটা ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো বাড়ীময়।

বাড়ীর সামনে দিয়ে আঁকা-বাঁকা অজগরের মতো বিশাল সর্পিল কাঁচা সড়ক পথ হতে, হাট ফেরতা মানুষ-জনের আলাপাচারীতার খন্ডিতাংশ অস্পষ্ট শুনা যাচ্ছে। কখনা খন্দে পড়া রিকশার ঝাঁকি খাওয়ার ধাতব শব্দ, কখনো বা বেলের ক্রিং ক্রিং। ইটে বোঝাই ঠেলাগাড়ীর ঠেলাওয়ালারা গান ধরেছে, ‘লাজু লালছেরে, লাজুর জামাই আইতাছে, হিয়া লাজু লালছে…’।
এমনি অসংখ্য শ্রুত-অশ্রুত শব্দের মাঝে বিরামহীন ডেকে চলছে, ঝিঁঝিঁ পোকা। আর বাড়ীর আশে-পাশের ঝোঁপ জঙ্গলে, জোনাকী পোকা, কেবল জ্বলে আর নেভে।

এই সব শব্দ আর আলো-আঁধারের খেলার মাঝে ঘুমিয়ে পড়তাম, কখনো কখনো রাতের খাবার না খেয়ে। আধো ঘুমের মাঝেই, আমাকে খাইয়ে দিতো, কখনো মা, কখনো মিনু মাসি।

আজ অনেকগুলো বছর পর, আমার ভাবতে অবাক লাগে, নিদ্রাদেবীর এমন আশীর্বাদপুষ্ট অভিনন্দন সিংহের টেবিলের ড্রয়ারে, অসংখ্য ঘুমের বটিকা।একবার ঘুমিয়ে যাবার পর, সাধুশ্মশান বা পৃথিবী কেমন ভাবে চলতো, আমার কখনো জানাই ছিল না। কেবল , আমি আজ যে রাতের কথা লিখছি, সে রাতে কোন এক অজানা নির্দেশে, আমার নিদ্রার পৃথীবী যেন অবচেতন ভাবে জাগ্রত ছিল। আমি ঘুমিয়ে সজাগ ছিলাম। রাতের শ্রুত-অশ্রুত শব্দগুলোর মাঝে ভিন্ন কিছু শব্দ শুনেছিলাম, যা আমি কখনোই শুনতে চাই নি। যে শব্দগুলো বেশকিছু বছর পর আমার মনের মাঝে, বেলুনের ফাঁপা শূণ্যতা প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিল, যে শূণ্যতার মাঝে আমি এখনো নিজেকে খুঁজি।

পাশের ঘর থেকে রেডিও-র শব্দ বন্ধ হয়েছে। বাবার ঘর থেকে পত্রিকার পাতা উল্টানোর শব্দ আর শুনা যায় না। বাবার ঘরের চিরাচরিত শব্দের পরিবর্তে, খাটে এপাশ-ওপাশ ফেরার মৃদু ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ শুনা যাচ্ছে, মাঝে মাঝে।

আমার খাটে মিনু মাসি শুয়ে। আমি তাঁর দিকে পেছন ফিরে। আমার বিছানাতেও একই রকম মৃদু এপাশ ওপাশ ফেরার শব্দ। আমার ঘরের মেঝেতে বিছানা পেতে শুয়েছে আরতি, তাঁর মৃদু নাক ডাকার শব্দ শুনা যায়। কিন্তু বাবার ঘরে আর আমার ঘরের অস্থির ক্যাঁচ-ক্যাঁচ শব্দ যেন ভিন্ন, তবে একই মাত্রার। আমি পেছন ফিরে থাকলেও টের পেলাম, কেউ একজন আমার বিছানায় উঠে বসেছে। তারপর অন্ধকারে আমাকে স্পর্শ করেছে। গুঁজে দেয়া মশারীর একটি কোণা উঠে গেল। কেউ একজন নামলো, বিছানা থেকে। কিন্তু কে নামলো, তা পেছন ফিরে দেখতে, কেউ একজন আমাকে নিষেধ করেছে কানে কানে। কার যেন দু’টি পা, মেঝেতে টিপে টিপে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। দরজার খিল খুলে যাওয়ার শব্দ হলো মৃদু। দরজার ডাসা তুলে নিচ্ছে কেউ। আমার চোখ বন্ধ, নিদ্রিত আমার মাঝে যেন কেবল দু’টি কানই জাগ্রত। বাকী সব অঙ্গ ঘুমে কাতর। বাইরের সব শব্দ , এমনকি ঝিঁঝিঁর ডাকও থেমে গেছে। আমি দরজার পাল্লা খুলে যাবার শব্দ শুনলাম। পুরোনো জং-ধরা, দরজার কবজায়, তীক্ষ্ণ একটু ক্যাঁচ-ক্যাঁচ শব্দ হলো। শুনতে পেলাম কেউ একজন, বেরিয়ে যাচ্ছে ঘর থেকে।

