গদ্য │রাষ্ট্র ও গণ আন্দোলন সংখ্যারাষ্ট্র ও গণআন্দোলন সংখ্যা

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে গণ-আন্দোলন, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্বাধীনতার বিচারিক বিজয়│সৈয়দ তৌফিক উল্লাহ

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে গণ-আন্দোলন, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্বাধীনতার বিচারিক বিজয়
▌ সৈয়দ তৌফিক উল্লাহ
সৈয়দ তৌফিক উ

য় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা৷ লাখো শহিদের প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া এক স্বাধীন দেশে বসে সেই স্বাধীনতায় কার অবদান কী ছিল তা নিয়ে আজও অহেতুক বিতর্ক চালিয়ে যাওয়া লজ্জাজনক ব্যাপার বলে আমি মনে করি৷বাংলাদেশ স্বাধীন করতে কার কী অবদান ছিল তা নিয়ে বিতর্কের যেন শেষ নেই৷

পচাত্তরে এক সামরিক অভ্যুত্থানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যা করে একদল সেনা সদস্য৷ সেই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে যখন যে দল ক্ষমতায় এসেছে এবং সামরিক শাসকরা নানাভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে নিজেদের মতো করে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, করছেন৷

তারা কি শুধু দেশ স্বাধীন করেছে মসনদের লোভে। কারা রাজাকার রাজনৈতিক দলগুলো কি তাদের চিনতেন না? যদি উত্তর না হয় তাহলে মসনদতত্ত সঠিক।আর যাদি হ্যা হয় তাহলে কেন আওয়ামী লীগ, বি এন পি, জাতীয় পার্টি সহ অনান্য রাজনৈতিক দলগুলো এখন কেন ধর্ম নির্ভর রাজনৈতিক দলগুলো কে বাতিল করতে চাইছেন। এ দেশের প্রধান দুই দলই ধর্ম নির্ভর রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ক্ষমতার লোভে একত্বতা প্রকাশ করেছেন। কেন করেছিলেন? কোথায় ছিল তখন দেশপ্রেম!

পাশাপাশি এই ধর্ম নির্ভর রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মের নামে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে চলে আসছে দীর্ঘ দিন ধরে, সেজন্য কেন তাদের ইতিপূর্বে নিবন্ধন বাতিল করেন নাই? উত্তর একটাই ক্ষমতারলোভ। কই তখন তো তাদের বোধদয় হয় নাই। দুধকলাদিয়ে কালসাপ পুষেছেন যারা ছোবলতো খাবেন, এটাই তো সার্বজনীন সত্য।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র বিশ বছরের মাথায় চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীরা যখন রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠছিলো সে সময় তার প্রতিবাদ করার জন্য কেউ-কেউ একটি সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

ফিরে দেখা ইতিহাসঃ

১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৩ তারিখে বাংলার বাণী পত্রিকার একটি খবরের শিরোনাম “দালাল মন্ত্রী ইসহাকের যাবজ্জীবন কারাদন্ড”। চারদলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের একাংশের আমির মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক সেই ‘দালাল মন্ত্রী’। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সমর্থনে গঠিত ডা. মালিক মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। স্বাধীনতার পর ওই মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের সঙ্গে তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়। রায়ের প্রায় ১০ মাস পর ’৭৩-এর ৫ ডিসেম্বর তিনি মুক্তি পান। মুক্তিযুদ্ধের পর সব মিলিয়ে তিনি প্রায় ২৪ মাস কারাগারে ছিলেন। ডা. মালিকের মন্ত্রিসভায় জামায়াতে ইসলামীর দুজন সদস্য ছিলেন। তাদের মধ্যে দলের বর্তমান জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মাওলানা আবুল কালাম মোহাম্মদ ইউসুফ অর্থমন্ত্রী এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত আমির আব্বাস আলী খান শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তারা দুজনই গ্রেপ্তার হন। একাত্তরের ১৪ আগস্ট ‘আজাদী দিবসে’ জয়পুরহাটে রাজাকার ও পুলিশ বাহিনীর সম্মিলিত কুচকাওয়াজে সভাপতির ভাষণে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সমর্থনে গঠিত ডা. মালিকের মন্ত্রিসভার সদস্যও সাবেক ভারপ্রাপ্ত শিক্ষামন্ত্রী প্রয়াত আব্বাস আলী খান বলেছিলেন, ‘রাজাকাররা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমূলে ধ্বংস করে দিতে জান কোরবান করতে বদ্ধপরিকর।’

আবুল কালাম ইউসুফ ’৭১ সালের মে মাসে খুলনার খানজাহান আলী সড়কের একটি আনসার ক্যাম্পে ৯৬ জন জামায়াতকর্মী নিয়ে প্রথম রাজাকার বাহিনী গঠন করেন। দৈনিক সংগ্রামসহ সে সময়ের সংবাদপত্রগুলোতে এ খবর ছাপা হয়। ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর সাধারণ ক্ষমাসংক্রান্ত প্রেসনোটে বলা হয়, ‘ধর্ষণ, খুন, খুনের চেষ্টা, ঘরবাড়ি অথবা জাহাজে অগ্নিসংযোগের দায়ে দন্ডিত ও অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রদর্শন প্রযোজ্য হইবে না।’ ১১ জানুয়ারি, ১৯৭২ দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরে ১০ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া বক্তৃতায় শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধবন্দী ও দালালদের বিচারের ঘোষণা দেন। ১ এপ্রিল ১৯৭২, দৈনিক পূর্বদেশ অনুযায়ী, পরে খুলনায় এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, কেউ দালালদের জন্য সুপারিশ করলে তাকেও দালাল সাব্যস্ত করা হবে। ১০ এপ্রিল ১৯৭২, দৈনিক ইত্তেফাক অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে বিবৃতি দেওয়া এবং পাকিস্তান সরকারে যোগ দেওয়া আওয়ামী লীগের গণপরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের ২৩ জনকে বহিষ্ককার করেন। ৩০ নভেম্বর, ১৯৭৩ সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আগে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত গ্রেপ্তার ছিল মোট ৩৭ হাজার ৪৭১ জন। তাদের দ্রুত বিচারের জন্য সরকার সারা দেশে ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। ’৭৩-এর অক্টোবর পর্যন্ত দুই হাজার ৮৮৪টি মামলা নিষ্কপত্তি হয়। বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর প্রায় ২৫ হাজার ৭১৯ জন আসামি ছাড়া পায়। কিন্তু সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আটক থাকা প্রায় ১১ হাজার আসামির বিচার চলছিল। এ ছাড়া ৭৫২ জনের সাজাও হয়। এদের মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যুদন্ড হয়েছিল। বাকিদের যাবজ্জীবন কারাদন্ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড হয়েছিল। পরে ’৭৫-এর ৩১ ডিসেম্বর জিয়াউর রহমান দালাল আইন বাতিল করার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় চারটি সুনির্দিষ্ট অপরাধে কারাগারে আটক ১১ হাজার আসামি, এমনকি সাজাপ্রাপ্তরাও জেল থেকে ছাড়া পায়।

১৪ মার্চ, ১৯৭৩ তারিখে দৈনিক পূর্বদেশ-এ প্রকাশিত খবরের শিরোনাম ছিল ‘দালাল আইনে সা’দ আহমদের যাবজ্জীবন কারাদন্ড’। খবরে বলা হয়, কুষ্টিয়া সেশন জজ-৩-এর বিশেষ ট্রাইব্যুনালের সদস্য আর কে বিশ্বাস কুষ্টিয়া শান্তি কমিটির সদস্য সা’দ আহমদকে পাক বাহিনীকে সহযোগিতা, অপহরণ ও নরহত্যার অভিযোগে এবং কুষ্টিয়া-১১ আসনে সাজানো উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার কারণে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছেন। রায়ে আদালত বলেন, ‘অভিযুক্তের আরও বেশি শাস্তি দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এই জেলার একজন সফল আইনজীবী হিসেবে অতীতের কাজের জন্য তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হলো।’ ১১ জুন, ১৯৭২ তারিখে দৈনিক বাংলায় প্রধান শিরোনাম ছিল−‘দালালির দায়ে মৃত্যুদন্ড’। কুষ্টিয়ার দায়রা জজ ও বিশেষ ট্রাইব্যুনালের সদস্য রবীন্দ্র কুমার বিশ্বাস ৮ জুন রাজাকার চিকন আলীর বিরুদ্ধে এ রায় দেন। কুষ্টিয়ার মিরপুর গ্রামের চিকন আলীর বিরুদ্ধে ’৭১ সালের ১৯ অক্টোবর একই গ্রামের ইয়াজউদ্দিনকে গুলি করে মারার অভিযোগ ছিল। পরে উচ্চ আদালত সাজা কমিয়ে চিকন আলীকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন। আট বছর চার মাস জেল খাটার পর দালাল আইন বাতিলের সুযোগে চিকন আলী ছাড়া পান।

৬ অক্টোবর, ১৯৭২ দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়, প্রখ্যাত শিক্ষক অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ হত্যার অভিযোগে ১৯৭২ এর ৫ অক্টোবর ঢাকার বিশেষ ট্রাইব্যুনালের জজ সৈয়দ সিরাজউদ্দীন হোসেন আইয়ুব আলী, মকবুল হোসেন ও যোবায়ের নামের তিন আলবদর সদস্যকে মৃত্যুদন্ড দেন। ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর আজিমপুরের দায়রা শরিফের বাসভবন থেকে ড. আজাদকে অপহরণ করে আলবদররা।

দালাল আইনে সবচেয়ে বেশি কারাদন্ড হয় কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ গ্রামের দালাল আবদুল হাফিজের। হত্যা, লুট ও দালালি মামলায় বিভিন্ন ধারায় তাঁকে আদালত ৪১ বছরের দন্ড দেন। যা ১৯৭৩ সালের ১২ এপ্রিল বাংলার বাণী পত্রিকায় এ সংবাদ প্রকাশিত হয়।

মামলার বিবরণে দেখা যায়, ’৭১-এর ১৫ অক্টোবর রাতে আবদুল হাফিজ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে নিজ গ্রামের ইয়াসিন মিয়ার বাড়িতে ঢুকে তাঁর ভাগ্নে শাহ আলমকে হত্যা এবং ইয়াসিন মিয়ার বাবাকে অপহরণ করেন। ইয়াসিন মিয়া বাড়ির পেছন দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরে দুই হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাঁর বাবাকে মুক্ত করেন তিনি।
১৯৭২ সালের জুলাই মাসে বগুড়ার ধুনট উপজেলার কালেরপাড়া ইউনিয়নের সরুগ্রামের আয়েজ মন্ডলের তিন ছেলেকে দন্ড দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে মফিজুর রহমান ওরফে চান মিয়াকে মৃত্যুদন্ড, মোখলেছুর রহমান ওরফে খোকা মিয়া ও মশিউর রহমান ওরফে লাল মিয়াকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। ধুনট উপজেলার নান্দিয়ারপাড়া গ্রামের নুরুল ইসলাম তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন। উচ্চ আদালত পরে চান মিয়াকে মৃত্যুদন্ডের বদলে ২০ বছর সাজা দেন। অপর দুই ভাইয়ের সাজাও কমিয়ে প্রত্যেককে ১০ বছর কারাদন্ড দেওয়া হয়। মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার চর শিলমন্দি (এখন পূর্ব শিলমন্দি) গ্রামের মাতবর কেরামত আলী কাজীর বিরুদ্ধে দুটি মামলায় মোট আট বছর কারাদন্ড হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি শান্তি কমিটিতে যোগ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে দড়ি চর শিলমন্দি গ্রামের সামসুদ্দিন মাস্টার ও সিরাজ নামের দুই মুক্তিযোদ্ধা মামলা করেন। উভয় মামলায় কেরামত আলীর সাজা হয়। কেরামত কাজী ১৯৯০ সালে মারা যান। নীলফামারীর সৈয়দপুরে রাজাকার ইজহার আহমেদের সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই এলাকায় অনেক হত্যাকান্ড ঘটে বলে অভিযোগ আছে। স্বাধীনতার পর শহীদ পরিবারের সদস্য প্রভু দয়াল আগারওয়াল ইজহারের বিরুদ্ধে তাঁর বাবা দানবীর শহীদ তুলসীরাম আগারওয়ালকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগে মামলা করেন।

১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল রংপুরের নিসবেতগঞ্জের বধ্যভুমিতে তুলসীরামকে হত্যা করা হয়। ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালের দৈনিক পত্রিকাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কয়েক দিন পরপরই তখনকার পত্রিকায় দালাল আইনে সাজা হওয়ার খবর প্রকাশিত হতো। দৈনিক বাংলার ৭ ডিসেম্বর ১৯৭৩ সংখ্যায় প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, ঢাকার বিশেষ আদালত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তিন সহযোগী ময়মনসিংহের মকবুল হোসেন, আইয়ুব আলী ও ঢাকার আতিয়ার রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন। ’৭১-এর ১৫ ডিসেম্বর অভিযুক্ত এই তিনজন ঢাকার আজিমপুর থেকে ধরে নিয়ে মন্টুকে হত্যা করেন। ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি আজাদ পত্রিকার খবরে বলা হয়, ডা. মালিকের মন্ত্রিসভার পূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেনকে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে যুদ্ধ পরিচালনায় সহায়তার জন্য যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে।

১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত এক সংবাদে দেখা যায়, ঢাকার বিশেষ আদালত পূর্ব পাকিস্তান বিবিসির সংবাদদাতা নিজামউদ্দীনের অপহরণের সঙ্গে জড়িত আলবদর সিদ্দিকুর রহমান ও মোহাম্মদ গালিবকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন। ১৯৭১-এর ১২ ডিসেম্বর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিজামউদ্দীনের ঢাকার তৎকালীন রোকনপুর হাউস থেকে অন্য আলবদরদের সহায়তায় অপহরণ করেন। ১৯৭৩ সালের ১২ জুলাই দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত এক সংবাদে দেখা যায়, রাজশাহীর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল শ্রী কান্তি দাস হাওলাদারকে হত্যার অভিপ্রায়ে অপহরণ করায় মুজিবুর রহমান নামে এক রাজাকারকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন। ১৯৭৩ সালের ১৪ এপ্রিল তৎকালীন পূর্বদেশ পত্রিকায় একটি খবর ছিল, পাক বাহিনীর সঙ্গে যোগসাজশ এবং তিন পল্লীবধুর শ্লীলতাহানির অভিযোগে মৌলভীবাজারের দীরুল আজীর আসিফ আলীকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। ১৯৭৩ সালের ২০ এপ্রিল দৈনিক সংবাদ-এর একটি খবরে দেখা যায়, কুমিল্লায় বিশেষ আদালত আবদুল হামিদ ও আজিজউল্লাহ্ নামের দুই দালালকে সশ্রম যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছেন। রফিক উদ্দিন নামের এক মুক্তিযোদ্ধাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে ধরিয়ে দেওয়ার অপরাধে তাঁদের সাজা দেন আদালত।

