উপন্যাসসাধুশ্মসানের উপকথা

সাধু শ্শশানের উপকথা │ সিরোসিস, মুখাগ্নি ও আত্মা │ স্নেহাশিস রায়

সিরোসিস, মুখাগ্নি ও আত্মা

মিনু মাসি মারা যায় তিরাশি সালের বৈশাখ মাসের শেষ দিকে। দিন সাতেক আগে, এক দিনের সায়াহ্নে, ঝর উঠবে বলে, প্রচণ্ড বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। পাঁশুটে এক আশ্চর্য হলুদ আলোয় ভরে যায় পুরো আকাশ। ভয়াল ফ্যাকাসে আকাশ। মিনু মাসি কাঁচা আম কুঁড়াবে বলে, বেরিয়ে আসে উঠোনে। পেছন পেছন আমার মা। পাঁশুটে হলুদ সেই আলোতে , মিনু মাসিকে এমন ফ্যাকাসে লাগছিল যে, আমার মায়ের মনে হয়েছিল, আকাশের সব হলুদ রঙ বিদ্যুৎ চমকের সাথে প্রবেশ করেছে মিনু মাসির রক্তে। ঘরে ফেরার পরও মিনু মাসির গায়ের রঙ ঠিক তেমনি ফ্যাকাসে। আমার মা ভীষণ চমকে উঠে। ‘ দিদি, তোর মনে হয় জন্ডিস।’

পরদিন, বিশ্বাস বাড়ীর ছাদ থেকে, ধান ক্ষেতের এক কোণায় আমরা একটি গরুর মৃতদেহ দেখতে পাই। গাঁয়ের উপকথায়, মৃতদেহটির কথা লেখা থাকলেও, গরুর মৃত্যুর কারণটি লেখা নেই, এমন কি গরুর মালিকের নামটিও অনুপস্থিত। কালো ছা্ই রঙের মৃত গরুটির উদর ছিল ব্যাপক স্ফীত। মৃতদেহটি সেখানেই পঁচতে শুরু করে। কেউ এসে গরুর শবদেহটি মাটি-চাপা দেয়ার ব্যবস্থা করে দেয় নি। যেন কার দায় পড়েছে? সবাই যেন অপেক্ষা করছিল, এক ঝাঁক শকুনের, কখন আকাশ থেকে বৃত্তাকারে নেমে এসে, স্বল্পতম সময়ে গরুর সাদা ঝকঝকে কংকাল জমিনের উপর ফেলে রেখে, আবার বৃত্তাকারে ঘুরতে ঘুরতে উঠে যাবে উর্ধ্বাকাশে। সত্যি পরদিন সকালে, এক ঝাঁক শকুন এসে হামলে পড়েছিল, মৃতদেহটির উপর।

আমাদের বাড়ীর ছাদ থেকে আমরা তাকিয়ে দেখেছিলাম, শত শত শকুন, আমাদের গাঁয়ের ভূতলে। বিকট দর্শন এক একটি শকুণ , আশ্চর্য দ্রুততায়, গরুর লালচে মাংস টেনে টেনে ছিঁড়ছিল। মাত্র মিনিট ত্রিশেকের মাঝেই একটা কংকাল পড়ে রইলো সড়কের এক পাশে। খানিক পরেই তুমুল বৃষ্টি নামলো সাধুশ্মশান গ্রামে, আর একটা পঁচা গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো বাতাসে। গন্ধটি নাকে লাগতেই, হড় হড় করে করে বমি করতে শুরু করে মিনু মাসি। সেই শুরু। টানা সাতদিন। যতবার গন্ধ এসে লেগেছিল তাঁর নাকে, ততবার সে বমি করার চেষ্টা করে। প্রতিবার বমির চেষ্টার পর, তাঁর চোখ যেন আরো বেশী পাণ্ডুর।