বাইরে কোন এক কাঠের দরজায় মৃদু টোকার শব্দ হলে, সে দরজাটি যে খুলে যায়, তার শব্দও শুনতে পাই।
তারপর সবকিছু চুপচাপ। কিছু সময়ের জন্য। পাশের ঘরের বিছানায় অস্থির এপাশ-ওপাশ করা যে শব্দটি শুনা যাচ্ছিল, সে শব্দ আবার শুনা যেতে থাকে। তবে এবার যেন ভিন্ন সুরে, আর দ্রুত লয়ে। এবার সে শব্দ যেন আগের চেয়ে অনেক বেশী শ্রুত , আর তীক্ষ্ণ। অনেক বেশী সুরেলা , আর অশ্লীল। অনেক বেশী উন্মাতাল , আর বল্গাহারা। এই শব্দের তাণ্ডব তাল যেন, সমগ্র পৃথিবীকে আর সব শব্দ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এবার অন্য এক বাদ্যযন্ত্র যেন যোগ দিল নতুন তালে, সেটি এক চিকণ কণ্ঠের, মৃদু গোঙ্গানীর শব্দ, যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসছে।

বহু বছর পর , আমি যেদিন এই সংগীতের মাঝে নিজেকে জুড়ে দিই, সেদিন বুঝেছি, এই সুর কতটা বাস্তব, আর কতটা তাড়ণাময়।

সে সুরের মূর্ছণা থামলো। তারপর আবার সবকিছু চুপচাপ। আবার সেই ঝিঁঝিঁর ডাক ফিরে এলো, রাতের নি:শব্দের মাঝে। ঝরের পর প্রকৃতি যেমন শান্ত হয়ে যায়, বাড়িটি যেন তেমনি স্থির আর শান্ত হয়ে উঠে। বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই কাটে।

আমার ঘরের দরজাটি খুলে গেলো ফের, সেই একই ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে। তবে এবার সন্তর্পণে নয়, স্বাভাবিক এক সপ্রতিভ হাতে। হুড়কোটি তুলে দেবার শব্দ, খিল তুলে দেবার শব্দও শুনা গেল। মশারীর একটি কোণা উঠে গেল। কেউ একজন প্রবেশ করলো মশারীর ভেতর। এবার আর, পাশের ঘর কিংবা আমার বিছানায়, অস্থির এপাশ-ওপাশের শব্দটি শুনা গেল না। নিদ্রাদেবী ফিরে এলো পূনর্বার। আমি তলিয়ে গেলাম বিস্মৃতির অন্ধকারে।

পরদিন ভোরে, গতরাতের শব্দগুলোকে আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে হলো না। মনে হলো, স্বপ্নের শব্দ , স্বপ্নেই মিলিয়ে গেছে। সন্ধ্যায় কয়লার ইঞ্জিন বিকট হুইসেলে, পূবদিকের গাছপালার আড়ালে হারিয়ে যায়। মিনু মাসি, আমি আর আরতি , কাঁচা সড়কের দিকে তাকিয়ে থাকি। বেশ কিছুক্ষণ পর একটা রিক্সা এগিয়ে আসতে থাকে। ক্রমেই, সে রিক্সায় এক যাত্রীর ছায়া ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে। যখন নবীন নির্ভূল দৃষ্টি নিশ্চিত হয়, রিক্সার যাত্রীটি আমার মা ভিন্ন অন্য কেউ হতে পারে না, তখন দৌড়ে নেমে আসি ছাদ থেকে। মা রিক্সা থেকে নামে। তাঁর স্বেদ-ক্লান্ত শ্যামলা মুখ। সিঁদুর খানিকটা লেপ্টে গিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে, সিঁথিতে, অনেকটা রক্তের দাগের মতো। মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ি আমি।