সাধারন ক্ষমার ঘোষণাঃ

১৯৭৩ সালের ৩০ নবেম্বর দালাল আইনে আটক যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীদের সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই তাদের জন্য ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণার পর দালাল আইনে আটক ৩৭ হাজারের অধিক ব্যক্তির ভেতর থেকে প্রায় ২৬ হাজার ছাড়া পায়। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ৫ নং ধারায় বলা হয়, ‘যারা বর্ণিত আদেশের নিচের বর্ণিত ধারাসমূহে শাস্তিযোগ্য অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত অথবা যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে অথবা যাদের বিরুদ্ধে নিম্নোক্ত ধারা মোতাবেক কোনটি অথবা সব ক’টি অভিযোগ থাকবে। ধারাগুলো হলো: ১২১ (বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো অথবা চালানোর চেষ্টা), ১২১ ক (বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর ষড়যন্ত্র), ১২৮ ক (রাষ্ট্রদ্রোহিতা), ৩০২ (হত্যা), ৩০৪ (হত্যার চেষ্টা), ৩৬৩ (অপহরণ),৩৬৪ (হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণ) ৩৬৫ (আটক রাখার উদ্দেশ্যে অপহরণ),৩৬৮ (অপহৃত ব্যক্তিকে গুম ও আটক রাখা), ৩৭৬ (ধর্ষণ), ৩৯২ (দস্যুবৃত্তি), ৩৯৪ (দস্যুবৃত্তিকালে আঘাত), ৩৯৫ (ডাকাতি), ৩৯৬ (খুনসহ ডাকাতি),৩৯৭ (হত্যা অথবা মারাত্মক আঘাতসহ দস্যুবৃত্তি অথবা ডাকাতি), ৪৩৫ (আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্যের সাহায্যে ক্ষতিসাধন),৪৩৬ (বাড়িঘর ধ্বংসের উদ্দেশ্যে আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার), ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৪৩৬ (আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্যের সাহায্যে কোন জলযানের ক্ষতিসাধন) অথবা এসব কাজে উৎসাহ দান। এসব অপরাধী কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য নন।’

সাধারন ক্ষমার ঘোষণা বাতিলঃ

সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পরও ১১ হাজারের বেশি ব্যক্তি এ সকল অপরাধের দায়ে কারাগারে আটক ছিল এবং তাদের বিচার কার্যক্রম চলতে ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিল করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৯৭৫ এর ৩১ ডিসেম্বর জেনারেল জিয়া সামরিক অধ্যাদেশ জারী করে দালাল আইন বাতিল করেন। থেমে যায় যুদ্ধাপরাধের বিচার কার্যক্রম। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।র রহমান সরকারের জারী করা আইনগুলো একের পর এক অধ্যাদেশ জারী মধ্য দিয়ে রহিত করা হয়। ১৯৭৬ সালে ‘Second proclamation order no. 2 of 1976’ জারী করে ধর্ম-ভিত্তিক রাজনীতি করার লক্ষ্যে সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাদি তুলে দেয়া হয়। ১৯৭৬ এর ১৮ জানুয়ারি নাগরিকত্ব ফিরে পাবার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে আবেদন করতে বলা হয় সবচেয়ে আলোচিত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমকে। এছাড়াও ‘proclamation order no. 1 of 1977’ দ্বারা সংবিধানের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ তুলে দেয়া হয়। মার্শল ল’র আওতায় এসব অধ্যাদেশ জারী করে জেনারেল জিয়ার সরকার। এসব অধ্যাদেশে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সাধারন ক্ষমা নিয়ে বিতর্কঃ

বঙ্গবন্ধুর সাধারন ক্ষমা ঘোষণার পর নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল , কে ক্ষমা পাবেন এবং কে পাবেন না । বঙ্গবন্ধু যুদ্ধোত্তর জাতিকে একতাবদ্ধ এবং পুনর্গঠনের তাগিদে এই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন । তিনি বুঝেছিলেন যুদ্ধের পর পরাজিত পক্ষকে নিধন বা নির্মূলের প্রক্রিয়া দীর্ঘ দিন চলতে পারে না । জনসাধারণ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াও বাঞ্ছনীয় ছিল না। তাই তিনি সমস্ত বিষয়টিকে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসার মানসে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে তিনি কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগের তালিকা প্রস্তুত করেছিলেন যে তালিকার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছিল কে কে সাধারণ ক্ষমা পাবেন না এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে সাজা ভোগ করবেন । এই অভিযোগ গুলির বাইরে যারা ছিলেন তারা সাধারণ ক্ষমার আওতায় পড়বেন ।
এখানে বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য সাধারণ ক্ষমার যে অংশটিতে যে সব অভিযোগের কারনে সাধারণ ক্ষমা পাবেন না তা নিচে উল্লেখ করা হলো:

• ”দণ্ডবিধির ৩০২ নং ধারা (হত্যা), ৩০৪ নং ধারা, ৩৭৬ ধারা (ধর্ষণ), ৪৩৫ ধারা (গুলি অথবা বিস্ফোরক ব্যবহার করে ক্ষতিসাধন), ৪৩৬ ধারা (ঘর জ্বালানো) ও ৪৪৮ ধারায় (নৌযানে আগুন বা বিস্ফোরণ) অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্তগণ এক নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লিখিত ক্ষমার আওতায় পড়বে না।

• এই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর দালাল আইনে আটক ৩০ হাজারের মত দালালকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল কিন্ত ৭৫২ জন যারা ইতিমধ্যে দালাল আইনে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন তারা সাধারণ ক্ষমার আওয়ায় পড়বেন না ।

• তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান যে, ”দালালি আইন অনুযায়ী মোট অভিযুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা হইতেছে ৩৭ হাজার ৪ শত ৭১ জন। ইহার মধ্যে চলতি বছর অক্টোবর মাস পর্যন্ত ২ হাজার ৮ শত ৪৮ জনের বিরুদ্ধে মামলার নিষ্পত্তি হইয়াছে। তন্মধ্যে ৭ শত ৫২ জনের সাজা হইয়াছে এবং বাকি ২ হাজার ৯৬ জন খালাস পাইয়াছেন।

• তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে, আটককৃত বা সাজাপ্রাপ্ত অনেক প্রাক্তন নেতা এই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আওতায় মুক্তি লাভ করবেন। তিনি আরো বলেন যে, যাবজ্জীবন কারাপ্রাপ্ত সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্তন গভর্ণর ডাঃ এ এম মালেক ও তাহার মন্ত্রীসভার সদস্যবৃন্দ শীঘ্রই মুক্তিলাভ করবেন। অন্যদের মধ্যে আর যারা মুক্তি পাবেন তাহাদের মধ্যে ডঃ কাজী দীন মোহাম্মদ, ডঃ হাসান জামান, ডঃ সাজ্জাদ হোসেন, ডঃ মোহর আলী (প্রত্যেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দালাল শিক্ষক) ও খান আবদুর সবুরও রয়েছেন। মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তাহাদের সম্পত্তি ফেরত পাবেন এবং দেশের নাগরিকদের প্রদত্ত সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করবেন।’

• এখানে সাধারণ ক্ষমার বিষয়টি উল্লেখ করার কারন হচ্ছে, সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর বিষয়টি সেই সময়েই মীমাংসিত হয়ে গিয়েছিল । ১৯৭৩ সালের সাধারণ ক্ষমার আওতায় যারা যারা পাকিস্তানের দালালী এবং ক্ষেত্র বিশেষে দেশের বিরুদ্ধে যারা কাজ করেছিলেন তাদের বন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল । এই সাধারণ ক্ষমার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে কিন্ত বিষয়টিকে মীমাংসিত বিষয় বলেই গণ্য করতে হবে।
• বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব রাজাকার, আলবদর, আলশামস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যদের সহায়তা করেছে তাদের বিচারের জন্য ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি এই আইনটি প্রণয়ন করা হয় এবং ১৯৭৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই আইনের আওতায় ২,৮৮৪টি মামলা দায়ের হয়েছিল। এসব মামলায় সাজা দেওয়া হয় ৭৫২ জনকে। এদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর দালাল আইন বাতিল করার পর থেকে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের কারাগার থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

দালাল আইন, ১৯৭২ বলতে দ্যা বাংলাদেশ কোলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল) অর্ডার, ১৯৭২:

১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির ঘোষণা দ্বারা আইনটির প্রয়োগ শুরু হয়। ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি আইনটির আদেশ জারি হলেও পরবর্তীকালে একই বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি, ১ জুন এবং ২৯ আগস্ট তারিখে তিন দফা সংশোধনীর মাধ্যমে আইনটি চূড়ান্ত হয়। পরবর্তীতে দালাল আইনের অধীনে ৩৭ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বিভিন্ন আদালতে তাদের বিচার আরম্ভ হয়। এর পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে কর্মরতদের কেউ দালালি এবং যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না তা যাচাই করার জন্য ১৯৭২ সালের ১৩ জুন একটি আদেশ জারি করে যা তখন গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। দালাল আইন, ১৯৭২ বলতে দ্যা বাংলাদেশ কোলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল) অর্ডার, ১৯৭২ (ইংরেজি: “The Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) Order, 1972”)-কে বুঝনো হয়।কখনো কখনো এটিকে রাষ্ট্রপতির আদেশ ১৯৭২ সালের ৮ নং (ইংরেজি: PRESIDENT’S ORDER NO. 8 OF 1972) হিসাবেও পরিচিত উল্লেখ করা হয়।

এড. খন্দকার মাহবুব হোসেন: যুদ্ধ অপরাধীদের বিচারের দাবীতে শাহবাগ আন্দোলোন যারা করছেন তাদেরও আবেগের সাথে আমিও একমত। যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার আমিও চাই। তবে সরাসরি ফাঁসির দাবী করাটা বিচার বিভাগের প্রতি অবজ্ঞা করা। কারণ শ্লোগানের ভিত্তিতে যদি রায় হয়, তাহলে আ্ইনের শাসন বলে কিছু থাকে না। এ অবস্থায় আগামীতে কাউকে ফাঁসি দেয়া হলে, মনে করা স্বাভাবিক হবে যে, শ্লোগানের ভিত্তিতে রায় হয়েছে। তাই উচিত বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা রেখে আবেগ প্রকাশ বা আন্দোলোন বা শ্লোগানের দেওয়া। ১৯৭১ সনে মুক্তিযুদ্ধের পর আর্ন্তজাতিক যুদ্ধ অপরাধ আইনের অধীনে চিহ্নিত ১৯৫ জন পাকিস্থানি সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে বিচারের উদ্যেগ নেওয়া হয়। তখনকার প্রেক্ষাপটে আওয়ামীলীগ সরকার তাদের মাফ করে দিয়েছিলেন। পাক সেনাদের সহযোগীতার অপরাধে বিচারের জন্য আরেকটি আইনদালাল আইন, ১৯৭২ । এ আইনে বিচারিক কার্যত্রম শুরু হলে বিচার কালে এমন ও ঘটনা সামনে এসেছে যে, সন্তান মুক্তিযোদ্ধা পিতা পিস কমিটির চেয়ারম্যান। সে সময় জাতি কে ঐক্যবদ্ধ রাখতেজাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৪ টি গুরুতর অপরাধ ১)খুন, ২)ধর্ষন, ৩) অগ্নি সংযোগ এবং ৪) রাষ্ট্রদ্রোহ এর ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রেখে বাকি সকল অপরাধ মাফ করে ছিলেন।(ফেব্রুয়ারী ২০, ২০১৩, পৃনং:১, বাংলাদেশ প্রতিদিন)

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছিলেন,“সারা দেশ রাজাকারের ফাঁসি চায়। সারা দেশ যখন রাজাকার নামে মাতোয়ারা তখন একজন যুদ্ধাপরাধী রাজাকারকে রাজাকার বলায উকিল নোটিস পেতে হয়। জনাব মহীউদ্দীন খান আলমগীর কতবড় পণ্ডিত, কি তার বংশ-পরিচয়, এসবে আমার দরকার নেই। আমার দরকার তিনি সিএসপি পরীক্ষা দিযছেন পাকিস্তান সুপিরিযর সার্ভিসে যোগ দিয়েছলেন। সুনামের সঙ্গে পাকিস্তানে চাকরি করেছেন। অনেক তকমা বা প্রশংসা পেয়েছেন। ২৬ মার্চ আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু করি তখনো তিনি পাকিস্তানি কর্মচারী ছিলেন।”(বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী এর ফেসবুক থেকে)

ড. কামাল হোসেন : শাহবাগ আন্দোলোনের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ এর মতো জাতীয় ঐক্যের অনিবার্যতা প্রকাশ পেয়েছে। ক্ষমতার প্রশ্নে অনেকেই বিক্রি হয়েছে, যা আমাদের রাজনীতিকে কলুসিত করেছে কিন্তু শাহবাগ আন্দোলনে তরূণ সমাজ যে আবেদন সৃষ্টি করেছে তা আমাদের জাতীয় ঐক্য মহান সৌধ নির্মাণ করবে। ঐক্য কোন রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়, এটা পুরো জাতীর জন্য প্রয়োজন। এছাড়া সম্প্রতি ব্যক্তির পাশাপাশি যুদ্ধ অপরাধের অপরাধে দলের ও বিচার করা যাবে সর্ম্পকে তিনি বলেন,১৯৪৫ সনের পর তিন বছরের মধ্যে যদি আবার নাৎসিরা ক্ষমতায় আসতো তাহলে ন্যুরেমবার্গ ট্রাইবুনাল চালাতে জটিলতা পোহাতে হতো। যা আমাদেরও পোহাতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালে তারা ক্ষমতায় এসে দালাল আইন, ১৯৭২ বা দ্যা বাংলাদেশ কোলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল) অর্ডারবাতিল করেছে। একই অপরাধে কারো লঘু শাস্তি হয়েছে । এইখানে তরূণ প্রজন্মেরও আপত্তি, আমাদের ও আপত্তি।(ফেব্রুয়ারী ২১, ২০১৩, পৃনং:২, বাংলাদেশ প্রতিদিন)

কিন্তু কেন এই দালাল আইন, ১৯৭২ কেন প্রণীত হয়েছিল সেটা জানতে আমাদের এর পটভূমি জানা দরকার। পটভূমি জানা না হলে আইনটির প্রকৃত উদ্দেশ্য জানায় পাঠকের বোঝায় ভ্রান্তি ঘটবে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির সূ্ত্রপাতঃ

১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ শহীদদের পরিবারবর্গের পক্ষ থেকে পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ঢাকার রাজপথে মিছিল বের হয়। মিছিলে পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করা হয়।১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু জাতির উদ্দেশে দেয়া বেতার ও টিভি ভাষণে পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গটি আবার সামনে নিয়ে আসেন। পাক প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানে আটকে পড়া পাঁচলাখ বাঙ্গালীকে ফেরত দেয়ার বিষয়টি পাক যুদ্ধবন্ধীদের মুক্তির সঙ্গে শর্তযুক্ত করায় শেখ মুজিবুর রহমান এ ভাষণে বলেন, তাদেরকে (পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙ্গালী) ফিরিয়ে দেয়া হোক। এ ইস্যুকে কোনোক্রমে যুদ্ধবন্দীদের সমপর্যায়ে ভাবা চলবে না। কারণ তাদের (পাক যুদ্ধবন্ধীদের) মধ্যে এমন অনেক আছেন যারা শতাব্দীর নৃশংসতম হত্যার অপরাধে অপরাধী। তারা মানবিকতাকে লঙ্ঘন করেছে এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার ভিত্তিতে বিচার হবে। ১৯৭২ সালের ১৬ মে বঙ্গবন্ধু সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশে পাক হানাদার বাহিনীর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্দেশ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্ডিন্যান্স প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে কলাবরেটের আইনের অধীনে কলাবরেটর-দালালদের বিচারের কাজ শুরু হয়ে গেছে।

১৯৭২ সালের ২ জুলাই কুষ্টিয়ার এক জনসভায় তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পুনরায় জোর দিয়ে বলেন পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।১৯৭২ সালের ২৯ আগস্ট আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে বলেন, সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের সম্পর্কিত তদন্তের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা প্রকাশ করা হবে। এরপর ১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল প্রকাশিত বাংলাদেশ সরকারের এক প্রেস রিলিজে বলা হয়, তদন্তের মাধ্যমে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর মধ্য থেকে ১৯৫ জনকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, জেনেভা কনভেনশনের আর্টিকেল তিন এর লংঘন, হত্যা, ধর্ষণ, লুটের অপরাধে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।

