কবিতাগুচ্ছ কবিতাপাণ্ডুলিপির কবিতা

আপনার শুরুতে আবার শুরু করুন ও অনান্য কবিতা│সৈয়দ তৌফিক উল্লাহ

আপনার শুরুতে আবার শুরু করুন ও অনান্য কবিতা│সৈয়দ তৌফিক উল্লাহ
▌ সৈয়দ তৌফিক উল্লাহ
সৈয়দ তৌফিক উ

উৎসর্গ: শাফি সমুদ্র, চারু পিন্টু, রুদ্র শায়ক ও অদ্বৈত অরবিন্দ।

এক.
আপনার শুরুতে আবার শুরু করুন

মানুষেরা খুব উজ্জ্বল আলোতে চোখ খুলে দেখে
অপরিহার্য বনসাই হবার বিদ্যা শিখে ফেলেছে।
চারপাশে রঙিন প্রেমের বান্ডিল জীবনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময়
আমরা যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি প্রতিদিনের লড়াই এবং বিজয়গুলি
বিশ্বের সমস্ত প্রাণই অনুভব করছে অথচ পৃথিবীর
সময় থমকে আছে আমাদের অপরাধে।

সভ্যমানুষ প্রকৃতির কাছে মুখ দেখাবার যোগ্যতা হারিয়ে আজ
মুখোশ আবৃত হয়ে গেছে, তবুও লাজ-লজ্জাহীন মানুষেরদল
কতদিন‘ইবা লুকিয়ে রাখবে নিজেদের গৃহের গুহায়?
সামাজিকতার মানে পাল্টে নিমিষেই হয়ে গেল দূরত্ব নির্বাণের পথ
পুরাতন জীবনকে এত ভালবেসে একসাথে কাটিয়েছি তা‘হলো ছোঁয়াচে,
অপরিবর্তিত আমরা একে অপরের কাছে ছিলাম যাই, এখনও আমরা আছি তাই,
জীবন এর অর্থ যা বোঝায় তার সবকিছু যেমন ছিল ঠিক তেমন রয়েছে
শুধু নিরঙ্কুশ মৃত্যুর ধারাবাহিকতা ছাড়া সবই অটুট আছে।

কিছুই হারিয়ে যায়না অলস দু‘চোখে ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে ক্লান্তিরভারে স্বপ্নহীন
বিষন্নতার ঘেরাটোপের নিসঙ্গতা আক্সিজেনের মতো আজ প্রয়োজনীয়।
আর্য-অনার্য বিন্যাসের নবযাত্রায় হয়তো সৃষ্টি হবে বৃক্ষের মত প্রবীণ ভাষ্কর্য
অতঃপর একদিন সমস্ত কিছু আগের মতই হবে, মহাকালের কিছুই হারিয়ে যায়না ।
ক্ষমাহীন অ-গণিত মিনিট পূরণ করতে পারেন যদি
অ-গণিত ষাট সেকেন্ড মূল্যের দূরত্ব পাড়ি দিয়ে
অন্তরালের অপেক্ষা শেষ হবে একদিন!

সুদিনের খুব কাছাকাছি সময়ে পৃথিবী এবং এর মধ্যে যা কিছু
সব কিছুই প্রত্যাবর্তনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষারত!

দুই.
আয়না ভীতি

হতদরিদ্রের মুখ এখন আয়নায় আর দেখা যায় না
আয়নার ওপাশে হায়নার অট্টহাসি ভেসে আসে
পাঁজরের হাড়গুলো বুক হতে বের হয়ে আসতে চায়
চোখ গুলো কোঠরে ঢুকে গেছে
কপাল জোড়া দুশ্চিন্তার ছাপচিত্র
ভাগ্য রেখাগুলো কপালে জানি
কর্পোরেট আবাস গড়েছে আর
খুবলে খাচ্ছে মগজের স্পার্কিং
জীর্ণশীর্ণ দেহখানি নিজেরই দেখে ভয় হয়
ওটা কি আমি?
নাকি আমার প্রেতাত্মা!