থানা হাসপাতাল থেকে ডাক্তার আসে। ডাক্তারের শীর্ণ হাতে, পৃথুল এক ব্যাগ। সন্ধ্যায় হারিকেনের মৃদু আলোয়, ডাক্তারের মুখের এক পাশ গম্ভীর। অন্যপাশটি অন্ধকার। ব্যাগ খুলে, ডাক্তার কিম্ভূত এক যন্ত্র বের করে। যন্ত্রটি কানে লাগায়। যন্ত্রের অন্যপাশের গোল চাকতিটি মিনু মাসির বুকে চেপে ধরে , কি যেন শুনে। তারপর মিনু মাসির কবজি টিপে ধরে, হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ। অবশেষে পেটের উপর সাবধানে চাপ দিয়ে কি যেন বোঝার চেষ্টা করে। আমার মনে হয়, বিষয়টি মজার! কানের যন্ত্রটি পেটমোটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখতেই, কৌতুহল আমাকে চেপে ধরে। ডাক্তার যখন বাবার সাথে একলা কথা বলবে বলে, তাঁর ব্যাগটি ঘর থেকে নিয়ে বেরিয়ে আসে, আমিও ব্যাগটিকে অনুসরণ করি।

বাবার চেম্বারে বসে ডাক্তার বলে, অধীরবাবু, মনে হয় সিরোসিস।

ডাক্তার যখন সিরোসিস শব্দটি উচ্চারণ করে, তাঁর কণ্ঠস্বরে এক ভয়াল আবহ । এরপর বহুদিন আমার মনে হয়েছে,সিরোসিস কোন রোগ নয়। রূপকথার এক বিভৎস দৈত্যের নাম, যা বিভৎস নাক, বিভৎস দাঁত, বিভৎস হাতে বিভৎস নখর নিয়ে অপেক্ষা করে আছে, সাধুশ্মশানের নদীটির বাঁকেই, অন্ধকার হলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে সবার উপর।

পরদিন  গ্রামের সুধীন ডাক্তার আসে। জলভরা আশ্চর্য স্বচ্ছ এক  প্লাস্টিকের ব্যাগ , মশারী টানানো স্ট্যান্ড থেকে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে একটা প্লাস্টিকের নল দিয়ে টিপ টিপ করে ফোঁটা ফোঁটা জল,  বাম হাত দিয়ে, মিনু মাসির শরীরে প্রবেশ করে। শিশু অভিনন্দনের প্রশ্নের উত্তরে, সুধীন ডাক্তার বলে, ‘এইডা হইলো গিয়া তরল স্যালাইন। মুখ দিয়া খাইতে না পারলে, রক্তের মাঝে খাবার দিতে হয়।’ সারাদিন ধরে , টিপ টিপ করে ঝরতে থাকে দৃশ্যমান এক তরল। আমার মনে হয়, এমন দারুণ ব্যবস্থা থাকতে, মানুষ যে কেন চিবিয়ে খেতে চায়!

স্যালাইন শুরুর পর, মিনু মাসির বমির প্রকোপ কিছুটা কমে। কিন্তু তাঁর উদরের স্ফীতি বাড়তে থাকে। কিন্তু আমার সেদিকে খেয়াল দেবার সুযোগ কই। এরই মাঝে, নি:শেষিত স্যালাইন ব্যাগের একটু কেটে , সেখানে জল ঢালার বুদ্ধি আবিষ্কার করে ফেলেছে আরতি। এমন অভিনব আবিষ্কারে আমি ভীষণ উল্লসিত। মিনু মাসির অসুস্থতার ডামাডোলে, কেউ আর পড়ার কথা বলছে না। স্কুলে যাই, স্কুল থেকে ফিরে, স্যালাইন ব্যাগে মগ দিয়ে জল ঢালি। স্যালাইন ব্যাগটি ভরে উঠতেই, সেটি ঝুলিয়ে দিই পেয়ারা গাছের ডালে। টিপ টিপ করে, জল পড়ে। কখনো টিপ টিপ তরলের গতি বাড়াই , কখনো কমাই। দারুণ এক ক্ষমতা ! নিয়ন্ত্রণ করা মাঝেও বেশ আনন্দ আছে। মানুষের মৃত্যুশয্যার মতো জীবনের জটিল ভাবনা আমাকে স্পর্শ করে না।