১৯৭৩ সালের ১ জুনের এক খবরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে বলা হয়, টোকিও ও নুরেমবার্গ বিচারের সময় যে মূল নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে একটি বিল পেশ করা হবে। ১৯৭৩ সালের ৮ জুন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এক সাক্ষাৎকারে জানান, ইতিপূর্বে তালিকাভুক্ত পাক যুদ্ধাপরাধীদের সংখ্যা ১২০০ থেকে কমে ১৯৫ জন হয়েছে। এই ১৯৫ জন পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই।

জাতীয় প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার যুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনালস) আদেশ’ জারি করা হয়। দালাল আইনের অধীনে ৩৭ হাজারেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে বিভিন্ন আদালতে তাদের বিচার শুরু করা হয়। এরপর পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের সহযোগীদের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’ পাস করা হয়। ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিল করা হলে ঐ আইনের অধীনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
সকল বিতর্কের আবসান শেষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান এর প্রথম সংশোধনী বিল পাশ হয়।

সংবিধানের সংশোধনীর বিল পাশ বিবরণঃ

আইনের শিরোনামঃ সংবিধান (প্রথম সংশোধনী) আইন ১৯৭৩,
সংশোধনীর বিষয়বস্তুঃযুদ্ধাপরাধীসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী আপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা,
উত্থাপনকারীঃআইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন,
উত্থাপনের তারিখঃ১২ই জুলাই, ১৯৭৩,
পাসের তারিখ:১৫ই জুলাই ১৯৭৩,
রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের তারিখঃ১৭ই জুলাই ১৯৭৩,
পক্ষে-বিপক্ষে ভোটঃ২৫৪-০ (বিরত ৩ জন),
মন্তব্যঃ***,
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি / প্রধানমন্ত্রীঃ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তথাকথিত রাজনীতিবীদেরা প্রজন্ম চত্বরে ফন্দি ফিকির করে প্রতারণার আশ্রয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ফায়দা লুটার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে প্রচেষ্টা করেছে বহুবার। অর্স্তজাতিক যুদ্ধ অপরাধী ট্রাইবুনাল এর প্রসিকিউশন পক্ষের যোগ্যতা আমাদের সন্দেহেরসৃষ্টি করে, তাদের দক্ষতা, এভিডেন্স একজিবিট করা, চান্স উইটনেস, ডকুমেন্টারী এভিডেন্স সহ জেরা-জবান বন্দি গ্রহন সহ প্রভুত প্রামান্য বিষয় এর প্রায়োগিক পদ্ধতির উপস্থাপনা এবং সর্বপরি রাজাকার কাদের মোল্লার রায় প্রসিকিউশন পরে দক্ষতা-যোগ্যতার প্রমাণ দেয়। যেহেতু আমাদের প্রজস্ম স¦চ্ছতা, নিরপেক্ষতা আর ন্যায় বিচার এর স্বার্থে এ গণজাগরণ, রাজাকারদের শাস্তি চায়, তাই আমরা জানতে চাই প্রসিকিউশন পক্ষ কাদের মোল্লার আরগুমেন্ট এ কি বক্তব্য,তথ্য-প্রমান উপস্থাপন করেছিলেন অর্স্তজাতিক যুদ্ধ অপরাধ ট্রাইবুনাল এর বিচার প্রত্রিয়ায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার সর্বচ্চো প্রচেষ্টা করছেন; তাই অর্স্তজাতিক যুদ্ধ অপরাধী ট্রাইবুনাল এর বিচার প্রত্রিয়া সরাসরি সমপ্রচার করা যায় কিনা বিষয়ে আইনবিশারদ এর পরামর্শত্রমে ভেবে দেখতে পারেন। এর ফলে সারা বিশ্ব বিচার প্রত্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে আর কোন উদ্বেগ প্রকাশ করবেন না। পাশাপাশি ডিজিটাল বাংলাদেশ আরও একধাপ এগিয়েযাবে। আপনার প্রচেষ্টা সফল হবে।

তৎকালনি সময়ে এবিষয়ে অনেকই বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টকশোতে আইনবিশারদ অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ৩৩৪টি খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ হওয়ার পরও কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদন্ড নানান প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে জাময়াতের সাথে আপস বা গোপন আঁতাতের। কাদের মোল্লার রায় নিয়ে আওয়ামী লীগ এর প্রতি মানুষ সন্দেহের তীর ছুড়েছে। আওয়ামী লীগ অতীতে এই জাময়াতের সাথে সমঝোতা করে বিএনপির বিরূদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এর দাবীতে আন্দোলন করেছে। একই সমীকরণ আবার করবে না তার নিশ্চয়তা কি? তিনি বি এন পির সর্ম্পেকে বলেন যে, যুদ্ধ অপরাধী নিয়ে তাদেরও কোন সম্বনিত পদক্ষেপ নেই, তাদের একটা আবস্থান নিতে হবে। ট্রাইবুনাল সর্ম্পেকে সুস্পষ্ট মতামত থাকতে হবে। (ফেব্রুয়ারী ৯, ২০১৩, পৃনং:৩, বাংলাদেশ প্রতিদিন)

বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মোজিনা বলেন, দাবী অদায়ের জন্য আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ন ভাবে মতমত প্রকাশ করছেন, আমি বিশ্বাস করি যারা যুদ্ধ অপরাধে সহায়তা করেছে তাদেরকেও বিচারের আওতায় আনতে হবে, তবে এ বিচার হবে রাজনৈতিক ও নাগরিক আধিকার সর্ম্পকিত আর্ন্তজাতিক আইনের সাথে সা¤œজস্যপূর্ণ এবং স্বচ্ছ। (ফেব্রুয়ারী ১৩, ২০১৩, পৃনং:১, বাংলাদেশ প্রতিদিন)

পৃথীবির ইতিহাসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে গণ-আন্দোলনঃ

যুদ্ধাপরাধ হচ্ছে কোন যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাত চলাকালীন সময়ে কোন ব্যক্তি কর্তৃক বেসরকারী জনগনের বিরুদ্ধে সংগঠিত, সমর্থিত নির্দিষ্ট সংজ্ঞায়িত অপরাধ কর্মকান্ডসমূহ। আন্তর্জাতিক মানবাধিক আইন অনুসারে যুদ্ধ কালিন সংঘাতের সময় বেসরকারী জনগনকে খুন, লুন্ঠন, ধর্ষণ, কারাগারে অন্তরীন ব্যক্তিকে হত্যা, নগর, বন্দর, হাসপাতাল কোন ধরনের সামরিক উস্কানি ছাড়াই ধ্বংস প্রভৃতি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৮৯৯ ও ১৯০৭ সালের হেগ কনভেনশন সর্বপ্রথম যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত আইন সমূহ লিপিবদ্ধ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সংগঠিত হওয়া নূরেমবার্গের হত্যাকান্ড ও অপরাধ বিচার সবচেয়ে আলোচিত যুদ্ধাপরাধ বিচার। আধুনিক যুদ্ধাপরাধের সংজ্ঞা প্রদানের ক্ষেত্রে ১৯৪৫ সালের লন্ডন ঘোষণাকে আদর্শ হিসেবে ধরা হয়।

পৃথীবির ইতিহাসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে উত্তাল গণ-আন্দোলন ও বিচার সেই রোমান যুগ হতে শুরু হয়েছে,১৪৭৪ সালে হলি রোমান সাম্রাজ্যে জার্মান ও আলসেইক সেনাবাহিনীর কমান্ডার পিটার ভন হ্যাজেনব্যাকএর যুদ্ধাপরাধ বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠিত হয়। এই ট্রাইবুনালকে আন্তর্জাতিক ভাবে প্রথম যুদ্ধাপরাধের বিচারের স্বীকৃতি দেয়া হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের জন্য ১৯২১ সালে কতিপয় জার্মান সামরিক বাহিনীর কমান্ডারকে জার্মান সুপ্রীম কোর্টে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। যে বিচার কে আমরা,“লিপজিগ যুদ্ধাপরাধ বিচার” নামে জানি।এরপর ১৯৪৫ সালের ৮ অগাষ্ট প্রকাশিত লন্ডন ঘোষণাতে নূরেমবার্গের গনহত্যার বিচার সংক্রান্ত ধারাতে যুদ্ধাপরাধ সর্ম্পকে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়। নূরেমবার্গের বিচার কয়েকটি সামরিক ট্রাইবুন্যালের সমন্বয়ে ১৯৪৫-১৯৪৬ সালে সংগঠিত হয়। এই বিচার জার্মানির বেভারিয়াতে নূরেমবার্গের বিশেষ আদালতে করা হয়। ২৪জন গ্রেফতার হওয়া নাৎসি জার্মানের নেতার বিরুদ্দে অভিযোগপত্র গঠন করা হয়। ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত কয়েকটি ধাপে নূরেমবার্গ আন্তর্জাতিক আদালতে নাৎসী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হয়। যাদেরকে আদালতে হাজির করা হয় তাদের শাস্তি দেয়া সম্ভব হলেও পলাতকদের গ্রেফতারের পর বিচারের রায় কার্যকর হয়। যে বিচারটি,“লন্ডন ঘোষণা/ নূরেমবার্গ ট্রায়াল” হিসাবে বিখ্যাত।

হিটলারের শাসনামলের নাজি জার্মানির প্রধান রাজনীতিবিদ, সমর নায়ক, বিচারক এবং অর্থনৈতিক নেতাদের বিপক্ষে মামলা ও তাদের বিচারের জন্য এই আদালতগুলো বিখ্যাত ও স্মরণীয় হয়ে আছে। এরপর রুয়ান্ডা, উগান্ডা, লাইবেরিয়া, যুগোস্লাভিয়াসহ পৃথিবীর অনেক দেশে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধগুলো বিচারকাজ হয়েছে, হচ্ছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একমাত্র বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়া ছাড়া অন্য দেশে কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটলেও অপরাধগুলোর বিচার করা যায়নি বা হয়নি। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল চার বছর পর্যন্ত কম্বোডিয়ায় খেমাররুজদের শাসনামলে অন্তত ১৭ লাখ নাগরিক গণহত্যার শিকার হয়েছেন। অসংখ্য মানুষ ক্রীতদাসের জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের এহেন অন্যায় কর্মে পরিণত করা, নারী ও শিশুদের নির্যাতনের মতোও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেন খেমাররুজ গেরিলা বাহিনী। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগে ২০০৬ সালে যৌথ বিচারিক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এসব মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু করেন কম্বোডিয়া। শীর্ষ কয়েকজন অপরাধীর বিচারের রায়ে সাজা হয়। বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের সহযোগিতা নিতে হয়েছে কম্বোডিয়দের। বিচারের মান নিয়ে ছিল প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একক প্রচেষ্টায় উদ্যোগ নিতে পেরেছে।

শ্রীলঙ্কায় তামিলদের বিরুদ্ধে সে দেশের সরকারের পদক্ষেপ নিয়েও নানা আলোচনা আন্তর্জাতিক মহলে হয়েছিল। সেই দেশে সংখ্যালঘু ও যুদ্ধবাজ তামিলদের ওপর গণহত্যার মতো আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। জাতিসংঘ থেকে এ অভিযোগে বিচারের চাপ ছিল দেশটির সরকারের ওপর। যদিও বিষয়টি সামনে আর আসেনি। এখন মিয়ানমারে সে দেশের সরকারি ক্ষমতায় থাকা সেনাবহিনীর বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর অভিযোগে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা চলছে। যদিও মিয়ানমার সরকার গণহত্যা ও ধর্ষণের অন্যায় অপরাধ সুকৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছে। হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে তাদের রোহিঙ্গা গণহত্যায় গাম্বিয়ার করা মামলার শুনানি হলেও সেখানে গণহত্যা, ধর্ষণের বিচার নয়, বিচার হচ্ছে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা হয়েছে কি না, সে অভিযোগ নিষ্পত্তিতে। রুয়ান্ডায় সংখ্যালঘু হুতু জনগোষ্ঠীর ওপর টুটসি সম্প্রদায়ের চালানো গণহত্যার বিচারের জন্য ‘গাসাসা ট্রাইব্যুনালস (সামাজিক আদালত)’ গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে বিচারের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মামলার পরিচালনায় সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও জনবলের ঘাটতি ছিল। আন্তর্জাতিক আদালতে স্বীকৃত এ ধরনের বিচার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ওই দেশগুলোর মতো যুক্ত হয়েছে।

১৯৭২ হতে ২০১৩ সময় পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনের
পর্যায়ক্রমিক ইতিহাস তুলে ধরা হলোঃ

একটি দেশ বা জাতির ভেতর ‘মত ও পথ’এর বৈষম্য/বিভক্ত থাকতে পারে, থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার জাতিসত্তার অস্তিত্বের লড়াইয়ে তাকে যদি অন্যায়ভাবে লুণ্ঠন, নিপীড়ন, নির্যাতন, শোষন, ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়, তবে সেই অপরাধের বিচারের দাবিতে জাতি কখনও বিভক্ত থাকত পারে না। আর যদি থাকে, তবে তা হবে ঐ জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধই বাংলাদেশের একজন নাগরিকের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে বাংলার মুক্তিযুদ্ধারা, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ পরিবার পরিজন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সাধারন জনগণ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যারা মাতৃভূমির সাথে গাদ্দারী করেছিল, সরাসরি পাক-হানাদার জানোয়ারদের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়ে আমাদের ত্রিশলক্ষ মুক্তিকামী বাঙালী হত্যা, মা-বোনদের ধর্ষন, লুটতোরাজ করেছিল সেই সব বেজন্মা, কুলাঙ্গার, রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামধারী পাক-দালালদের এই মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে সেই ১৯৭২-২০১৩ অর্থাৎ ৪১ বছর ধরে আন্দোলন চালিয়ে গিয়ে ছিলেন। ১৯৭৯ সালে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৮৮ ডা. এম এ হাসানের নেতৃত্বে শহীদ লেফটেন্যান্ট সেলিম মঞ্চ হতে আন্দোলন শুরু হয়।

জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হবার পর ১৯৮১ সালে জামায়াতে ইসলামীর নেতা গোলাম আজম পাকিস্তানী পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। এরপর তার নানা ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। শেষ পর্যন্ত খোলস ছাড়িয়ে ১৯৯১ সালে গোলাম আজমকে জামায়াতে ইসলামীর আমীর নির্বাচন করা হয়। গোলাম আজমের রাজনীতিতে ফিরে আসার প্রতিবাদ জানাতেই গড়ে উঠেছিল তখনএকাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নাম ছড়িয়ে পরে তাঁর সামাজিক-রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য। অতীতে তিনি রাজনীতিসচেতন হলেও রাজনীতিবিদ ছিলেন না, এবার ভবিতব্যই তাঁকে রাজনীতির অঙ্গনে নিয়ে আসে। একাত্তরে তাঁর প্রথম পুত্র রুমী ছাত্রত্ব ত্যাগ করে দেশের মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন এবং কয়েকটি সফল গেরিলা অপারেশনের পর পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে নিহত হন। বিজয় লাভের পর রুমীর বন্ধুরা রুমীর মা জাহানারা ইমামকে সকল মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে বরণ করে নেন। তখন থেকেই তিনি ‘শহীদ জননী’র মর্যাদায় ভূষিত হন।

মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য জাহানারা ইমাম নিজেও সর্বদা সক্রিয় ছিলেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জীবনে স্বাধীনতাবিরোধী ধর্মান্ধ ঘাতক-দালালদের পর্যায়ক্রমিক পুনর্বাসনে অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বক্তৃতা করে এবং লিখে জনসচেতনতা গড়ে তোলেন। তিনি বুদ্ধিজীবীদের পরিচালিত ‘সাম্প্রদায়িকতা ও ফ্যাসিবাদবিরোধী নাগরিক কমিটি’, ‘স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটি’ ইত্যাদি উদ্যোগের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। কিন্তু অচিরেই তিনি উপলব্ধি করেন যে, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের একত্র করতে না পারলে বিরোধী দুষ্ট চক্রকে প্রতিরোধ করা যাবে না। এ সময় তিনি অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেন। তিনি ছিলেন মূলত সংস্কৃতি অঙ্গনের লোক, কিন্তু এ সময় থেকে তিনি রাজনীতির অঙ্গনেও সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি ১৯৯২ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’র আহবায়ক হন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, রাজনৈতিক দল ও কর্মিবৃন্দ, দেশপ্রেমিক তরুণ সমাজ এবং প্রজন্ম ’৭১ তাঁর আহবানে এগিয়ে আসেন। তাঁদের সক্রিয় সমর্থনে জাহানারা ইমাম ১৯৭১-এর স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের বিরুদ্ধে গণ-আদালত গড়ে তোলেন।

তখনই দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতি শুরুর দিকে শহরাঞ্চলের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের ব্যাপক সমর্থন ছিল।

১৯৯১ সালের ২৯শে ডিসেম্বর গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের আমীর ঘোষণা করলে বাংলাদেশে জনবিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। বিক্ষোভের অংশ হিসাবে ১৯৯২ সালের ১৯শে জানুয়ারি ১০১ জন সদস্য বিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয় শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। তিনি হন এর আহ্বায়ক। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১১ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৯২ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়। সর্বসম্মতিক্রমে এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম। এই কমিটি ১৯৯২ সালে ২৬শে মার্চ ’গণআদালত’ এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করে। গণআদালাতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদন্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন।১৯৯৪ সালে এক প্রতীকী বিচারের মাধ্যমে গোলাম আজমের ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। যেটিকে তারা ‘গণ আদালত’ বলে বর্ণনা করেন।

২০০৬ এ আন্দোলনের ডাক দেন সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম।

২০০৭ – এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জরুরী অবস্থার হুমকির মধ্যেও সরকারি বাঙলা কলেজ -এর শিক্ষার্থীবৃন্দ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ও বাঙলা কলেজ বধ্যভূমিতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের দাবিতে আন্দোলনের সূচনা করে এবং পর্যায়ক্রমে মানববন্ধন, প্রতীকী অনশন, সমাবেশ, পথসভা, মিছিল, নিরবতা পালন, প্রতীকী বেদীতে পুষ্প অর্পণ ইত্যাদি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচী পালন করে। সাধারন ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্যোগে, নেতৃত্বে ও সমন্বয়ে শুরু হওয়া চলমান এই আন্দোলনে কলেজের জাতীয় অঙ্গনের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সংগঠন সুদৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করে। ২০০৭ হতে ২০১০ পর্যন্ত রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালনের পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রিরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ডিজিটাল আন্দোলন সবসময়ই অব্যাহত রাখেন।এরই ধারাবাহিকতায় সূত্রপাত ঘটে ২০১৩-র শাহবাগ আন্দোলন।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতারা বলছেন তাদের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম এবং গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও হয়েছে। এটি স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অহিংস গণ-আন্দোলন। সারাদেশব্যাপী ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবসহ সকল পেশাজীবি, শ্রমজীবি, সম্মিলিত সংস্কৃতিক জোট, সুশীল সমাজ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল গণ-মানুষেরদল।তারাই ইমরান এইচ সরকারকে মুখপাত্র বানিয়েছিল হিসেবে জানি, কিন্তু সে কাদের মুখপাত্র সেই তালিকা কি সুনির্দিষ্ট করে জানি? এমনকি শিবিরের মতো একটি সন্ত্রাসী সংগঠনও কিন্তু তাদের ওয়েবসাইটে লিখে রেখেছে তাদের বিভিন্ন কমিটির সদস্যদের নাম। এই ন্যূনতম স্বচ্ছতাও গণজাগরণ মঞ্চকে রাখতে দেওয়া হয়নি। কারণ, আমার অনুমান হল, বামপন্থী সংগঠনগুলো জানে, যখনই সাধারণ অরাজনৈতিক সদস্যরা দেখবে গণজাগরণ মঞ্চে কোনো কোনো বামপন্থী সংগঠন আনুষ্ঠানিকভাবে আছে, তখনই তারা যে পুরোপুরি জনবিচ্ছিন্ন কেবল শাহবাগ মোড়কেন্দ্রিক একটি বুদবুদের ভিতর ঢুকে আছে, সেই বুদবুদটি ফেটে যাবে।

আমরা জানি, মৃত ঘোড়া রেসে জিতে না। বাম রাজনীতি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মৃত ঘোড়া। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রে, কম্যুনিজমে নয়। এ কারণে যতদিন পারা যায় বাম সংগঠনগুলো ইমরানের আড়ালে লুকিয়ে আছে। আমার খুব কষ্ট হয় যখন মানুষ গণজাগরণ মঞ্চের ব্যাপারে কখনও হতাশা প্রকাশ করতে হলে ইমরানকে ‘পাঞ্চিং ব্যাগ’ হিসেবে ব্যবহার করে। আমাদের এই প্রশ্ন করতে হবে, ইমরান যাদের মুখপাত্র তারা কারা, তারা কী করে?

গণজাগরণ মঞ্চের প্রোপাগাণ্ডা কর্মসূচিতে তাই আমরা টিপিক্যাল সিপিবি সিগনেচারটি দেখতে পাই– সেটি কখনও ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ বা কখনও একতরফা অভিযোগ। সাংগঠনিক কর্মসূচির কথা চিন্তা করলে গণজাগরণ মঞ্চের মধ্যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা গণতন্ত্র এখনও সুসংহত নয়।

২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার শাহবাগে ফেব্রুয়ারির ৫ই তারিখ শুরু হয়।সমাবেশে বিক্ষোভ ও আন্দোলনের উপায় হিসেবে আন্দোলনকারীরা বেছে নিয়েছেন স্লোগান, গান, কবিতা, নাটক ইত্যাদি। পোড়ানো হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের কুশপুত্তলিকা। আন্দোলনকারীদের দাবীগুলো ছিল- কাদের মোল্লাকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে সর্ব্বোচ্চ শাস্তি প্রদান, যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত সকলকে সর্ব্বোচ্চ শাস্তি প্রদান, জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান বয়কট করা।

শাহবাগ থেকে টিএসসি-র মোড় পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশের দেয়ালে চারুকলার শিক্ষার্থীরা ছবি এঁকে জনতার সাথে সংহতি প্রকাশ করে এবং যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসী কামনা করে। তারা বন্দি যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আব্দুল কাদের মোল্লা সহ অনেকের ব্যঙ্গচিত্র আঁকেন। তিরন্দাজ নামের একটি নাটকের ঐতিহাসিক নামক একটি নাটক মঞ্চস্থ করেন।এই দিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত আসামী আব্দুল কাদের মোল্লার বিচারের রায় ঘোষণা করে। কবি মেহেরুন্নেসাকে হত্যা, আলুব্দি গ্রামে ৩৪৪ জন মানুষ হত্যা সহ মোট ৬টি অপরাধের ৫টি প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। কিন্তু এতোগুলো হত্যা, ধর্ষণ, সর্বোপরী গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ মেনে নিতে পারেনি। রায়ের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢাকার শাহবাগে জড়ো হতে শুরু করে এবং এর অনুসরণে একসময় দেশটির অনেক স্থানেই সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু হয় ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা বিরোধীদের স্বরুপ উন্মোচনের জন্য একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির বড় ভূমিকা রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনা যদি পাশে না দাঁড়াতেন, তহালে গণ-আন্দোলন বা গণ-বিচার করা সম্ভব হতো না।

১৯৯২ সালে ২৬শে মার্চ ’গণআদালত’ ছিল স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের অপকর্মের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী প্রতিবাদ। কিন্তু তৎকালীন সরকার জাহানারা ইমামসহ গণ-আদালতের সঙ্গে যুক্ত ২৪জন বরেণ্য বুদ্ধিজীবীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করে এবং জাহানারা ইমাম মৃত্যুকালেও এ অভিযোগ থেকে মুক্তি পাননি।

আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি দাবি করে সারা বাংলাদেশে আন্দোলন শুরু হয়। তার বিরুদ্ধে আনা ছয়টি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি অভিযোগ প্রমাণিত হলেও শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়। এর বিরুদ্ধে ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা শাহবাগে এই আন্দোলন শুরু করলেও খুব দ্রুতই এই আন্দোলন সর্বস্তরের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং এই আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ, সাংসদ, মন্ত্রী ও তারকারাও সংহতি প্রকাশ করে। পরে এটি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নোয়াখালী, কুমিল্লা, রংপুর প্রভৃতি শহরে ছড়িয়ে পরে।

আওয়ামী লীগ এই রায়ে অসন্তুষ্ট হয়। তাদের নেতারা শাহবাগে আন্দোলনকারীদের সাথে সংহতি প্রকাশ করেন। জামাত-শিবির বাদে প্রায় সব রাজনৈতিক দল সংহতি প্রকাশ করলেও বিএনপি এ নিয়ে প্রথম দিকে কোনো মন্তব্য করে নি। তবে আন্দোলনের অষ্টম দিন, ১২ ফেব্রুয়ারিতে এসে বিএনপি শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে অবস্থানকারী তরুন সমাজকে স্বাগতম জানায়। সাথে সাথে বিএনপি এই আন্দোলন দলীয়করণের আশঙ্কাও করে।

বাংলাদেশের আন্দোলনকারীদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডায় ও অস্ট্রেলিয়াতেও আন্দোলন সংগঠিত হতে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রী এবং প্রবাসীরা এই আন্দোনলের সাথে একাত্ততা জানায়। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীগণ “শাহবাগ চত্বর” এর আদলে একত্রিত হয়।

‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল(আইসিটি)স্থাপনঃ

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। ২৫শে মার্চ রাতে ও ২৬শে মার্চ ভোর রাত জুড়ে পাকিস্তানী বাহিনী বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের উপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। ২৬শে মার্চ বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ শুরু করে। প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের রক্ত এবং প্রচুর নারীর ধর্ষণের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ যুদ্ধে জয়লাভ করে। তবে বাংলাদেশেরই কিছু মানুষ স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানী বাহিনীকে বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে সক্রিয়ভাবে সহায়তা প্রদান করেছিল, যার মধ্যে ছিল গণহত্যা, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন,লুটপাট ইত্যাদি। যুদ্ধকালীন সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে একটি আইন তৈরি করা হয় যা ২০০৯ সালে কিছুটা সংশোধন করা হয়। এ আইনের আওতায় ২০১০ সালের ২৫শে মার্চ এ সকল অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। ২০১৩ সালের ২১শে জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ে আবুল কালাম আযাদ (বাচ্চু রাজাকার)-কে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

বিক্ষোভকারীরা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের জন্য সরকারের উপর চাপ দিতে থাকে যাতে যুদ্ধ অপরাধীরা “দোষী সাব্যস্ত হলে দ্রুত মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা যায়”। এরপর এই কেস চলমান রাখতে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে আপিল নিস্পত্তির বিধান রেখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনীর প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা।

৫ই ফেব্রুয়ারি,২০১৩ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত আসামী আব্দুল কাদের মোল্লার বিচারের প্রথম রায় ঘোষণা করেন। কবি মেহেরুন্নেসাকে হত্যা, আলুব্দি গ্রামে ৩৪৪ জন মানুষ হত্যা সহ মোট ৬টি অপরাধের ৫টি প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। কিন্তু এতোগুলো হত্যা, ধর্ষণ, সর্বোপরী গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ মেনে নিতে পারেনি। রায়ের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢাকার শাহবাগে জড়ো হতে শুরু করে এবং এর অনুসরণে একসময় দেশটির অনেক স্থানেই সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু হয়।

এরপর ৫ই ফেব্রুয়ারি,২০১৩ দ্বিতীয় রায়ে কাদের মোল্লাকে ৩টি অপরাধের জন্য ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ২টির জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। কিন্তু এতো বড় সব অপরাধের শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে যারা মেনে নিতে পারেননি তারা শাহবাগে অহিংস বিক্ষোভ সমাবেশের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করে। একসময় তা দেশব্যাপী বিক্ষোভে রূপ নেয়। দেশের অন্য যেসব স্থানে উল্লেখযোগ্য বিক্ষোভ ও সমাবেশ হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, চট্টগ্রামের প্রেসক্লাব চত্বর, রাজশাহীর আলুপট্টি মোড়, খুলনার শিববাড়ি মোড়, বরিশালের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, বগুড়ার সাতমাথা, যশোরের চিত্রা মোড়, কুমিল্লার কান্দিরপাড়া, কুষ্টিয়ার থানা মোড় ইত্যাদি। শাহবাগের অনেকে বলেন তারা মৃত্যুদণ্ডের রায় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত চত্বর ছেড়ে যাবেন না।

অন্যদিকে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আনিসুল হক বলেন “কাদের মোল্লার সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার সুযোগ এখনো রয়েছে”। শেষ পর্যন্ত সরকার জনতার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং আইন সংশোধনের মাধ্যমে আপিল করার ব্যবস্থা রাখে। যার ফলশ্রুতিতে কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হয়।

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩-এর সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাশ হয়। এতে একইসঙ্গে ট্রাইব্যুনালের যেকোনো রায়ের বিরুদ্ধে আসামির পাশাপাশি সরকারেরও আপিলের সমান সুযোগ রাখা হয় সংশোধিত আইনে।

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে খুন এবং অন্যান্য যুদ্ধাপরাধের জন্য আব্দুল কাদের মোল্লাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়।

১২ ডিসেম্বর ২০১৩, কাদের মোল্লাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুঁলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ১২ ডিসেম্বর রাত ১০টা ১ মিনিটে তার শাস্তি কার্যকর হয়।

বাংলাদেশে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের সঙ্গী মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিটি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী সরকারের তরফে বিভিন্ন সময় এ দেশের রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তিবাহিনীর দালালদেরও বিচার আলোচনায় এসেছে।

স্বাধীনতা লাভের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ সরকার। তার সরকারের উদ্যোগে ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি ‘দালাল আইন বা ‘কলাবরেটর অ্যাক্ট’ জারি হয়। সংশোধনীর মাধ্যমে পর আইনটি চূড়ান্ত করা হয়। জাতীয় সংসদে বিল আকারে পাস হওয়ার পর ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৩৭ হাজারের বেশি স্বাধীনতাবিরোধীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ‘বিশেষ ট্রাইব্যুনাল’ বা ‘বিশেষ বিচারালয়’ স্থাপন করে তাদের বিচারে গঠন করা হয় ৭২টি ট্রাইব্যুনাল। এভাবে ওদের বিচার শুরু হলো। ২২ মাসে ২ হাজার ৮৪৮টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। রায়ে ৭৫২ জন দণ্ডিত হন। লঘু অপরাধে সাধারণ ক্ষমায় ২৬ হাজার অপরাধী মুক্তি লাভ করেন। তবে সরকারি প্রেসনোটে বলা হয় ‘যাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, খুন চেষ্টা ও ঘর, বাড়িতে অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই সাধারণ ক্ষমা প্রযোজ্য হবে না।’