অনেকদিন হল আয়না দেখা ছেড়ে দিয়েছি,
এখন আয়নাই আমাকে দেখে ফেলে!

তিন.
ভবিষ্যতের জন্য একটি কবিতা

বুনো ফুলের ছায়ায় অবারিত বাতাসে
অন্ধকার জলের ঘোর কাঁটার আগে,
কারুকৃত আলোর আত্মপ্রকাশকারীরা
নগ্ন পদতলে বিধতে জোৎস্নার স্প্লিন্টার।

চারদিকে মরীচিকার-ব্যারিকেড
জলের জপমালা বিস্তৃত করে
চোখ বন্ধ করি প্রতিসৃত প্রবল বৃষ্টিতে
ভালবাসা হতে হবে শারীরবৃত্তীয় প্রয়োজনীয়তায়
অক্ষত থাকার সময় নাভি থেকে উপরের শূন্য চিহ্ন প্রতিফলিত হয়ে।

শয্যাশায়ী পর্বতমালার আগে,
সব কিছুই দেখা যায় কিন্তু দেখা যায় না
চোখের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা জলজধারা।
আমি যা স্পর্শ করছি তা তুমি নও;-
আমার উপত্যকা সম্পূর্ণ নগ্ন কাঁটা আর অন্ধকার জলের
বিচ্ছিন্নতার বিষাদে চকচকে রটনারা
বরাবর রটে যায় একের পর এক।

যেতে যেতে আমাদের হাড়গুলো, মাথার খুলিগুলো,
বার বার চূর্ণকরে পিচ্ছিল শরীরে আঙ্গুলের ছাপরেখে
পাখিরা গোপন রহস্য আমাকে জানিয়ে দেয়।

মৃত্যু চিন্তায় নিরর্থক স্থানান্তর যাত্রার প্রতিটি পর্যায়ে
গণকবর দিয়ে প্রসারিত হয় ভূমির রক্ত এর ভিতরে ভাসমান
সঙ্কুচিত বরফ খণ্ডভরা একগ্লাস নীরবতা
মেঘাচ্ছন্ন বিশৃঙ্খলা নিয়ে শব্দগুলিতে মোড়ানো
আনন্দময় বিভ্রান্তির প্রয়োজনীয় অন্ধকারে বিঁধে
অন্ধকার কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছি।

এই ঝলমলে অন্ধকারে কিছুই দেখার নেই,
হয়ত এজন্যই একে অপরকে লঙ্ঘন করে
সবাই রাস্তায় আমার পাশ দিয়ে চলে যায়।

চার.
সত্যিই আমরা এখনো হাল ছাড়িনি

প্রতিদিন আমরা এখনও এগিয়ে যাচ্ছি
নতুন দিন নতুন জীবনের জন্য নতুন গল্প নিয়ে।

আগুনের হল্কা স্পর্শ করে,
আমাদের মধ্যে সমস্ত আগুনের পুনরাবৃত্তি ঘটাই,
শিরাগুলিতে গভীরভাবে ছড়িয়ে দিই তার উত্তাপ
যে‘কঠিন সময়গুলি আমাদের মন খারাপ ছিল বা আছে
সহজেই কি জীবন থেকে মুছে ফেলতে পারি,
তাই দাহ্য করি প্রণয়ের জড়তা ছুড়ে ফেলে
এগিয়ে যাই হয়তো হবে মায়াময় আগামীকাল
একটি নতুন দিন আর একটি নতুন জীবনের জন্য।

যদি অল্প অল্প করে কেউ আমাদের ভালবাসা বন্ধ করে
আমরাও ভালবাসতে ভালবাসতে ফতুর করে দেব।
প্রেমীরা হারিয়ে গেলেও আমাদের ভালবাসা,
একান্ত আমাদের নিজেদের মত,
আমাদের মধ্যে কিছুই নিভানো বা ভুলিয়ে দেওয়া যায় না,
আমাদের ভালবাসা কখনই হারিয়ে যায়না।

যদি তুমি আমাদের ভুলে যাও
হে‘নিসঙ্গতার শৃঙ্খল ভাঙ্গা দেবদূত!
আমরা তোমাকে জানিয়ে দিতে চাই
জীবনের পথে কোনও দিকনির্দেশনার তোয়াক্কা করিনা।

তারপরও কখন কেউ যদি আমাদের ভুলে যায়
দয়া করে খুঁজো না,
অন্ধকারকে বিদায় জানানোর মতো
আমরাও তোমাদের ভুলে যাব!