আলিঙ্গন! আমি মনে মনে ভাবি, এই একটি মাত্র আলিঙ্গন কখনোই উষ্ণতা হারিয়ে ফেলে নি ।

মায়ের আগমনে, বাড়ীটির পরিবেশ যেন, মুহুর্তেই বদলে যায়। মায়ের চিকণ কন্ঠস্বর প্রথমেই বিদ্ধ করে মিনু মাসিকে।’ কি একটা ময়লা জামা পরায়ে রাখছে ছেলেটারে! আমি মরলে ছেলেটার যে কি হইবো?’

আঁচল দিয়ে , আমার মুখটি মুছে দিল মা, যদিও বাতসে আর্দ্রতা বা আমার মুখে ঘাম কোনটিই ছিল না। বাইরে থেকে ফিরে এলেই, মা মুখটা আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দিতো, যদিও , তাঁর আঁচল আমার মুখের চেয়ে অধিক ভ্রমণ-ক্লান্ত, ধুলোয়-মলিন ।
মা ঘরে ঢুকলেন না। ভ্রমণের ব্যাগ থেকে, গামছা আর প্রিন্টের সুতী শাড়ী বের করে ছুটলেন পুকুরঘাটে। পরিশুদ্ধ হয়ে, ভেজা কাপড়ে মা যখন সপাৎ সপাৎ শব্দ তুলে বারান্দায় উঠে এলো, তখন তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বলেছে। তিনটি হারিকেনও জ্বলে উঠেছে, সবশেষে ছোট বায়েজীদ হারিকেন পৌঁছে গেছে আমার টেবিলে। তবে আমি আর আজ পড়তে বসি নি। মা, ফিরে আসার আনন্দেই যেন আমার ছুটি।

বাবা এখনো ফিরে নি। খুব সম্ভব বাজারে , মহিন ডাক্তারের দোকানে, হারিকেনের টিমটিমে আলোয় দাবা খেলছে। মা তাঁর খয়েরী ভ্রমণ ব্যাগ থেকে একটা নতুন জামা বের করে পরতে বললেন। আমার বায়না অনুযায়ী ক্রিকেট ব্যাট আনে নি মা। ‘ এতো বড় ঢাকায় , আমি ব্যাটের দোকান কই পাবরে, বাপ?’ আমি গায়ের শার্ট খুলে নতুন শার্ট পরতে শুরু করলাম।

কিন্তু মা আর সেদিকে তাকালেন না। নাক কুঁচকে কিসের যেন গন্ধ খুঁজলেন। কিছু একটা তিনি খুঁজছেন, এমনভাবে তাকালেন আশেপাশে। তারপর , আলমারী খুলে, আমার দৃষ্টিকে আড়াল করে কি যেন একটা খুঁজলেন। হঠাৎ মুহুর্তেই তাঁর কণ্ঠ বদলে গেল। সাত দিন পর আমাকে দেখতে পেয়ে, তাঁর কণ্ঠে যে সুললিত ভাবটি এসেছিল , তা উধাও। ‘ অভি যা তো, সামনে পরীক্ষা , অংক কর গিয়ে।’

আমি পড়ার টেবিলে ফিরে এলাম।

সন্ধ্যা চলমান বিশ্বাস বাড়ীতে। গতকালের সন্ধ্যার নিজস্ব শব্দগুলোর সাথে, নতুন যে শব্দটি যোগ হয়েছে, তা আমার মায়ের কণ্ঠস্বর। বাকী সব কিছুই আগের মতো। তবে বাবার ঘর থেকে নিচু ভল্যুমে রেডিও শব্দ শোনা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে মায়ের কন্ঠস্বর ভেসে আসছে, রান্না ঘর থেকে।
‘এই ডেকচিটা কেন নামাইছিস?’
‘দুই সের তেলের পুরাটাই শেষ?’
‘আরেকটা বাটি গেল কোথায়?’