ফলে প্রায় ১১ হাজার একাত্তরের আসামির বিচার চলতে থাকল। গণহত্যা, ধর্ষণের মতো অপরাধের বিচারে ১৯৭৩ সালের ২১ জুলাই ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস’ বা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালস’ আইন তৈরি করা হলো। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলো বাংলাদেশে। এরপর সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান দালাল আইন বাতিল করলেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধের খুনিদের বিচারের পথ বন্ধ হয়ে গেল। সেই ১১ হাজার আসামির পক্ষে আপিল করা হলো এবং বিচারে তারা ছাড়া পেয়ে গেলেন। ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইনের অধীনে তাদের বিচারের জন্য প্রায় চার দশক দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হলো। তাই মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে দীর্ঘ সময় পেরিয়েছে। এই বিচার আটকাতে সামরিক ও স্বৈরশাসকদের নেতিবাচক ভূমিকায় বিচার চাওয়ার পথ ছিল রুদ্ধ। যদিও এ নিয়ে মাঠে-ময়দানে শহীদ পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের বিবেকবান মানুষদের লড়াই চলেছে। এত কিছুর পরও বিচার পাওয়া ছিল অধরা। নানা জটিলতায় আন্তর্জাতিক আদালতেও বিচার চাওয়ার তেমন পথ ছিল না।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তের আলোকে ঘোষিত ‘রোম সনদ’-এ উল্লেখ আছে আন্তর্জাতিক অপরাধ যে দেশে সংঘটিত হয়, সে দেশ যদি বিচারের আয়োজনে অপারগ, ব্যর্থ ও অনিচ্ছুক থাকে; তাহলে অন্য কোনো দেশ জাতিসংঘে আবেদন করলে এই অপরাধগুলোর বিচার আন্তর্জাতিক আদালতে হবে। তবে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠন করা হয় ১৯৯৯ সালে, কার্যকর হয় তিন বছর পর ২০০২ সালে। নিয়ম অনুযায়ী সে বছরের ১ জুলাইয়ে আগে যেসব যুদ্ধাপরাধ নানা দেশে সংঘটিত হয়েছে, সেগুলোর বিচারের এখতিয়ার এই আন্তর্জাতিক আদালতের নেই। ফলে, বাংলাদেশ নিজস্ব আদালত গঠনের মাধ্যমে এসব অপরাধের বিচারের উদ্যোগ নেয়।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে। ভিত হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে তাদের একটি মৌলিক আইন ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস)’ ছিল। সংবিধান অভিভাবক হিসেবে আইনকে ছায়া দিয়ে চলেছে। ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গড়ে তোলে বাংলাদেশ। বহুল আলোচিত, সারা বিশ্বে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে দেশের আদালতে স্থাপিত ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’। ইংরেজিতে আদালতের নাম ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল’, সংক্ষেপে ‘আইসিটি’।

২০০৮ সালে সাধারণ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও পুরনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অন্যতম রাজনৈতিক ইশতেহার ছিল রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কাজ করা যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের তারা বিচার করবেন। তারা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় লাভ করেন। এই প্রতিশ্রুতি পূরণে আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্য ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়ারি দেশের জাতীয় সংসদে যুদ্ধ ও মানবাধিকার বিরোধীদের বিচারে আইন পাসের বিল প্রস্তাব করেন। সর্বসম্মতিতে বিল পাস হয়। স্বাধীনতার ৩৯ বছর পর দেশ এই অভিযোগের আসামিদের বিচারে প্রক্রিয়া শুরু করে। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আলাদা ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল ও তদন্ত সংস্থা গড়ে তোলা হয়। তারা পূর্ণ উদ্যমে কাজ শুরু করেন। ২০১০ সালে এই ট্রাইব্যুনাল গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় ভীষণভাবে যুক্ত ছিলেন তখনকার আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, দেশের অন্যতম প্রবীণ আইনজীবী জানান, ‘মানবতাবিরোধীদের বিচারের আইনটি আগেই তৈরি করা ছিল। এ সময় আইনে বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল কেমন হবে, বিচারকাজের স্বচ্ছতা, বিচারকদের দক্ষতা, আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থন ও তাদের সমান আইনি সুযোগ নিশ্চিত করা, বিচার প্রক্রিয়া দেশ ও বিদেশে আন্তর্জাতিক মানের করে তোলা, গ্রহণযোগ্য করার কাজগুলো আমরা করেছি। এই বিচার নিয়ে দেশ-বিদেশে ষড়যন্ত্র তো কম হয়নি। পুরো কর্মযজ্ঞ বিশাল চ্যালেঞ্জ ছিল আমাদের দেশের জন্য।’

এমন অনন্য আদালত কর্মের শুরুর ইতিহাস বহু পুরনো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান নাৎসি বাহিনীর নানা দেশে চালানো গণহত্যা, সে জন্য তাদের শাস্তি দিতে মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোর অভিযোগের বিচারে গঠিত হয়েছিল ‘ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালস’।

আমাদের ট্রাইব্যুনালের বিচারকর্ম দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে নতুন ধারার সূচনা করেছে নিশ্চিতভাবে। বিচারের প্রেক্ষাপট, স্বচ্ছতা, দক্ষতা, আন্তর্জাতিক মান ও বিচারিক পদ্ধতি বিবেচনায় বাংলাদেশ অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একই সঙ্গে দেশে একাত্তর সালে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারীদের বিচারের নতুন পথ দেখিয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী এ দেশের রাজাকার, আলবদর, শান্তিবাহিনীসহ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধীদের বিচার, সামাজিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব ইতিবাচক আছে। এ বিচারের মাধ্যমে ভবিষ্যতে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের আশঙ্কা ও সম্ভাবনা বিচারকার্য রোধ করবে। ট্রাইব্যুনালসে যে ধরনের অপরাধের মামলার বিচার হচ্ছে, সেগুলো সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ নয়। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইন (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল জুরিসপ্রুডেন্স) অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধ শুধু একটি গোষ্ঠী বা দেশের বিরুদ্ধে নয়, মানবতার বিরুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশে গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, দেশান্তরিতকরণের মতো গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটানো হয়েছে। সে জন্য বিচারের কাঠামো তৈরিতে শক্তিশালী ভিতের প্রয়োজন ছিল। ভবিষ্যতে যাতে বিচার নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে না পারেন, বিবেচনায় রাখতে হয়েছে। সর্বদিক চিন্তা করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের সব কাঠামো ঠিক রেখে বিচার প্রক্রিয়ার শুরু হয়।

১৯৪৮ সালের আন্তর্জাতিক ‘সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা সনদ’, ১৯৪৮ সালের ‘গণহত্যা কনভেনশন’, ১৯৪৯ সালের ‘জেনেভা কনভেনশন’, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫০ সালের ‘ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালস প্রিন্সিপালস’, ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল জুরিসপ্রুডেন্স (আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন) ’ ও ‘বাংলাদেশ সংবিধান’র চুলচেরা বিশ্লেষণে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের আলোকে ট্রাইব্যুনালটি গঠন করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের আরও বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিচারকরা সবাই উচ্চ আদালতের (হাইকোর্ট)। আইনজীবীরা প্রত্যেকে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সার্টিফিকেটধারী। পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মামলার তদন্ত করেছেন, করছেন। এই জঘন্য ধরনের অপরাধের বিশ্বের অনেক জায়গায় যেখানে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও আইনি সুযোগ খুব নেই, সেখানে তাদের পক্ষে এমনকি পলাতক আসামিদের পক্ষেও আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তরা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার সুযোগ পেয়েছেন, পাচ্ছেন। স্বচ্ছতায় ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ নেই বললেই চলে।

অথচ একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী এ দেশীয় অপরাধীদের বিচারের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবার ও মুক্তিযুদ্ধকামীদের। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জয়লাভ করার পর ক্ষমতাশীল আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদারদের দোসর এ দেশীয় রাজাকার, আলবদর তথা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রস্তাব (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস অ্যাক্ট ১৯৭৩-অনুযায়ী) ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। সেই আইন অনুসরণ করে বিচার ও প্রসিকিউটর প্যানেলসহ তদন্ত সংস্থাগুলো তৈরি করে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ কাজ শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

শুরু হয় বাংলাদেশের তার ইতিহাসের দায় শোধের পালা। একই সঙ্গে অকল্পনীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। স্বাধীনতার চার দশক পর এসব অপরাধে বিচারের জন্য সাক্ষী হাজির ও সেই সময়ে সঠিক তথ্য, উপাত্তগুলো উপস্থাপন করা যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ ও কঠিন কর্ম। শুরুর দিকে দায়িত্বশীলদের আন্তরিকতা ও নিরলস শ্রমে সব বাধা উতরানো সম্ভব হয়েছে। সব প্রক্রিয়া মেনে বিচার হয়েছে। মামলার সংখ্যা বেশি, মামলাগুলোর তুলনামূলক গুরুত্ব বিবেচনা ও পুরো বিচারকাজে গতি আনতে ২০১২ সালে গঠন করা হয় আরেকটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মামলার আধিক্য কমে আসায় ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুটি ট্রাইব্যুনালকে এক করে একটি ট্রাইব্যুনাল করা হয়।

এই আদালতের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের প্রাপ্তির খাতায় যেমন অনেক কিছু আছে, তেমনি অপ্রাপ্তির বেদনা ও হতাশা বেশ রয়েছে। নানা ধরনের প্রতিকূলতা পেরিয়ে শীর্ষ কজন যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও রায় কার্যকর করা হয়েছে। অন্যদের বিচার চলছে। ১০ বছর আগে যে গতিতে বিচারকাজ শুরু হয়েছিল, সে তুলনায় এখন অনেকটাই মন্থর। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে প্রথম রায়ে একাত্তরের অপরাধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের রুকন আবুল কালাম আজাদ ওরফে ‘বাচ্চু রাজাকার’কে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয় ট্রাইব্যুনাল। একই বছরে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে আরও ৯টি মামলার রায় হয়, কিন্তু বিচারের সে গতি বজায় থাকেনি।

১০ বছরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৪১টি মামলার রায় হয়েছে। ৯৫ জন অপরাধীর দণ্ডদান হয়েছে। মামলাগুলোর রায়ে মোট মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন ৬৯ জন আসামি। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামির রায়ের দণ্ড কার্যকর হয়েছে। আমৃত্যু কারাদণ্ড ঘটেছে ২৪ জনের। যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে একজনের। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ৩৩ জন কারাগারে আছেন। দণ্ডপ্রাপ্তদের আপিল বিভাগে এ পর্যন্ত ৯টি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে। আরও কটি মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাতটি রায়ে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সাবেক আমির ও মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, নির্বাহী পরিষদের সাবেক সদস্য, ধনকুবের মীর কাসেম আলী, সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল ও মন্ত্রী আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য ও সাংসদ এবং মন্ত্রী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (সাকা চৌধুরী), জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মন্ত্রী আবদুল কাদের মোল্লা, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলামকে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর বহাল রাখে সর্বোচ্চ আদালত। পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে মৃত্যুদণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) সুযোগ পাবেন তিনি। এ বছরের ১৪ জানুয়ারি যুদ্ধাপরাধী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের মৃত্যুদণ্ডের রায় সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বহাল থেকেছে। পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে তিনি মামলা ও রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনের সুযোগ পাবেন। জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির ও অন্যতম প্রভাবশালী নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। তিনি সুপ্রিম কোর্টে আপিলের পর চূড়ান্ত রায়ে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দলের সাবেক আমির, বহু বিতর্কিত ও রাজাকার বাহিনীর প্রধান গোলাম আযম ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবদুল আলীমের আমৃত্যু কারাদণ্ড হওয়ার পর তারা আপিল করেছেন। আপিলের বিচারের সময় কারাগারে তারা মারা যান। আদালতের আপিল বিভাগে অন্তত ৩০টি আপিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

আমাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অনন্য উচ্চতায় পৌছেগিয়েছে। আদালতে যুক্ত হয়ে, কাজ করে অভিজ্ঞতা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধী তালিকাভুক্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বিচার আমাদের আইনের মাধ্যমে করতে আর বাধা নেই। সময় ও সুযোগে সেসব উদ্যোগও নেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে। মুক্তিযুদ্ধে রংপুরে গণহত্যার অভিযোগে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার (ওয়াহিদুল হক) বিচার ট্রাইব্যুনালে চলছে। তবে ট্রাইব্যুনাল আইনের কিছু ধারায় সংশোধন না হলে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের বিচার করা সম্ভব হবে না। এরপর জামায়াত, তাদের মুখপত্র সংগ্রামের বিরুদ্ধে বিচার ও ব্যবস্থা নিতে পারা সম্ভব হবে।’

বিগত ১০ বছরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম:

২০১০ সালের ২৫ মার্চ এ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক দশক হয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠার এক দশকে এসে এর বিচার কার্যক্রম আলোচনায় নেই বললেই চলে। তবে মরণব্যাধি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

নানা প্রতিকূলতা, সীমিত জনবল নিয়ে শীর্ষ কজন যুদ্ধাপরাধীসহ যেভাবে বিচারকাজ চলছে, তা‘কম অর্জন নয়। তবে বাংলাদেশের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের রায়ের পর এখন যে হারে মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে, তাতে কবে নাগাদ বিচার প্রক্রিয়া শেষ করা যাবে সে বিষয়ে নিশ্চিত নন কেউ। প্রধান অপ্রাপ্তি এখনো মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগঠন হিসেবে অপরাধী জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের এখনো বিচার করতে না পারা, একাত্তরে এই দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যাযজ্ঞে মূল নেতৃত্ব, পরিকল্পনা ও অংশগ্রহণ করা কুখ্যাত ও গুপ্তঘাতক ‘আলবদর’ বাহিনীর অন্যতম দুই নেতা চৌধুরী মঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানকে (নায়েব আলী) বিদেশ থেকে ফিরিয়ে এনে ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করতে না পারা।

যেসব পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা একাত্তরের ভয়াল নৃশংসতায় জড়িত ছিলেন, তালিকাভুক্ত সেই ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করতে না পারা অন্যতম ব্যর্থতা। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যাকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি প্রদানের লড়াই চলছে আমাদের।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘আদালত গঠনের ১০ বছর পর মনে হচ্ছে, কাজ বেশ সফলভাবে আমরা সম্পন্ন করতে পেরেছি। পৃথিবীর অনেক দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হয়েছে, এখনো হচ্ছে, কিন্তু বিচারকার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্যান্য অনেক দেশের চেয়ে আমাদের ট্রাইব্যুনালকে এগিয়ে রাখব। এই আদালতের ইতিবাচক প্রভাব দেশ ও আন্তর্জাতিকভাবে থাকবে। বিচার প্রক্রিয়া দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে, বহির্বিশবে গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।’ ব্যারিস্টার শফিক আহমেদেরও মত, ‘যে গতিতে মামলা পরিচালনা শুরু হয়েছিল, সে গতিতে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম পরে এগোতে পারেনি। এই দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দীর্ঘদিন পর হলেও উতরানো গেছে। বিচার না হলে বরং আন্তর্জাতিকভাবেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ত।’