পাঁচ.
অস্পষ্ট গানের শেষ জ্যা

প্রকৃতির কাঁদছে, কাঁদুক;
মানুষ মরছে, মরুক;

আমাদের শান্তি বোঝায়, যা দামের বাইরে
আগুনের জমিন পুনরুদ্ধার, সবুজ করে তোলে
দূরত্বের বেড়া তৈরি করি, শত্রুকে দূরে রাখতে
যে কখনও অর্থ, বা বস্তুগত সামগ্রীর জন্য পোড়ে না।

তাই মহামারী আর মহাউৎসব এক হয়ে যায়
প্রতিদিন সকাল থেকে রাত অবধি মানুষের ভিড়
সুরক্ষা কবচ গুলে খাওয়ালেও মানবিক বোধজাগে না
ঢপের নীতি কথায় স্বদেশ শাষনে স্ববিরোধীতা চলে না
বে‘নজির বেহাইয়পণা তবু আমাদের পিছু ছাড়ে না।

নিরর্থক স্থানান্তর আরও গভীরে ডুবে যায়
আমাদের নিজস্ব বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করে
আমরা একটি ডুবন্ত পৃথিবীর ভয়ঙ্কর সময় অনুভব করছি‘না?
তবু কেন আমরা আবার বেঁচে থাকার মতো স্বপ্ন দেখি!

ফ্যালফ্যাল করছে আমাদের বাঁচা-মরা
অন্ধকার মাধ্যমে গভীর উষ্ণতা নিয়ে
সংক্রমিত করছে শেষবারের মতো পৃথিবীর যত শুভ্রতা
অপ্রত্যাশিত নিখুঁতভাবে সবাই হঠাৎ কফিনটি বন্ধ করে দেয়।

ছয়.
মাতাল হয়ে যাওয়া নামটি আমার

একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটছে
সৃষ্টির শুরু থেকেই,

এই মুহুর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস ও ভালবাসা রক্ষায়
কারাজানি নীল শিরাগুলিকে ঠান্ডা করে দিয়েছিল,
আমি একটি স্ফটিক মাতৃগহ্বরের গভীরতায় নিজেকে খুঁজে পাই,
আতঃপর যৌবনের ভিতরে, একটি আলো যা স্থির থাকে রূহুর মত
আমি যা বলতে চাইছি তা-তুমিই।

যে ভালোবাসা এখনও অন্যের জন্য প্রাণ দেয়নি!
যে সত্য এখনও আবিষ্কার হয়নি!
যে ভুলে যাওয়া তাকের পুরাতন বই, এখনও পড়া হয়নি!
যে মানবিকতার শিক্ষা পরিবার থেকে পেয়েছে মানুষ, অথচ তার প্রয়োগ করেনি!
হয়তোবা এজন্যই আমি বারবার জীবিত হয়ে উঠি।

তাই আমি যেদিকে তাকাই,
দেখি পথভ্রষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির মিথ্যা বন্ধুত্বের রূপান্তর
পরিবর্তে আমি একটি উজ্জ্বল বসন্ত দ্বারা ধুয়ে ফেলি নিজেকে
কবিতা আবৃত্তি করতে থাকি, কাপুরুষদের কারও কারও চোখে জ্বলতে-জ্বলতে,
যখন আমি এই পৃথিবীতে প্রথম পা রেখেছিলাম,
আমার নিজের শরীর দিয়ে জরায়ুর ফুল হয়ে ফুটেছিলাম,
টের পেয়েছিলাম কি মায়ের নরক যন্ত্রণার সেই নগ্ন নাড়ীর টান?