মাঝে মাঝে, শুনা যায়, মিনু মাসি মারা যাচ্ছে। পাড়ার একজন, অন্যজনের কাছে বলে, ‘ অহন শুধু শেষ সময়ের অপেক্ষা’। মানুষের মৃত্যু, তাঁর ফলাফল  আমার কাছে ততটা স্পষ্ট নয়। শিশুদের অন্তর্জগতে অতীত ভীষণ ক্ষণস্থায়ী। ভবিষ্যত অস্পষ্ট। শুধু বর্তমানটিই যেন, একমাত্র সত্য। তাই মিনু মাসি যখন মারা যাচ্ছে, তখনও আমি, পেয়ারা গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখা স্যালাইন ব্যাগ থেকে টিপ টিপ করে পড়তে থাকা তরলের গতি নিয়ে মশগুল। সেই দিনগুলোর কথা ভাবছি। মনে হয়, শিশুর অবাক হবার ক্ষমতা, আর শিশুর সরলতাই, তাঁর সকল আনন্দের উৎস। পূর্ণবয়স্ক মানুষের পক্ষে, বাতিল স্যালাইনের ব্যাগে জল  ঢেলে, অথবা, প্রজাপতির পেছনে ছুটে, সারাদিন কাটিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। তাই তারা দু:খী।

মিনু মাসির শেষ সময়ের কিছু আগে, বাবা এসে আমাকে ঘরে নিয়ে যায়। মিনু মাসির কথা বলার শক্তি তখন রহিত। খুব সম্ভবত: মিনু মাসির নির্বাক দৃষ্টি আমাকে খুঁজছিল। বাবা বুঝতে পেরে, আমাকে দাঁড় করিয়ে দেয়, মিনু মাসির শয্যার ডান পাশে। মিনু মাসির মুখ ভীষণ হলুদ আর গোল  । উদর ব্যাপক স্ফীত। মনে হলো, সিরোসিস নামের দৈত্যটি মিনুমাসিকে অদৃশ্য নখর দিয়ে খামচে ধরেছে। আর মিনু মাসি যন্ত্রণায় ছটফট করছে। মিনু মাসি, ডান হাত বাড়িয়ে দেয়, আমার চিবুক স্পর্শ করে। কিন্তু মিনু মাসির হাতের এই স্পর্শ তো আমার চেনা নয়। মিনু মাসি বহুদিন, মাথায়-কপালে হাত বুলিয়ে গান গাইতে গাইতে আমাকে ঘুম পাড়িয়েছেন, চিবুক ধরে সিঁথি কেটে দিয়েছেন।  মিনু মাসির হাত তো এমন শীতল ছিল না কখনো।

চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল মিনু মাসির। মিনু মাসি বামে ফিরে তাকায় মায়ের দিকে। ধীরে ধীরে, মিনু মাসির কম্পিত দু’টি হাত জোড় বদ্ধ হয়, যেন আমার মায়ের কাছে, নিরব ভাষায় ক্ষমা চাইছে। মা, মিনু মাসির হাত দু’টো ধরে ফেলে। মিনু মাসির হাত দু’টি তাঁর নিজের চিবুকে চেপে ধরে । তারপর হাত ঘষে  ঘষে উষ্ণ করার চেষ্টা করে যায়, প্রাণপণে। মায়ের চোখে অশ্রু। আমার হঠাৎ মনে পড়ে,পেয়ারা গাছের স্যালাইন ব্যাগটিতে, বোধ হয় এতোক্ষণে জল ফুরিয়ে গেছে। আমি বেরিয়ে আসি ঘর থেকে। পেয়ারা গাছে ঝুলতে থাকা স্যালাইন ব্যাগটি সত্যি জল ফুরিয়ে চুপসে গেছে।