ট্রাইব্যুনালকে নানা সময় প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করার চেষ্টা কম হয়নি। ট্রাইব্যুনালের একজন বিচারপতির স্কাইপি কেলেঙ্কারি, যুদ্ধাপরাধের আসামির সঙ্গে দুজন প্রসিকিউটরের যোগাযোগের ঘটনা ছিল তুমুল আলোচনায়। অন্যতম যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদেরের (সাকা চৌধুরী) রায় ঠেকাতে রায় ফাঁসের ঘটনাও ঘটেছে বিচারে বিঘ্ন ঘটানোর ধারাবাহিকতায়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শারীরিকভাবে নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, দেশান্তরিতকরণ এই অপরাধগুলোকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করার বিতর্ক তোলা হয়েছে, এই দেশের আইনগুলোর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত আদালতটি আন্তর্জাতিক অপরাধগুলোর বিচার করার মতো আদর্শ মানদণ্ডের নয় এই বিতর্ক তোলা হয়েছে, কিন্তু অপরাধ বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞদের চুলচেরা বিশ্লেষণ কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করতে সুপরিকল্পিত গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, দেশান্তরিতকরণ ইত্যাদি অপরাধ আবশ্যই আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য। আমাদের আদালতের আইন সেভাবে তৈরি করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সিনিয়র প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেছেন, ‘ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলোর কোনোটিই সাধারণ মামলা নয়। যেহেতু মামলাগুলো দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ এবং মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতায়; মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব চিরস্থায়ী বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্যক্রমের প্রভাবও চিরস্থায়ী দেশ ও দেশের বাইরে। আর পৃথিবীতে গণহত্যার ইতিহাস বন্ধ হয়ে যায়নি। বহু দেশে রাষ্ট্র ও গোষ্ঠী তাদের মতামত, সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে মানতে বাধ্য করে যুদ্ধাবস্থার পরিস্থিতি তৈরি করে নৃশংসতায় লিপ্ত হয়েছে, হচ্ছে। নিকট অতীতে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ঘটেছে। ভবিষ্যতে পৃথিবীর কোনো অঞ্চলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ও গণহত্যা হলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্যক্রম নির্দ্বিধায় তাদের গণহত্যার বিচারে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত ও নজির হবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সাধারণ মানুষের কাছে যেন ফিকে হয়ে না যায়, সে জন্য পদক্ষেপ নেওয়া যেমন রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব, তেমনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্যক্রম ইতিবাচক করে তুলে ধরার দায়িত্ব রাষ্ট্র, সরকার, রাজনীতিবিদদের। মামলাগুলোর বিচারের মাধ্যমে আলাদা ঐতিহাসিক দলিল তৈরি হচ্ছে।

পৃথিবী থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধ করতে মামলাগুলোর দলিলপত্র নজির হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে জানতে, বুঝতে; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরতে মামলার নথিগুলো সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সরকারের। তাতে বহু বছর পরও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দলিলগুলোর মাধ্যমে অকথিত ইতিহাস জানতে পারবেন।

ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, ‘গত ১০ বছরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৪১ মামলায় ৯৬ যুদ্ধাপরাধীর বিচার শেষ হয়েছেএবংযুদ্ধাপরাধীদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। নিষ্পত্তি হওয়া এসব মামলায় এ পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন ৭৬৩ জন। এর মধ্যে নারী সাক্ষী রয়েছেন ১৫৩ জন। আরও ৩৬ মামলায় এক হাজার ৯৪ সাক্ষীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।”
জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লা, মোহাম্মদ কামারুজ্জামানসহ কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের সময় ধর্ষণের শিকার কয়েকজন নারী সাক্ষীও ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন। ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে স্থানীয় তৃণমূল পর্যায়ের রাজাকারদের বিচার কাজ চলছে। এ ছাড়া তদন্ত কাজ এবং আসামি গ্রেপ্তারও অব্যাহত রয়েছে।

• আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত ও প্রসিকিউশন সংস্থার তথ্যমতে, ১০ বছরে ৪১ মামলার রায়ে ট্রাইব্যুনালে ৯৬ এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ডাদেশ (ফাঁসি) হয়েছে ৭০ জনের।
• আমৃত্যু সাজা হয়েছে ২৫ জনের এবং ২০ বছর সাজা হয়েছে একজনের। সর্বোচ্চ আদালতে মামলা চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তির পর সাজা কার্যকর হয়েছে ছয় যুদ্ধাপরাধীর। অন্যদিকে, সর্বোচ্চ আদালতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে আরও ২৯টি আপিল।
• বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে আরও ৩৬টি মামলা, যার আসামির সংখ্যা ২৩৭ জন। ৭৭টি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছে ১৬১ জন আর পলাতক রয়েছে ১৪৪ জন।
• বর্তমানে জামিনে আছে চারজন। গত ১০ বছরে মারা গেছে ১৯ আসামি। এ ছাড়া ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, অপহরণ, ধর্মান্তরিত, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন ধরনের আরও ছয় শতাধিক মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ জমা রয়েছে।

মামলার তদন্ত প্রসঙ্গে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর বলেন, ‘বর্তমানে ছয় শতাধিক অভিযোগ তদন্তাধীন। এসব মামলা নিষ্পত্তি করতে হলে কমপক্ষে আরও ১৫০ বছর লাগবে। কাজে গতি আনতে হলে আরও একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা প্রয়োজন। তাছাড়া আগামী ১০-১২ বছর পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে গেলে সাক্ষীদের হয়তো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। তখন ট্রাইব্যুনাল এমনিতেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিচার সম্পর্কে জানাতে সরকারের উচিত এখনই ট্রাইব্যুনালের বিচারের দলিল ও নথিপত্র আর্কাইভে সংরক্ষণ করা।’

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার একটি বড় অর্জন বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আবদুল হাননান খান বলেন, গত ১০ বছরে সফলতা এসেছে শতভাগ। নিজস্ব আইনে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার মধ্যে দিয়ে এই আইন ও ট্রাইব্যুনাল অন্য সব দেশের কাছে মডেল হয়ে উঠেছে। স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্ববোধ বজায় রেখে গত ১০ বছরে এই ট্রাইব্যুনাল সর্বাঙ্গীণভাবে সফলতা অর্জন করেছে।

যুদ্ধাপরাধের বিচার:

বিষয়ে কিছু প্রশ্নের আইনি জবাব দিয়েছিলেন তুরিন আফরোজ, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) প্রসিকিউটর, বাংলা নিউজ 24.কম কে, ২৫ মার্চ, ২০১৭ সালে, প্রশ্নসমূহ প্রাসাঙ্গিক ও জনগণের বোঝার জন্য জনস্বার্থে পুরো অংশ আংশ তুলে ধরা হল (Fair use only for literacy purpose):

১৯৭৩ সালের ১৭ মে ‘দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনালস) আদেশ ১৯৭২’এর অধীনে আটক যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই তাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। এই ঘোষণায় ষ্পষ্ট করে বলা হয় যে, রাষ্ট্রদ্রোহিতা, ধর্ষণ, খুন, খুনের চেষ্টা, অগ্নিসংযোগ, অপহরণ প্রভৃতি ১৮ ধরনের অপরাধের দায়ে দণ্ডিত ও অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রদর্শন করা হবে না। এ কারণে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর ‘দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনালস) আদেশ, ১৯৭২’এর অধীনে প্রায় ৩৭ হাজার ব্যক্তির ভেতর প্রায় ২৬ হাজার ছাড়া পেলেও ১১ হাজারের বেশি ব্যক্তি কারাগারে আটক ছিল এবং তাদের বিচার কার্যক্রম অব্যাহত ছিল।

প্রশ্ন ১: বাংলাদেশ সরকারের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার কোনো সুযোগ আছে কি?

আইনি ব্যাখ্যা: ১৯৭৩ সালের ১৭ মে ‘দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনালস) আদেশ ১৯৭২’এর অধীনে আটক যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই তাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। এই ঘোষণায় ষ্পষ্ট করে বলা হয় যে, রাষ্ট্রদ্রোহিতা, ধর্ষণ, খুন, খুনের চেষ্টা, অগ্নিসংযোগ, অপহরণ প্রভৃতি ১৮ ধরনের অপরাধের দায়ে দণ্ডিত ও অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রদর্শন করা হবে না। এ কারণে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর ‘দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনালস) আদেশ, ১৯৭২’এর অধীনে প্রায় ৩৭ হাজার ব্যক্তির ভেতর প্রায় ২৬ হাজার ছাড়া পেলেও ১১ হাজারের বেশি ব্যক্তি কারাগারে আটক ছিল এবং তাদের বিচার কার্যক্রম অব্যাহত ছিল।

উপরন্তু সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা মাত্র দুই মাস পরই পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের সহযোগীদের বিচারের জন্য ২০ জুলাই ১৯৭৩ তারিখে বাংলাদেশ সরকার ‘আন্তজার্তিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩’ প্রণয়ন করে। সুতরাং বাংলাদেশ সরকার কখনও যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা প্রদর্শন করেনি। আর তাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সুযোগ এখনও আছে।

প্রশ্ন ২: ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। এই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ সরকার ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীকে বিচার না করে পাকিস্তানে ফেরত পাঠাতে সম্মত হয়। এই চুক্তির আইনি অবস্থান কী?

আইনি ব্যাখ্যা: ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি (International Treaty)। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৪৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘বিদেশের সহিত সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হইবে এবং রাষ্ট্রপতি তাহা সংসদে পেশ করিবার ব্যবস্থা করিবেন।’

এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদন করা হল একটি executive act এবং এরূপ চুক্তির validity প্রশ্নে সংসদের সম্মতি গ্রহণ করা আবশ্যক নয়। তবে যদি কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির অধীনে প্রতিষ্ঠিত দায়বদ্ধতা বাংলাদেশের প্রচলিত কোন আইনের পরিপন্থী হয়, তবে সেই আন্তর্জাতিক চুক্তিকে অবশ্যই আইন রূপে সংসদে পাস করিয়ে নিতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশের আদালত দেশীয় আইনকেই প্রয়োগ করতে বাধ্য থাকবে। ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি কখনও বাংলাদশের সংসদে আলোচিত হয়নি।

আবার এই আন্তর্জাতিক চুক্তিটি বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩’এর পরিপন্থী। সুতরাং বাংলাদেশের কোনো আদালত ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তিটি প্রয়োগে বাধ্য নয়। এর ফলে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩’এর অধীনে ফেরত পাঠানো ১৯৫ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদেরও বিচার করা সম্ভব।

প্রশ্ন ৩: ১৯৭৩ সালের ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন’ সার্বিকভাবে ‘আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন’ হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইনি ভাষায় ‘আন্তর্জাতিক মান’এর সঙ্গে তারতম্য রয়েছে। এতে কি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে?

আইনি ব্যাখ্যা: ‘আন্তর্জাতিক মান’ একটি আপেক্ষিক ধারণামাত্র। বিশ্বরাজনীতি এবং ক্ষমতার পটভূমিতে এই মানের পরিবর্তন সাধিত হয়। এমনকি ‘Rome Statute of the International Criminal Court, ১৯৯৮’তেও এই পরিবর্তনশীল ‘আন্তর্জাতিক মান’এর ব্যাপারটি স্বীকৃতি লাভ করেছে। সুতরাং একটি দেশীয় আইন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হল কি না, তা প্রতিটি মুহূর্তে নিক্তিতে পরিমাপ করার অবকাশ নেই। বরং দেখার বিষয় হল, যে কোনো দেশীয় আইন সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক বিশ্বে গ্রহণযোগ্য কি না, নাকি ঐ আইন আন্তর্জাতিক বিশ্বের মৌলিক ধ্যান-ধারণা ও নৈতিকতার পরিপন্থী। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে, ১৯৭৩ সালের ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন’ মোটেও আন্তর্জাতিক বিশ্বের মৌলিক ধ্যান-ধারণা বা নৈতিকতার পরিপন্থী নয়।

যুদ্ধাপরাধীদের দেশীয় আইনে বা ট্রাইব্যুনালে বিচারের ব্যাপারটি বহুদিন থেকেই আন্তর্জাতিক বিশ্বে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে আসছে। যুদ্ধাপরাধের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত হওয়ার, এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বহু আগেই ১৯৪৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার নিজস্ব আইনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে বহুদেশ একইভাবে তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী দেশীয় ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধ অপরাধের বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। যুদ্ধাপরাধীদের এসব বিচারের কোনো একটিও কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশ্বে প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। এমনকি বহুল আলোচিত Eichmann Trial যা কিনা ইসরায়েলি আদালতে ইসরায়েলি আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছে, আন্তর্জাতিক বিশ্বে তা যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। ইসরায়েলি আইন যার অধীনে যুদ্ধাপরাধী Adolf Eichmann এর মৃত্যু Nayis and Nayi Collaborators (Punishment) Law, ৫৭১০-১৯৫০। আর সেই সময় যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য স্বীকৃত আন্তর্জাতিক দলিল ছিল The Charter of the International Military Tribunal, ১৯৪৫।

এটা সর্বজনস্বীকৃত যে ইসরায়েলি আইনটি অনেক ক্ষেত্রেই তদানীন্তন যুদ্ধাপরাধের ‘আন্তর্জাতিক মান’এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। কিন্তু তার পরও Eichmann Trial আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।

সুতরাং ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩’এর সঙ্গে ‘আন্তর্জাতিক মান’এর আইনি ভাষার সামান্য তারতম্যের কারণে ঐ আইনের অধীনে কৃত যুদ্ধাপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক বিশ্বে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

প্রশ্ন ৪: ‘Rome Statute of the International Criminal Court, ১৯৯৮’সহ বেশ কিছু আইন্তর্জাতিক দলিলে ‘শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ’কে (Crime Against Peace) সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। তাহলে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩’এর অধীনে এই অপরাধের বিচার করা যাবে কি?

আইনি ব্যাখ্যা: ‘শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ’কে বাংলাদেশের ১৯৭৩ সালের আইনে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা আছে। এই সংজ্ঞা নুরেমবার্গ চার্টারের সঙ্গেও যথেষ্ট সামঞ্জস্যপূর্ণ। সুতরাং ১৯৭৩ সালের আইন অনুযায়ী ‘শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ’এর বিচার অবশ্যই করা সম্ভব।

Rome Statute-এ কোনো অপরাধের সংজ্ঞা না থাকলে যে অন্য কোনো আইনে সেই অপরাধের বিচার করা যাবে না– এই যুক্তি অবান্তর। এমনকি International Criminal Court (ICC) নিজেও এমন অপরাধের বিচার করতে পারে যার সংজ্ঞা Rome Statute-এ অনুপস্থিত। উদাহরণস্বরূপ Lubanga Trial-এর কথা বলা যেতে পারে।

Conscription-এর কোন সংজ্ঞা Rome Statute-এ না থাকলেও Lubanga Trial-এ ICC, Sierra Leon-এর Special Court যেভাবে Conscription অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করেছে, তা গ্রহণ করেছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক আইনের জুরিসপ্রুডেন্স অনুযায়ী, যে কোনো দেশের জাতীয় আদালতে প্রতিষ্ঠিত কোনো আইনি ধারণা বা সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনের উৎস হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আদালতে/ট্রাইব্যুনালে প্রতিষ্ঠিত ‘শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ’এর সংজ্ঞা ICC বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক আদালতে আন্তর্জাতিক আইনের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। অতএব ১৯৭৩ সালের আইনের অধীনে ‘শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ’এর বিচার নিয়ে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না।

প্রশ্ন ৫: অনেকের মতে, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ (Crimes Against Humanity)-এর সংজ্ঞাতে দুটি অতিরিক্ত বিষয়কে অপরাধের element হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এর একটি হল, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধটি যেন একটি ‘Widespread and Systematic’ সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে সংঘটিত হয়। আর অন্যটি হল, অপরাধী যখন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধটি সংঘটন করবে তখন তার যেন ঐ ‘Widespread and Systematic’ সংঘাতের ব্যাপারে Knowledge থাকে। এই দুটি বিষয়ের অনুপস্থিতির কারণে ১৯৭৩ সালের আইনের অধীনে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের’ বিচার করা কি সম্ভব?