আমি মাতৃত্বের যুগ দেখেছি,
আমি পিতৃত্বের যুগ দেখেছি,
অনুভব করেছি কেউ কেউ আমার
বুকের উপর কোমল হাতের চিহ্ন রেখে যেতেযেতে
আমার দেহের সেইসব অনুভব সংগীতের সাথে অনুরণন করে চলে অদ্যবধি।

নিরর্থকতা যাঁরা গভীর অন্ধকার সমান গোলাপকে বুলেটে পরিণত করেছে,
বিপর্যয় ঘটাবে বলে ইতিহাসের লজ্জাজনক বেদনাদায়ক
উত্তরণের দরজা অবরুদ্ধ করি আর বারবার আটকে দিই সেই খিলান।

জীবনের উপর আপোষ করার জন্য উন্মুখ
কাপুরুষদের বিভ্রান্তির সেই কৃত্রিম বৃত্তটি ভেঙে ফেলতে
পুরানো দাঁতের মতো পড়ে গিয়ে আবার গজিয়ে উঠি।
হয়তোবা এজন্যই আমি বারবার জীবিত হয়ে উঠি।

এই বাড়ি, যার ভোর জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের আলোকময় স্মৃতিপট,
প্রতি মুহূর্তে আমি আমাদেরকে আনন্দ উদযাপনের জন্য দেখবো বলে,
যদিওবা আমি একটি বিস্ফোরণের তাজা শেল হাতে এবং পাঁজরের বুলেটগুলি দিয়ে
আমার জীবনকে স্পন্দিত করছি, আমাদের বাসযোগ্য ধারিত্রীকে
যে কাপুরুষদেরদল ঠেলে দেবে মৃত্যুর দিকে তা প্রতিহত করতে।
যদিওবা আমি ক্ষুদ্র মানুষ, প্রবৃত্তিগুলি সংকুচিত হয়ে গেছে,
তারপরও এজন্যই আমি বারবার জীবিত হয়ে উঠি।

সাত.
কবিদের জীবনের মার্জিনগুলিতে মরিচা পড়েছে!

সময়ের ক্ষতিগ্রস্থ চিহ্ন নিয়ে গর্ব করেছেন অসুস্থ সমাজের ছায়াগুলি
তাদের নিজস্ব আকার নিয়ে তৃপ্তির ডেকুর তুলছে
সভ্যতার ত্রিপক্ষীয় বিরোধীতায় ক্লান্ত;-

ডানহাতি, বামহাতী, শূন্যতা,বিচ্ছেদের গল্প লিখতে গিয়ে
ধৈর্যের আলোরা মারা গেছে, কান্নারা শুকিয়ে গেছে
প্রতি রাতের ক্ষুধার্ত প্রেমের চোখে,আমাদের ভিতরে,
গ্রীষ্মে জেগে ওঠার মতো, কাব্যিক ওহি আসে
গোপনে আমাদের শব্দগুলি যেআকার নিচ্ছিল
আকার বদলানো অক্ষরের মাঝে, গোলমালে বসন্ত আমাদের প্রতিটি কোষে,
শব্দগুলির জন্য নিজেদের হারিয়ে যেতে দিইনি সামাজিক বিচ্যুতি থেকে।

কবিদের স্বগোপন উজ্জ্বলতা কেউকি জানে না?
প্রথাবিরুদ্ধ অর্থের অনুপস্থিতি কেউকি বুঝতে পারে না?