অল্প কিছুক্ষণের মাঝেই, পাড়ার লোকজন এসে ভীড় করে, বিশ্বাস বাড়ীতে। কোন এক বয়ো:বৃদ্ধা বলে, সেই দিন জন্মাইলো মাইয়াডা। বিয়া হইলো। বিধবা হইলো। আইজ মিনু আর নাই। আমার কাছে, মনে হলো, এই তো মিনু মাসি শুয়ে আছে। ‘ আইজ মিনু আর নাই’ কথাটির অর্থ আমার কাছে পরিষ্কার না হলেও, মিনু মাসির জন্য মায়ের কান্না, আর প্রতিবেশী মানুষের ভীড় দেখে, প্রথম বারের মতো মনে হলো, মিনু মাসি আর কখনোই জেগে উঠেবে না। শিশু জন্মের পর থেকে মৃত্যু শব্দটি শুনে ঠিকই। কিন্তু উপলব্ধি করে না। শিশু অভিনন্দন প্রথমবারের মতো মৃত্যু শব্দটিকে উপলব্ধি করে. প্রথমবার বুঝতে পারে, মরণ এমন এক দেশ, যে দেশ থেকে মানুষ ফিরে আসে না।

আরতি বলতো, ‘মানুষ মইরা গেলে, ভগবান মানুষরে তারার দেশে পাঠাইয়া দেয়। কালিপূজার রাইতে, সবাই যখন, বংশের প্রদীপ জ্বলায়, সেখান থেকেই তারা আমারারে দেহে।’ আমি জিজ্ঞেস করতাম, একই তারার দেশে? না কি আলাদা , আলাদা? আরতি বলতো, ‘একও হইতে পারে, আবার আলাদাও হইতে পারে। দেখো না কত কত তারা’।  শ্যামাপূজার দীপাবলীর রাতে, আমি আমাদের বাড়ীর ছাদে দাঁড়িয়ে, অগণ্য তারার মেলা দেখে, কতবার বুঝতে চেষ্টা করেছি, মিনু মাসি কোন তারার বাসিন্দা। আমি সারা জীবন ধরেই, হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া মিনু মাসির শূণ্যতা অনুভব করেছি। আমার সকল কিছুর উত্তর ছিল মিনু মাসি। আমার মনে হয়, মিনু মাসি বেঁচে থাকলে, আমি হয়তো, অনেক বেশী পূর্ণতা নিয়ে বেড়ে উঠতাম।

বৈশাখের শেষ, আকাশে দুপুরের প্রবল সূর্য। উঠানের এক কোণে, বিশাল কাঁচা-মিঠা আম গাছ, নিবিঢ় এক ছায়া ফেলেছে। সেই ছায়ায় পাটি বিছিয়ে, মিনু মাসিকে শুইয়ে দেয়া হয়েছে। গ্রীষ্মের নিস্তরঙ্গ বাতাসের চেয়েও, স্থির হয়ে শুয়ে আছে মিনু মাসি। বুজিয়ে দেয়া দুটি চোখের পাতায়, দু’টি তুলসী পাতা। চোখের পাতায় সবুজ তুলসীর পাতা রেখে কেই বা ঘুমায়?

শিয়রে জ্বালিয়ে দেয়া ধূপকাঠি থেকে ধুঁয়া উঠছে। ধুপকাঠির গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে, পুরো বাড়ী জুড়ে। সেই গন্ধে চাপা পড়েছে, উঠানের কোনে ফুটে থাকা বেলী ফুলের গন্ধ। গ্রামের সবাই এসে, মিনু মাসির , রোগ-ক্লিষ্ট ক্লান্ত, স্ফীত মুখ আর দেহটি দেখতে থাকে । কারো মুখে আতংকের ছায়া, কারো মুখ বিষন্ন, কেউ নিরবে ক্রন্দনরত। আমাদের দু:সম্পর্কের এক জ্ঞাতি বৃদ্ধা দিদিমা, চোখ মুছতে মুছতে বলে, ‘কি যে এক অপরূপ সুন্দর আছিল মিনু, মনে হইতো এক রাজকইন্যা।’  দু:খিনী সেই রাজকন্যা তখন, পৃথিবীর সকল রূপ , মোহ, আর সব বিশেষণের উর্দ্ধে উঠে, নির্বিকার শুয়ে আছে, আম গাছের ছায়ায়, যেন অদৃশ্য এক সোনার কাঠির স্পর্শে।