আইনি ব্যাখ্যা: ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’-টি ‘Widespread and Systematic Attack’-এর অংশ হিসেবে গণ্য করার উদ্দেশ্য হল সেটি যেন কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা না হয়। ১৯৭৩-এর আইন অনুযায়ী যাদের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা হবে তারা সবাই তাদের কৃত অপরাধ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে করেছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে এসব যুদ্ধাপরাধী মূলতঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেয় এবং একটি ব্যাপক (widespread) এবং নিয়মতান্ত্রিক (systematic) সংঘাতের পটভূমিতে যাবতীয় অপরাধ সংঘটন করে। সুতরাং বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে ঐ যুদ্ধ যে একটি ‘Widespread and Systematic Attack’ ছিল তা আর আলাদা করে প্রমাণ করার প্রয়োজন পড়ে না। উপরন্তু অনেক আন্তর্জাতিক দলিল অনুযায়ী, ‘মানবতার অপরাধ’ প্রমাণের ক্ষেত্রে ‘Widespread and Systematic Attack’ প্রমাণ করার প্রয়োজন হয় না।

এর পর আসছে যুদ্ধাপরাধীদের Knowledge-এর বিষয়টি। Rome Statute অনুযায়ী এই Knowledge থাকতে হবে ‘Widespread and Systematic Attack’ প্রসঙ্গে। অনেকে যুক্তি দেখান, ‘মানবতার বিরুদ্ধে’ অপরাধ ‘mens rea’ ছাড়াও সংঘটন করা সম্ভব আর তাই বাংলাদেশে ১৯৭৩ এর আইনে ‘Knowledge’-এর ব্যাপারটি না থেকে ভালোই হয়েছে। এখানে উল্লে¬খ্য যে, mental element ছাড়া যুদ্ধাপরাধ এর দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে একজন অপরাধী যা-ই করুক না কেন (যেমন: murder, extermination, enslavement ইত্যাদি), তার বিরুদ্ধে সেই নির্দিষ্ট অপরাধের mens rea অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে।

এখানে Rome Statute এ mens rea-এর অতিরিক্ত যে Knowledge-এর কথা বলা হয়েছে তা হল– অপরাধীর অবশ্যই Knowledge থাকতে হবে যে তার অপরাধটি একটি ‘Widespread & Systematic Attack’-এর অংশ ছিল। বাংলাদেশের ১৯৭৩ সালের ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন’ অনুযায়ী ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ প্রমাণের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো Knowledge-এর অস্তিত্ব প্রমাণ করবার প্রয়োজন নেই। একইভাবে International Criminal Tribunal for the Former Yugoslavia, International Tribunal for Rwanda এবং সিয়েরা লিয়েনের বিশেষ আদালতে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে এই Knowledge এর অস্তিত্ব প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই।

প্রশ্ন ৬: ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের অধীনে Command Responsibility ev Superior Responsibility নিরূপণে অধঃস্তন ব্যক্তিদের কৃত অপরাধ সম্পর্কে Commander বা Superior-দের actual অথবা Constructive কোনো প্রকার Knowledge-এর প্রয়োজন হয় না। অথচ Rome Stature এর Article ২৮-এ এই Knowledge-এর কথা বলা হয়েছে। এ দিক থেকে পর্যালোচনা করলে বাংলাদেশের ১৯৭৩ সালের আইনটি কি অপর্যাপ্ত বলা যেতে পারে?

আইনি ব্যাখ্যা: ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনটি মোটেও অপর্যাপ্ত নয়। এই আইনে Command বা Superior Responsibility-কে অনেক ব্যাপকভাবে দেখা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, অধঃস্তন ব্যক্তি যদি কোনো যুদ্ধাপরাধ করে থাকে তার জন্য সবসময়ই তার Commander বা Superior-কে দায়ী করা যাবে তা সে সংঘটিত অপরাধ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকুক বা না থাকুক। তবে হ্যাঁ, যদি কোনো Commander বা Superior সত্যিকার অর্থে তার অধঃস্তনের কৃত অপরাধ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না থাকে, সেখানে তার অপরাধের গুরুত্ব অপেক্ষাকৃত কম বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। একইসঙ্গে অপরাধের দণ্ডও কম বলে ট্রাইব্যুনালের কাছে ‘ন্যায্য ও উপযুক্ত প্রতীয়মান’ হওয়ার সুযোগ থাকে।
প্রসঙ্গত, এটা উল্লেখ করা যেতে পারে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ম্যানিলায় গণহত্যার জন্য জাপানের জেনারেল ইয়ামাশিতার বিচারের সময় সৈন্যদের আচরণের জন্য অধিনায়ককে দায়ী করে তার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

প্রশ্ন ৭: ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ৬(৫) ধারায় বলা হয়েছে ‘if, in the course of a trial, any one of the members of a Tribunal is, for any reason, unable to attend any sitting thereof, the trial “may continue” before the other members.’ অনেকে মনে করেন, এর ফলে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত ন্যায়সঙ্গত বা নিরপেক্ষ না হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই ধারণা আসলে কতটা যুক্তিসঙ্গত?

আইনি ব্যাখ্যা: ধারণাটি মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়। এখানে লক্ষণীয় যে,‘may continue’ শব্দ দুটির ব্যবহারের মাধ্যমে section ৬(৫)-কে মোটেও peremptory মনে হয় না; বরং prescriptive বলে প্রতীয়মান হয়। তার মানে হল, যদি বিচারকার্য চলাকালীন ট্রাইব্যুনালের সদস্যদের কেউ কোনো কারণে কোনো অধিবেশনে উপস্থিত হতে অসমর্থ হন, অপর সদস্যদের উপস্থিতিতে বিচারকার্য চলতে পারে।

আবার prescriptive provision-এর কারণে বিচারকার্য মুলতবিও করা যেতে পারে যদি তা ন্যায়বিচারের স্বার্থে হয়। সুতরাং ন্যায়সঙ্গতা বা নিরপেক্ষতার প্রশ্নে ১৯৭৩ সালের আইনের ৬(৫) ধারা পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন নেই। এ ছাড়া ট্রাইব্যুনাল নিজেই তার নিজস্ব কার্যক্রমের নিয়মাবলী (Rules of Procedure) প্রণয়ন করে তাতে এই বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা সংযুক্ত করতে পারে।

প্রশ্ন ৮: ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ৬(৮) ধারায় বলা হয়েছে যে, ‘ট্রাইব্যুনাল গঠন কিংবা উহার চেয়ারম্যান অথবা সদস্যদের নিয়োগ বিষয়ে বাদী, অভিযুক্ত অথবা তাদের আইনজীবীরা কোন আপত্তি উত্থাপন করতে পারবে না।’ এর ফলে কি ট্র্রাইবুনালের সিদ্ধান্ত নিরপেক্ষ না হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে?

আইনি ব্যাখ্যা: এখানে প্রথমত যা লক্ষ্যণীয় তা হল, Right to Challenge আসলে কারও ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়-বাদী অথবা অভিযুক্ত ব্যক্তি। এ ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের কোনো অবকাশ নেই। তবে হ্যাঁ, ট্রাইব্যুনাল সদস্যদের কারও ব্যাপারে অযোগ্যতার অভিযোগ আসতে পারে। কিন্তু এ ধরনের কোন Right to Challenge-এর বিষয় যুদ্ধাপরাধের জন্য গঠিত কোনো ট্রাইব্যুনালেই প্রযোজ্য নয়। এ ছাড়া ট্রাইব্যুনালে যে কোনো সদস্যেরই ‘বিব্রতবোধ’ করার অধিকার একটি সহজাত অধিকার। এ ব্যাপারে ট্রাইব্যুনাল তার নিজস্ব Rules of Procedure-এ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।
এ ছাড়া ১৯৭৩ সালের আইনে ট্রাইব্যুনালের কার্য পরিচালনার জন্য যে কোনো রকমের প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানকে অর্পণ করা হয়েছে। প্রয়োজনবোধে চেয়ারম্যান উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে এই ক্ষমতার সঠিক প্রয়োগ করতে পারেন। আইন পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন নেই।

প্রশ্ন ৯: ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের কিছু ধারা [যেমন- ৮(৫), ৮(৭), ১১(২) এবং (১৮)] দেখে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যে তদন্ত ও বিচার চলাকালীন সময়ে কোনো ব্যক্তিকে এমনভাবে তথ্য প্রকাশ্যে বাধ্য করা হতে পারে যাতে ঐ ব্যক্তির আত্ম-অভিযুক্ত (self-incriminate) হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে কি ঐ ব্যক্তির Right Against Self-incrimination লঙ্ঘিত হয় না?

আইনি ব্যাখ্যা: এটা সত্য যে, ১৯৭৩ সালের আইনে তথ্য প্রকাশের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। তদন্ত ও বিচার চলাকালীন সময়ে ন্যায়বিচারের স্বার্থে নির্ভুল তথ্যপ্রমাণ যথেষ্ট জরুরি। সম্পূর্ণ ও সত্য তথ্য ছাড়া বিচার কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে ১৯৭৩ সালের আইনে এটাও বলা আছে যে, ‘যদি কোন ব্যক্তি এমন কোন তথ্য প্রদানে বাধ্য হন যার ফলে আত্ম-অভিযুক্ত (self-incriminate) হবার সম্ভাবনা থাকে, তবে সেই তথ্য দ্বারা কোন পর্যায়ে তাকে গ্রেফতার বা ফৌজদারীতে সোপর্দ করা যাবে না।’

তাহলে যেখা যাচ্ছে, ১৯৭৩ সালের আইনটি যে কোনো ব্যক্তির Right Against Self-incrimination-কে সুস্পষ্টভাবে সংরক্ষণ করেছে।

প্রশ্ন ১০: ১৯৭৩ সালের ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে’ অপরাধের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অনেকে যুক্তি দেখান যে, টঘ সমর্থিত অনেক আন্তর্জাতিক আদালত বা ট্রাইব্যুনালেই মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়নি। আর তাই বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা ঠিক না। এই যুক্তি কি গ্রহণযোগ্য?

আইনি ব্যাখ্যা: এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। ১৯৭৩ সালের আইনটি বাংলাদেশের একটি জাতীয় আইন। এই আইনটির পর্যালোচনা অন্যান্য জাতীয় আইনের পটভূমিতেই করতে হবে। যেখানে বাংলাদেশে একটি হত্যার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে, সেখানে একাধিক হত্যার (গণহত্যা) শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়াই তো ন্যায়সঙ্গত।

বাংলাদেশের National Criminal Jurisprudence-এর সঙ্গে ১৯৭৩ সালের আইনটি অবশ্যই সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এটাও ঠিক যে UN সমর্থিত অনেক আন্তর্জাতিক আদালত বা ট্রাইব্যুনালেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়নি। এমনকি Rome Statue অনুযায়ী, ICC-রও অপরাধের শাস্তি হিসেবে মৃতুদণ্ড দেওয়ার বিধান নেই। কিন্তু তাই বলে, জাতীয় আইনে অপরাধের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান তুলে দিতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা আন্তর্জাতিকভাবে এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং উল্টো জাতীয় আইনকে সম্মান প্রদর্শন করে Rome Statute এ বলা হয়েছে ‘‘Emphasizing that the International Criminal Court established under this Statute shall be complementary to national criminal jurisdiction’. Rome Statute-এর যে ভাগে ICC প্রদত্ত শাস্তির বিধানের কথা বলা হয়েছে, সেখানে আরও বলা হয়েছে-‘Nothing in this part affects the application by States of penalties prescribed by their national law.’ সুতরাং ১৯৭৩- এর আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকা অসমীচীন নয়।

প্রশ্ন ১১: ১৯৬৬ সালের International Covenant on Civil and Political Rights-এর Article ১৪-এ এবং ১৯৯৮ সালের Rome Statute for the International Criminal Court এর Article ৫৪ এবং ৫৫-এ উল্লে-খিত অনেক বিষয়ই ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে সুষ্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তাহলে কি ১৯৭৩ সালের আইনটির পরিবর্তন অপরিহার্য যাতে উপরে উলে¬খিত বিষয়গুলো সন্নিবেশিত করা যায়?

আইনি ব্যাখ্যা: উপরে উল্লে¬খিত বিষয়গুলোর বেশির ভাগই হল procedural ব্যাপার। কিভাবে তদন্ত পরিচালিত হবে, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কিভাবে প্রশ্ন করা হবে, তদন্তকালে অভিযুক্ত ব্যক্তির কী কী অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না, prosecution-এর কী কী দায়িত্ব রয়েছে মামলার তদন্ত এবং বিচার কার্যক্রমের সময় ইত্যাদি বিষয়ের বিশদ ব্যাখ্যা উপরে উলে¬খিত আন্তর্জাতিক দলিলগুলোর নিদিষ্ট ধারাগুলোতে বর্ণিত হয়েছে। এর অনেক বিষয়ই ১৯৭৩ সালের আইনে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। যা কিছু বাকি রয়েছে তার অন্তর্ভুক্তির জন্য আইন পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন নেই। বরং ১৯৭৩ সালের আইনের প্রদত্ত ক্ষমতা বলে ট্রাইব্যুনাল তার নিজস্ব Rules of Procedure-এ এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে নিতে পারে।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর অনুবিভাগ সোমবার তাকে অপসারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে৷ সেখানে বলা হয়, ‘‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজকে শৃঙ্খলা ও পেশাগত আচরণ ভঙ্গ এবং গুরুতর অসদাচরণের দায়ে ২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রজ্ঞাপনে প্রদত্ত নিয়োগ বাতিলক্রমে প্রসিকিউটর পদ হতে অপসারণ করা হলো৷’’এই অভিযোগে গত বছরের ১০ মে তুরিনকে ট্রাইব্যুনালের সব মামলা পরিচালনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল৷তুরিন আফরোজ এ মামলা পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর ২০১৭ সালের নভেম্বরে ওয়াহিদুল হককে ফোন করে কথা বলার পর পরিচয় গোপন করে ঢাকার একটি হোটেলে তার সঙ্গে দেখা করেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়৷ তাদের কথোপকথনের রেকর্ড ও বৈঠকের অডিওরেকর্ডসহ যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়৷ এরপর তুরিন আফরোজ এক ফেইসবুক পোস্টে নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও ওই গোপন বৈঠকের কথা অস্বীকার করেননি৷
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল গ্রেপ্তার হওয়া পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সাবেক মহাপরিচালক মুহাম্মদ ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে তুরিন আফরোজ গোপনে বৈঠক ও টেলিফোনে আলাপ করেছেন বলে অভিযোগ উঠে৷তিনি জাতির সাথে বেইমানি করলেন অথচ তার উপরে বর্ণিত আইনি ব্যাখ্যা সমূহ গুরুত্ববহন করলেও নিজেকে পাক-দালালের কাতারে নামিয়ে আনলেন।

পরিশেষে:

আমাদের প্রজন্মতো কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রতিবাদ করছে না। এ প্রজন্মের হুংকার, ধর্ম নির্ভর রাজনৈতিক দলগুলোর বিরূদ্ধে শুধু নয়, আওয়ামী লীগ, বি এন পি, জাতীয় পার্টি সহ অনান্য সকল দলের জন্য নিদর্শন স্বরূপ।

পাশাপাশি কতিপয় ব্যক্তিবর্গ এই প্রজন্মের জাগরণ কে বিভক্ত করার চেষ্টা করে চলেছেন। যার ফলাফল এক পক্ষ ধর্মকে হাতিয়ার বানিয়ে ইসলাম সর্ম্পেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করে ইসলাম কে সাম্প্রদায়িকতার তকমা দিচ্ছে, অপরদিকে ধর্ম নিরোপেক্ষতার নামে ধর্ম কে খাটো করছে। মাঝখান হতে আমাদেও প্রজন্ম রক্তাক্ত হচ্ছে। আর ফায়দা লুটছে রাজনৈতিক দল, যে যেভাবে পারছে। কিছু ব্যক্তি হিরো সাজার জন্য ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত করে আশ্লীলভাবে ধর্মকে বে-আব্রু করছে। এর প্রেক্ষিতে ধমৃীয় অনুভূতিতে আঘাত করার জন্য এ প্রজন্মের ঐক্য বিনষ্ট করার পায়তারা করছে। আমাদের দেশ ধর্ম নিরপেক্ষ, প্রত্যেকেরই নিজস্ব ধর্ম পালন সাংবিধানিক ভাবে স্বীকৃত।

র্ধম নরিপক্ষেতা ও র্ধমীয় স্বাধীনতা সর্ম্পকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির অনুচ্ছেদঃ ১২ এ বর্ণিত আছে যে,