আত্মগোপনের জায়গা থেকে
আমরা বের হয়ে আসি নবীর নয় কবির বেশে।
আমাদের শব্দগুলি ভয়ে ফিসফিস করে বলেছিল
আপনার মুখে আগুন ধরিয়ে দেবে,
অভিনব শব্দের সাথে সময়ের মিম্বার থেকে
তাদের মিথ্যা কথা বলা স্বভাভজাত গোখরার মত সত্য।

মৃত্যুর স্ফটিক করিডোর দিয়ে, আমাদের সময় এখন চলছে,
একটি কঠিন ভ্রমণের মধ্যদিয়ে, আমাদের চারপশে
যেখানে আন্তরিক ও সম্ভাব্য মৃতরা বাস করছে।

সামাজিক আয়নার চোখে এত দ্রুত পাল্টে যাবে মুনাফার অংক-কষা
তখন আয়নার প্রতিচ্ছবি অনেকগুলি পরিবর্তনের স্লাইডশো দেখিয়ে দেবে
এযেন শূন্যতার মধ্য দিয়ে একটি সামাজিক প্রথাবিরুদ্ধতার উত্তেজনায়
আমাদের শব্দরা বিস্ফোরিত হয়ে ছড়িয়ে পরবে সময়ের বারণ ভেঙে।

বাজরী আগুনের সাথে বন্ধুত্ব করেছেন, পুঁড়ে ছাই হয়ে যাবেন
আবারও কবিরা মুখোমুখি হবো ছদ্মবেশী বুর্জোয় শত্রুদের সাথে,
আবারও বিশ্বাসঘাতকতার মুখোমুখি হবো,
প্রতারিত হবো জেনেও তবু আমাদের থামানো যাবে না।

আট.
শেষ অধ্যায়ের পর্যবেক্ষণ

আমার পাঁজরের অপরাধময় বাতাস প্রায় বন্ধ যে কোনও সময় সূর্যের মত অস্তাচলে ঢলে পড়বে,
প্রিয় পাঁপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়নি, আবার গণনা করে আবিষ্কার করছি বুক-পাঁজরের কয়টি ছিদ্র, জরায়ুর কয়টি পাঁজর জুড়ে তার জিভ প্রসারিত করে,কব্জির হাড়ের স্তূপ এবং কয়েকটি মেরুদণ্ডের একটি খুলি।
রাতের বেলায় খুলির অক্ষটি নিষ্পত্তির প্রাচীনতম গ্রাফিতির চোখ নিয়ে নিচ্ছীদ্র পড়ে থাকবে।যখন সমস্ত কিছু শীতল হয়ে এসেছিল, আলিঙ্গনের জন্য আমার হাত খুললাম,তার ঘ্রাণের গন্ধ পাবার সম্পূর্ণ ব্যার্থ চেষ্টা করছি নিজেকে শান্ত রাখার প্রত্যাশায়।

সংকুচিত শিকড়ের চেয়ে পুরানো বাস্তববাদী একটি কফিন অপেক্ষারত, আমার সমস্ত সম্পত্তি, বই, পড়ার টেবিল-চেয়ার, এ্যাশট্রে সব নির্বাক হয়ে পড়েছে, দেখছে আমি আর কবিতা পড়ার অপেক্ষায় নেই, আমি প্রস্তুতি নিই নির্জন কফিনে শুয়ে কবরের নীচে শয্যাশায়ী হবার শবযাত্রার, আমার দুইহাত থেকে উভয় পাশের আঙুল সমেত নখেরাও জানে যে আমার অন্তহীন বৃত্তের সময় শেষ।

আমি কিন্তু জানিনা, কীভাবে শুরু হয় কবরের নীচে জনাকীর্ণ দীর্ঘ ঘন্টার পর ঘন্টা, প্রশ্নোত্তর-জিজ্ঞাসার উত্তর পর্ব? দেহের হাড়েরা অনার্য ছিল আমার আট কুঠরী নয় দরজায়, এরপরে স্যাঁতসেঁতে হাড়গুলি সাজিয়ে সবচেয়ে অপরিহার্য বাঁচার মিথ্যে নেশা লুণ্ঠন করে রূহু, অজ্ঞতার বাইরে অভিনয়ে কাটিয়েছি সর্বদা আমার জীবনকালে, যেতে হবে জেনেও প্রস্তুত হইনি কতটা না নির্বোধ ছিলাম?