কেউ একজন  দাহ করার তাগাদা দেয়। বৈশাখ মাসের শেষ।’ঝর কহন শুরু হয়, তার কি কোন ঠিক আছে।’ দাহের প্রস্তুতি চলে। বাঁশ দিয়ে খাটিয়া তৈরী হয়। খাটিয়ার উপর চাটাইয়ের ছাদ। অভির মনে হয়, খাটিয়াটি যেন বাঁশের ভেলা। পুরোহিত ঘোষণা করে, ‘মুখাগ্নি’র অধিকার অভির। গত মাসে    ‘মুখেভাত’-এর  নিমন্ত্রণ খেয়ে এসেছে অভি। অভি জানে ‘মুখেভাত’ মানে কি। কিন্তু ‘মুখাগ্নি’ বলতে কি বুঝায়,  অভি তা বুঝে উঠতে পারে না।

অভির পরণের ইংলিশ প্যান্ট আর শার্ট খুলে, একটা ধুতি পেঁচিয়ে দেয়া হয়। তারপর সবাই যখন, মিনু মাসির মৃত দেহ নিয়ে, বল হরি, হরিবোল ধ্বনি তুলে, নদীর ধারের শ্মশানের দিকে যায়, তখন অভি বাবার হাত ধরে, শবযাত্রাকে অনুসরণ করে ।  ভীড়, কান্না, বিভিন্ন অবোধগম্য ধর্মীয় ক্রিয়া কর্মের  মাঝে, অভি খানিকটা বিপন্ন বোধ করে, পুনরায় শিশুর ক্রীড়াজগতে ফিরে যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে।

ভীষণ রকম রৌদ্রকরোজ্জ্বল এক দিন। শ্মশানযাত্রীরা সব গরমে ঘামছে। মনে হয়, হরি নাম যপতে যপতে সবাই ক্লান্ত। গরমে আর আর্দ্রতায়, ঘর্মক্লান্ত মানুষের মাঝে যেন আর মৃত্যুর বিষাদ নেই। এই সব, মৃত্যু আর শ্মশান-দাহ যেন জীবনের অংশ। নদীর ধারেই শ্মশান।  চারদিক খোলা এক টিনের চালাঘর। মিনু মাসিকে ঘরের ছায়ায় এনে রাখা হয়। তারপর , চিতা সাজাতে থাকে শ্মশান যাত্রীরা। প্রথমে চেলা কাঠ দিয়ে একটি শয্যা মতো তৈরী করে। অভি গভীর মনযোগে, চেলা কাঠ দিয়ে চিতা সাজানোর দৃশ্যটি দেখে। একটার পর একটা চেলাকাঠ, সাজিয়ে রাখা হচ্ছে। প্রথম বারের মতো, অভির মনো হলো, অন্তত: চিতা সাজানোর  বিষয়টি একঘেঁয়ে নয়। মনে হলো, এই শয্যার উপর একটি তোষক পেতে , তাতে চাদর বিছিয়ে দিলে দিব্যি শুয়ে আকাশ দেখা যাবে।

কিন্তু কেউ বিছানা পাতে না। বরং মিনুমাসিকে চেলা কাঠের বিছানায় এনে শুইয়ে দেয়া হয়। তারপর আবার একটার পর একটা চেলা কাঠ দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। চেলা কাঠের ভেতর দিয়ে, মিনু মাসির কিছু অংশ দেখা যায়। কিন্তু মুখ দেখা যাচ্ছে না। কেন জানি, মিনু মাসির মুখটি অভির দেখতে ইচ্ছে করে। চোখের পাতায় কি এখনো তুলসী পাতা দু’টি রয়েছে?