১২। র্ধম নিরপক্ষেতা নীতি বাস্তবায়নরে জন্য (ক) র্সব প্রকার সাম্প্রদায়কিতা, (খ) রাষ্ট্র র্কতৃক কোন র্ধমকে রাজনৈতিক র্মযাদা দান, (গ) রাজনতৈকি উদ্দশ্যে র্ধমীয় অপব্যবহার, (ঘ) কোন বিশেষ র্ধম পালনকারী ব্যাক্তরি প্রতি বৈষম্য বা তাহার উপর নীপিড়ন, বিলোপ করা হইবে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানেরতৃতীয় ভাগ মৌলিক অধিকার,র্ধমীয় স্বাধীনতার অনুচ্ছেদঃ
৪১ এ বর্ণিত আছে যে,

(৪১) (১) আইন, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতা-সাপক্ষে প্রত্যকে নাগরকিরে যে কোন র্ধম অবলম্বন, পালন বা প্রচাররে অধকিার রহিয়াছে ।

(খ) প্রত্যকে র্ধমীয় সম্প্রদায় ও উপ-সম্প্রদায়রে নিজস্ব র্ধমীয় প্রতষ্ঠিানরে স্থাপন, রক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অধকিার রহিয়াছে ।

(২) কোন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে যোগদানকারী কোন ব্যক্তরি নিজস্ব র্ধম-সংক্রান্ত না হইলে তাঁহাকে কোন র্ধমীয় শিক্ষা গ্রহণ কিংবা কোন র্ধমীয় অনুষ্ঠান বা উপাসনায় অংশগ্রহণ বা যোগদান করতে হইবে না।

এক কথায় বলা যায় যে, আমাদের প্রিয় এই স্বদেশ চরম কঠিন সময় এর মুখোমুখি দাড়িয়েছে। জাত, বর্ণ, র্ধম, ধনী-গরিব, সব বয়ষী মানুষের স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার যুদ্ধপরাধীদের বিরূদ্ধে শাহবাগ প্রজন্ম চত্বর সহ সারা দেশের সব জেলা, উপজেলায় টানা ২০ দিনের ও বেশি আর্ন্তজাতিক যুদ্ধপরাধীদের বিরূদ্ধে ন্যায় বিচার এর দাবীতে অটল ছিল, ঠিক তখনই এই জাতীয় ঐক্যের মধ্যে বিভক্তির জন্য সাধারন মানুষের মধ্যে ধর্মের নামে কুৎসা রটিয়ে চলেছে। বিভিন্ন ভাবে ইসলাম ধর্ম কে অবমাননা করে প্রজন্মের আন্দোলন কে ভিন্ন খাতে পরিচালনার জোর প্রচেষ্টা সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সমূহ ফায়দা লোটার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। পাশাপাশি বিচার বিভাগের ভাবমুর্তিক্ষুন্ন করার অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

সমস্যা হচ্ছে, আমাদের দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামে কার অবদান বেশি ছিল এবং কম ছিল তা নিয়ে ইচ্ছাকৃত বিতর্ক সৃষ্টির একটি প্রবণতা রয়েছে৷ তবে আমি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান৷ কিংবা জিয়াউর রহমানকে একে অপরের সঙ্গে তুলনা করার কোনো সুযোগ দেখি না৷ বরং দু’জনকে দু’জনের অবস্থানে রেখে সম্মান জানানোকেই উচিত মনে করি৷ সবচেয়ে বড় কথা, মুজিবুর রহমান পুরো বাংলাদেশি জাতির জনক, শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের নেতা নন৷ আর জিয়াউর রহমান যে সময় স্বাধীনতার ঘোষকের ভূমিকা পালন করেছিলেন জাতির জনকের পক্ষে, সেসময় কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিত ছিলেন না তিনি৷ তিনি গোটা দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের পক্ষে কথা বলেছিলেন৷ ফলে তাঁদের নিয়ে রাজনীতি না করলে তা গোটা জাতির জন্যই উত্তম৷মার মনে হয় ইতিহাস বদলের এই চেষ্টায় ইতি টানা জরুরি৷যুদ্ধাপরাধের বিচার৷ ঢাকার ‘আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের’ বিচারের মান নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন থাকতে পারে, তবে যুদ্ধাপরাধের বিচার যে বাংলাদেশিরা সামগ্রিকভাবে মেনে নিয়েছেন সেটা বোঝাই যায়৷ এখনও যেসব যুদ্ধাপরাধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় নিজেদের নিরাপদ করে রেখেছেন তাদের বিচারও জরুরি৷ পাশাপাশি দল হিসেবে যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হবে কিনা সেটাও দ্রুত ফয়সালা করা উচিত৷আমাদের স্বাধীনতার প্রসঙ্গে আসলে ঘুরেফিরে উপরে উল্লিখিত তিনটি বিষয় নিয়ে আজও বিতর্ক রয়ে যাওয়াটা দুঃখজনক৷ আমাদের মনে রাখা উচিত, লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা৷ প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা এই স্বাধীনতায় অসামান্য অবদান রেখেছেন৷ বাংলাদেশিদের এই অর্জন তাই কোনো একক ব্যক্তি বা দলের নিজস্ব অর্জন নয়৷ এটা গোটা জাতির অর্জন৷

যুদ্ধ কখনও সুখকর অভিজ্ঞতা নয়। যুদ্ধের নির্মমতা ও হিংস্রতা কখনও একটি নির্যাতিত জাতির স্মৃতি থেকে মুছে যায় না। যে ব্যক্তি বা জাতি যুদ্ধে তার বা তাদের নিরপরাধ আপনজন হারিয়েছে, অকারণে অত্যাচারিত হয়েছে, সে বা তারা কী করে সবকিছু ভুলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে? গণহত্যা ও যুদ্ধকালীন অপরাধের বিচার তাই একটি নির্যাতিত জাতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধের পরবর্তী সময় থেকেই যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি বাংলাদেশের জনগণের অন্যতম দাবি রূপে দেশে-বিদেশে স্বীকৃত হয়ে আসছে।

আমাদের নাকের ডগায় মুলো ঝুলিয়ে ইচ্ছে মতন চাবি দেওয়া পুতুল নাচ নাচিয়েছে, নিশ্চয়ই সেই সব ধোঁড়াদের এবার কানে পানি যাবে। যদি তোয়াক্কা না করে তবে এপ্র্রজন্ম বিস্ফোরিত হবে হিরোশিমা-নাগাসাকির চেয়ে শক্তি নিয়ে। এই গণজাগরণ থেকে রাজনীতিবীদদের শিক্ষা নেওয়া উচিত।

আর এ প্রজন্মতো ওৎ পেতে আছে। তাই এ প্রজন্মের গণজাজরণের ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করতে ধর্ম কে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করার স্পর্ধা না করে বাকি সকল রাজাকারদের শাস্তি দিতে হবেই। এর সাথে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহনকারীদের ও বিচারের আওতায় আনতে হবে। নইলে এ প্রজন্মের সাথে ৩০ লাখ শহীদের আত্মা এক সাথে বিদ্রোহ করবেই। অতিদ্রুতর সময়ের মধ্যে সকল যুদ্ধাপারাদীর বিচার নিস্পত্তি করে সোনার বাংলাদেশকে কলঙ্কমুক্ত করে সমগ্র জাতর দায়মুক্তি ঘটুক। সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মারা শান্তি পাবে। সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ সফল হবে।

তথ্যসূত্র:
 আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন ১৯৭৩,
 বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের কী মূল্যায়ন করছেন ভুক্তভোগীরা,আবুল কালাম আজাদ বিবিসি বাংলা,
ঢাকা ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬।
 যুদ্ধাপরাধের বিচার: কিছু প্রশ্নের আইনি জবাব, তুরিন আফরোজ ২৫ মার্চ, ২০১৭ , বিডিনিউজ24.কম ।
 ১.Press Note on General Amnesty, Bangladesh Gazette, 17 May 1973.
২. ঐ Clause 4|
৩. মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী ও শাহরিয়ার কবির, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার : বিঘ্নিতকরণের চক্রান্ত দেশে ও বিদেশে (ঢাকাঃ একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, ২০০৯), পৃষ্টা. ১১।
৪. Major (Retd) Akhtaruzzaman V. Bangladesh, W.P. No. 3774 of 1999 (unreported).
৫. Mahmudul Islam, Constitutional Law of Bangladesh (2nd ed., Dhaka: Mullick Brothers, 2002), pp. 735.
৬. Rome Statute Gi Article 9- Genocide ‘Amendments to the Elements of Crimes may be proposed by (a) Any state party, (b) The judges acting by an absolute majority; (c) The Prosecutor. Such amendments shall be adopted by a two-thirds majority of the members of the assembly of state parties.’
৭. Consistency of Bangladesh’s International Crimes (Tribunals) Act, 1973 with International Standards, a letter written by the International Bar Association, War Crimes Committee to the United Kingdom Parliament Human Rights Group on 29 December 2009, at Conclusions (i), pp.1.
৮. 1943 সালের Krasnodar Trial|
৯. Hannah Arendt, Eichman in Jerusalem: A Report on the Banality of Evil (New York: Viking Press, 1964).
১০. Matthew Lippman, ‘Genocide: The Trial of Adolf Eichmann and the Quest for Global Justice’ (2002) 8 Buffalo Human Rights Law Review 45.
১১. Section 3 (b), International Crimes (Tribunals) Act, 1973.
১২. Section 6 (a), Charter of the International Military Tribunal, 1945.
১৩. Prosecutor v. Thomas Lubanga Dyilo, ICC, (Pre-Trial Chamber I), January 29, 2007.
১৪. Prosecutor v. Sam Hinga Norman, The Special Court of Sierra Leone, (Appeals Chamber), May 31, 2004. Also, see, Prosecutor v. Brima, Kamara, Kanu, The Special Court for Sierra Leone, (Trial Chamber), June 20, 2007; Valerie Oosterveld, ‘The Special Court for Sierra Leone, Child Soldiers, and Forced Marriage: Providing Clarity or Confusion’ (2007) 45 Canadian Yearbook of International Law 131.
১৫. Section 38(1)(d), Statute of the International Court of Justice, 1945.
১৬. Article 5, Statute of the International Criminal Tribunal for the Former Yugoslavia, 1993.
১৭. Mohammad Golam Rabbani and Wali-UR Rahman, ‘Rejoinder: War Crimes Act Does Not Need Reform’, The Daily Star (Point-Counterpoint), 1 March 2010.
১৮. Article 30, Rome Statute of the International Criminal Court, 1998.
১৯. Section 3 (a), International Crimes (Tribunal) Act, 1973.
২০. Article 5, Statute of the International Criminal Tribunal for the Former Yugoslavia, 1993; Article 3, Statute of the International Tribunal for Rwanda, 1974; Article 2, Statute of the Special Court for Sierra Leone, 2002.
২১. Section 4 (2), International Crimes (Tribunal) Act, 1973.
২২. ঐ, Section 20 (2).
২৩. ঐ, Section 13.
২৪. ঐ, Section 22.
২৫. Section 11 (6), International Crimes (Tribunals) Act, 1973.
২৬. ঐ, Sections 8 (5) I 18|
২৭. Article 77, Rome Statute of the International Criminal Court, 1998.
২৮. ঐ, Preamble|
২৯. ঐ, Article 80|
৩০. Sections 8(5), 9(4), 9 (5), 10(1)(e), 10(1)(f), 10(3), 10(4), 11(4), 12, 14(2), 16, 17, 18, 20 and 21, International Crimes (Tribunals) Act, 1973.
৩১. ঐ, Section 22.
৩২. Section 3, International Crimes (Tribunals) (Amendments) Act, 2009.
 Gary D. Solish (2010) The Law of Armed Conflict: International Humanitarian Law in War, Cambridge University Press আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫২১-৮৭০৮৮-৭ pp. 301-303
 যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনসমূহ,উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
 সাজা হয়েছে ৯৬ যুদ্ধাপরাধীর,যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক দশক আজপ্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২০, দৈনিক সমকাল,
 দালাল আইন, ১৯৭২ বলতে দ্যা বাংলাদেশ কোলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল) অর্ডার, ১৯৭২ (ইংরেজি: “The Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) Order, 1972”)
 Muntassir Mamoon। “Collaborators Tribunal Order, 1972″। Banglapedia: The National Encyclopedia of Bangladesh, Asiatic Society of Bangladesh। সংগ্রহের তারিখ ২০১৫-১২-০৮।
 যুদ্ধোত্তর পর্বে মুক্তিযুদ্ধ ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় , উৎপল রায় | ২০ জানুয়ারি, দেশরূপান্তর.কম ।
 গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান(( 1972 সনের নং আইন )
 এসআই/কেএম (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, বাংলা ট্রিবিউন),11.11.2019
 বাংলাদেশ প্রতিদিন,(ফেব্রুয়ারী ৯, ২০১৩, পৃনং:৩, বাংলাদেশ প্রতিদিন)
 শাহবাগ থেকে বলছি। ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা।সংগ্রহের তারিখ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩।

Comments (3)

  1. Avatar

    As an Advocate after reading this reach article is full of authentic information and innovative skills of writings which is not aware most of the people’s of Bangladesh. I want to give lot of credits to the writer for writing this types of article.

  2. Avatar
    সাদিয়া সুলতানা অজানা

    অসাধারণ একটি বিশ্লেষণ ধর্মী লেখা পড়লাম অবাক হয়ে। এই গবেষণা ভিত্তিক লেখার লেখক সৈয়দ তৌফিক উল্লাহ আইন পেশায় একজন অতি দক্ষ আইনজীবী ও সাহিত্য চর্চায় বর্তমান সময়ে অদ্বিতীয়। তিনি পেশায় আমার অগ্ৰজ ও আমাদের মতো তরুণ আইনজীবীদের পথপ্রদর্শক। উনার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও ইতিহাস ও আইনী ব‍্যাখা এই লেখাটি একটি পথিকৃৎ বললে কম হবে না ।
    ইতিহাসে যুদ্ধাপরাধের বিচার নতুন কোনো বিষয় নয়। গ্রিক পৌরাণিক কাহিনি ও মধ্যযুগে যুদ্ধাপরাধের বিচারের একাধিক নজির পাওয়া যায়। প্রাচীন গ্রিসে অনেক যুদ্ধবন্দী যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত হওয়ার পর মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন।বাংলাদেশের পাকিস্তানি সামরিক ও বেসামরিক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে স্বাধীনতার পর যে বিচার-প্রক্রিয়ার উদাহরণ ছিল তার মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের জন্য অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত লিপজিগ ট্রাইব্যুনাল, ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল, টোকিও ট্রাইব্যুনাল, ইতালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ট্রাইব্যুনাল উল্লেখযোগ্য।
    যুদ্ধ একটা অস্বাভাবিক অবস্থা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যা হয়েছে তা শুধু জেনোসাইড শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড এবং নির্বিচারে গণহত্যাও রয়েছে।যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি সব সময় জটিল ও কুটিল। মধ্যযুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন পরিসরে ও পরিমণ্ডলে যুদ্ধাপরাধের বিচার করা হয়েছে। বিজ্ঞ আইনজীবী ও অগ্ৰজ সৈয়দ তৌফিক উল্লার লেখনী আমাদের মতো তরুণী আইনজীবীদের শিবের তৃতীয় নয়ন খোলা মতো একটি সৃষ্টি। ভবিষ্যতে এমন আরো বিশ্লেষণ ধর্মীয় লেখা পড়ার প্রত‍্যাশ আমরা আপনার অনুজরা অপেক্ষা করবো।

    সাদিয়া সুলতানা অজানা।
    এ্যাডভোকেট
    ঢাকা জজকোর্ট।

মন্তব্য করুন