শেষবার অতীত যেন মিটিমিটি হেসে দূর হতে সূর্যের ছত্রাকযুক্ত ক্ষত থেকে কেবল আমার পতন পর্যবেক্ষণ করে। অথচ একদা আমি বাড়ারবাল হরিদাস পাল হয়ে ছড়ি ঘুরাতাম। ধরারে করতাম না সরা জ্ঞান, মানুষ তুমি শুধুই মাটির খেলনা বিশেষ, মেয়াদ ফুরালেই তুমি নেই, একদা ছিলে হয়ে যাবে।

নয়.
লাশকাটা ঘরে ব্যাবচ্ছেদের আগে

লাশকাটা ঘরে ধোয়া ওড়া বরফের চাই গলে তৈরি হচ্ছে নকল স্রোতের টান, অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছ সব দাহ্যকাল, শুধু সময় নামক ঘূনপোকা, মাছিদের ওড়াউড়ি, কর্পুর আর চায়ের পাতির সাথে বরফগলা জলে ভিজে যায় হুগলার মাদুরে মোড়ানো নিথর শরীর।

লোকজনের হাকডাক, যেন বিদেয় করলেই ওরা বাচে।পড়শিদের নকল কান্না, ডোমদের হাতের, ছেনী-বাটালীর টুকটাক ছন্দে গুনগুন মাতাল গানমৃতরা সবই টের পায় করার থাকে না কিছু। শুধু ছড়িয়ে থাকা পা’দুটো গীটবাধা থাকে, জন্মান্তরের নাড়িকাটা ব্যথার খাতাবন্ধ হলো।

চমৎকার এইতো জীবন, কড়া বেন্জীনের গন্ধে,
উলঙ্গ শরীরে নিথর দেহ নিয়ে আপেক্ষায় পড়ে থাকা,
মর্গের দরজা দিয়ে ডাক্তার আসলেই শরীরের ব্যাবচ্ছেদ হবে।

মর্গের বাইরে মানুষের কোলাহলে হঠাৎ
বন্ধ্যা কোন নদী ও নারীর মত রাতের আকাশে
অতীত থেকে যে মূলত বেদনার মধ্যে থেকেও
এই আলোর আঁধারেও নিথর শরীরে তারার ঝলক দেখায়।

জীবন জুড়ে শুধু পলকই ফেললাম, দেখা হলোনা কিছুই।
প্রস্থানে সব আলো আঁধার হয়ে যায়।
জীবন একটা শকুন, ওর ওড়া চাই।
তাই তাড়াহুড়ো আর অস্হিরতার নিস্তার নাই।

দশ.
সাজানো গোছানো কৃত্রিম শব্দবন্ধ

আমাদের আঙুলগুলো প্রজাপতির ডানা হলো’না
শুধু দেখতেই থাকলো, ফ্যাকসে ঠোটগুলো মৃত্যুর নামতা
আওড়াতে থাকে ফ্যালফ্যালে চোখের ভাষায়
পাঁজরের হাড়ের বোবাব্যাথা, ভূমি ও ভাতের চাহিদা
কেউ কি পেরেছে পাড়ি দিতে!

কবুতরের কেটে দেওয়া ডানার মতো ব্যাথায় কাতর স্বরে,
যীশুখ্রীষ্টের পুনরুন্থান এর মতো বিশ্বাসী আত্মায়
গোপন গ্রেনেড আর বারুদে পোড়া সব দুপুর,
সব ভোর, জীবন মানেই ষড়যন্ত্রের মৃত্যুকূপ।
সময়ের ঔদ্ধত্য হয়ে গেছে আভিজাত্য
হয়ে উঠেছে ক্ষমতা শ্রেণী বৈষম্যের মানদন্ড।

শুধু কেউ বোঝেনি নাড়ীকাটা প্রসূতি মায়ের ব্যাথা।।

যে প্রাচুর্য নিয়ে মানুষের অহংকার ছিল
সেটা গর্ভেই বিনাশ হয়েছে, বিপ্লব এখন মানুষের নাম,
আন্দোলন বা প্রতিবাদ নয়।

এগারো.
আমি দৃষ্টির বাইরে থাকায় কেন আমি মনের বাইরে থাকবো?