পুরোহিত অভির দিকে এগিয়ে আসে। পুরোহিত ঠাকুর ধর্মের কথা বলতে ভালোবাসে। সমবেত শ্মশানযাত্রীদের উদ্দেশ্য করে বলে, ‘মানুষের দেহ মরণশীল, কিন্তু আত্মা অবিনশ্বর। মানুষ যেমন পুরাতন পোষাক ছেড়ে নতুন পোষাক ধারণ করে, আত্মাও তাই। আত্মা শুধু এক জীবের দেহ ছেড়ে, অন্য দেহ ধারণ করে। মিনুর আত্মাও পুরাতন দেহ পরিত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করবে।’ তারপর পুরোহিত বিড় বিড় করে মন্ত্র পড়ে। দুর্বোধ্য সে মন্ত্রের অর্থ বা উদ্দেশ্য কি, তার কিছুই  অভির কাছে বোধগম্য নয়। সে চিতার চেলা কাঠে ঢাকা মিনু মাসির মুখটি দেখার চেষ্টা করে।

অভিকে চিতার সামনে নিয়ে আসা হয়। তারপর, ছোট জলভরা একটা মাটির ঘড়া, বাবা অভির কাঁধে রাখে। পুরোহিত ঘড়ায় একটি ছিদ্র করে দেয়। অভি  চিতাটি প্রদক্ষিণ শুরু করে, বাবা কাঁধে মাটির ঘড়াটি ধরে রাখে। মাটির ঘড়ার ছিদ্র দিয়ে জল পড়ছে, অভির পিঠ ভিজিয়ে দিচ্ছে , অভির পা ভিজিয়ে দিচ্ছে, অভির ইচ্ছে হয়, ঘাড় ঘুড়িয়ে জলের ধারাটি দেখে। কিন্তু দেখা হয়ে উঠে না।

চিতা প্রদক্ষিণ শেষ হলে, পাঠকাঠির মশালটি নিয়ে আসে কেউ একজন। পুরোহিত আবার মন্ত্র পড়ে। কেউ একজন সেই  মশালে অগ্নি সংযোগ করে। পাঠকাঠিতে আগুন লকলকিয়ে উঠে। বাবা আর অভির যৌথ হাত, চিতার দিকে এগিয়ে যায়। চিতার একটি অংশ কায়দা করে খোলা রাখা হয়েছে। মিনু মাসির মুখটি এবার দেখা যায়। কৃষ্ণবর্ণ চোখের পাতায়, তুলসী পাতা দু’টি নেই। পাঠকাঠির মশালের আগুন মিনুমাসির মুখ স্পর্শ করে। তারপর একজন এগিয়ে এসে, আগুনের মশালটি নেয়। চিতার চারদিক ঘুরে সমগ্র চিতায় অগ্নি সংযোগ করে। কিছুক্ষণের মাঝে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে চিতা।  প্রথমবারের মতো অভির মনে হয়, মুখেভাত আর মুখাগ্নির মাঝে বিস্তর তফাৎ।

ঠিক তখনই শ্মশানের উত্তর পশ্চিমকোণে, একটি একটা ঘুর্ণায়মান বালিয়ারী উঠে। ঘুর্ণায়মান সেই বাতাসে চক্রাকারে উড়তে থাকে, গাছের শুকনো পাতা, কাগজের টুকরো, লজেন্সের মোড়ক, আর ধুলি। ঘুর্ণায়মান বালিয়ারিটি, তারপর ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। কিন্তু শুকনো পাতাগুলো উড়তে থাকে। অভির মনে হতে থাকে, এই ঘুর্ণায়মান বাতাসই কি তবে, তবে মিনু মাসির আত্মা?

মন্তব্য করুন