এমনি করে , একই ধরণের এককাভিনয় চলতে থাকে, বাড়ীতে। বাকী সবাই চুপচাপ। অনু বিশ্বাসের কথার প্রতিবাদ হয় না বিশ্বাসবাড়ীতে।

আমি যখন চারের নামতা আউড়ে যাচ্ছিলাম, তখন টিনের গেটে শব্দ শুনলাম। বাবা ফিরেছে।

“এতো বড় এক ভারী ব্যাগ, স্টেশানে একবার গেলেও তো পারতা।’ যার উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলা, সেখান থেকে উত্তর এলো না। আমি যখন ছয়ের নামতা আউড়ে যাচ্ছিলাম, তখন কলতলায়, টিপকলে, হ্যান্ডেলের শব্দ শুনা গেল, তারপর চোখে-মুখে জল ছিটানোর শব্দ। পোষা কুকুরটা দুইবার ঘেউ ঘেউ করে উঠলো। মনে হয় জানান দিলো, সেও আছে। বাবার ঘর থেকে এবার রেডিওর শব্দ শুনা যাচ্ছে। মা রান্না ঘর থেকে চিৎকার বললেন, ‘ ভলিউম কমাও, অভির পরীক্ষা সামনে।’

আমি যখন নয়ের নামতা শেষ করি, তখনই পাশের ঘর থেকে, মায়ের কণ্ঠ শুনা গেল। স্বাভাবিক তীক্ষ্ণ কণ্ঠ নয়, বরং ভীষণ রকম চাপা। হিস হিস কণ্ঠ আর রাগী সুর।’ কি ভাব ? আমি কিছুই বুঝি না, না?’
বাবার কণ্ঠ চাপা, ‘ছিঃ অনু! এমনটা তুমি ভাবলা কেমনে?’
– এখানে যে গুণে গুণে বিশটা ছিল। তিনটা গেল কই?
-তার আমি কি জানি? অভি কিংবা আরতি , এখান থেকে নিয়ে বেলুন ফুলাতে পারে।
– কানারে তুমি হাইকোর্ট দেখাও। তালা খুলে, এখান থেকে এগুলো অভি নিয়ে যাবে?

কেন জানি নিষিদ্ধ কৌতুহল নিয়ে আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম, পাশের ঘরের দিকে। দরজা সামান্য ফাঁকা। ঘরের আলো বারান্দায় পড়েছে। ফাঁক দিয়ে আমি দেখলাম, মা খোলা আলমারীর সামনে দাঁড়িয়ে। তাঁর হাতে সাদা রঙের একটা বাক্স। এই বাক্স থেকেই আমি আর আরতি সঙ্গোপনে বেলুন সরিয়ে, ফুলাতাম। বড়রা কেন আলমারীতে বেলুন লুকিয়ে রাখে , তা জানা ছিল না। এই বাক্স থেকে যদি তিনটে বেলুন হারিয়ে যায়, তবে তা নিয়ে দু’জন পরিণত মানুষ কেন যুদ্ধ করবে , তা আমার বোধের তখনও অনেক বাইরে।

অবোধগম্য বিষয়টি, যখন বোধগম্য হবে, তখন আমার ভেতর এক শূণ্যতার তৈরী হবে, অনেকটা বেলুনের মতোই।

মা এবার হিস্টিরিয়া গ্রস্তের মতো , চোখ মুখ বন্ধ করে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে শুরু করলো।
‘ মনে কর, কিছুই বুঝি না, না।’
‘ব্যাডাইনগুলারে আমি ভালোই চিনি।’
‘এক একটা হাড়ে হাড়ে বজ্জাত।’

মা একাই হিস হিস করে বলে যাচ্ছে। বাবা চুপচাপ মাথা নিচু করে শুনছে। রান্না ঘর বেরিয়ে এলো মিনু মাসি।

বাবা মরিয়া হয়ে বললেন, দয়া করে থামো। তোমার বোন এদিকেই আসছে।

মা তাড়াহুড়ো করে বেলুনের বাক্সটি আলমারিতে লুকিয়ে ফেলে। মিনু মাসি যখন ঘরের বারান্দায় উঠে, তখন মা আঁচল দিয়ে চোখে মুছে।

মিনু মাসি জিজ্ঞেস করে, অনু, কি হইছে?

মা আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলে, ‘কিছু না।’

আবার চুপচাপ সন্ধ্যা চলতে থাকে বিশ্বাসবাড়ীতে।

মন্তব্য করুন