প্রত্যেকে বলে জীবন সহজ,
তবে সত্যিকার অর্থে এটি বেঁচে নেই।

সময় কঠিন হয়ে যায়
যদিও আমি কাঁদতে চাই
আমি বাঁচতে লড়াই করতে যাচ্ছি,
যদিও আমি মরতে চাইছি।

আমি গর্জনের মাঝে দাঁড়িয়ে আছি
একটি উত্তেজনাকর তীরে
এবং আমি আমার হাত ধরে।

দুঃখের সাথে আমরা নিজের মন হারিয়ে ফেলেছি,
ভয় নেই, সব পুনরুদ্ধারে; আমার সব কিছু পিছনে ছেড়েছি।
ঠিক চাঁদের মতো, সূর্যের মতো,
জোয়ারের নিশ্চয়তার সাথে,
আশা যেমন উচু হয়,
একটি রাতে বা একটি দিনে।

যা আমরা দেখি বা দেখিনা‘তা
একটি স্বপ্নের মধ্যে একটি স্বপ্ন কিন্তু।
আমি একটি কালো সমুদ্র, লাফিয়ে ও প্রশস্ত,
সামুদ্রিক জোয়ার সহ্য করে পড়ি দিচ্ছি।

সন্ত্রাস ও ভয়ের রাত্রি রেখে যাওয়া স্বপ্নের ঘুম ভেংঙে
আমি আচমকা জেগে উঠি
যা আমরা পছন্দ সমগ্র মহাবিশ্ব জুড়ে ফিরিয়ে আনব বলে
এখন থেকে সব কিছু পাল্টে ফেলেছি
ছিড়ে দিয়েছি সব সর্বনাশা বির্নিমাণ ।

হয়ত সকলেই একদিন চারদিকে জড়ো হবে
আগুনের দিব্বী দ্রোহের লাভার স্রোতে ভেসে
আমার প্রত্যাবর্তনের হবে অধীর আগ্রহে উত্তেজিত
দৃষ্টির বাইরে হতে ফিরবো মনের গহীনে।

বারো.
বিবাদের ষাঁড়

আমি কেউ না!
আসলে,আপনিও কেউ না?
তাহলে আমাদের মধ্যে একটি জুড়ি আছে – বলুন না!

আমার ঘৃণা করার সময় ছিল না, কারণ
কবর আমাকে বাধা দিত,
আর জীবন এতটা পর্যাপ্ত ছিল না যে
শত্রুতা শেষ করতে পারত।

কিংবা ভালোবাসার সময়ও আমার ছিল না,
তবে থেকে কিছু শিল্প হতে হবে,
ভালবাসার ছোট পরিশ্রম, আমি ভেবেছিলাম,
আমার জন্য যথেষ্ট বড় ছিল।

আমি একটি কালো সমুদ্র লাফিয়ে প্রশস্ত হতে শিখেছি
প্রতিহত করতে সাইকোপ্যাথিক চিন্তাভাবনা।

ইতিহাসের লজ্জার ঝুঁকির বাইরে গিয়ে দেখুন
শ্রদ্ধার সাথে যুক্তির মূল বিষয়গুলি ভাবুন
ধারণার একটি সত্তা বিবাদ থেকে বুড়ো ষাঁড়ের
ধারাবাহিকতার যে পরিবর্তন, তার অভিযোজন করুন
নিজেই টেরপাবেন অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে রয়েছেন,
আত্মবিলাপের ঘোর কেটে গেলেই সেরে উঠবেন।

সৈয়দ তৌফিক উল্লাহ
আমার ব্লগ

Comments (6)

  1. Avatar

    Beautifully written..Loved reading 8-12. Best to avoid use of any English words in Bangla poetry..personal opinion though. Thank you for sharing.

  2. Avatar
    মহিউদ্দীন মোহাম্মদ

    ভাল লিখেছ তৌফিক। এগিয়ে যাও…প্রথম কবিতাটা একটু বেশি ভাল লেগেছে

মন্তব্য করুন